শুটিং হাউজে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় শরীরের ৩৫ শতাংশ দগ্ধ হয়েছিলেন অভিনেত্রী শারমিন আঁখি। গেল বছর জানুয়ারিতে ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় মৃত্যুকে কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা হয়েছে তার! বর্তমানে পুরোপুরি সুস্থ না হলেও অনেকখানি সুস্থ শারমিন আঁখি। মনোবল অটুট রেখে এখনও লড়ে যাচ্ছেন।
তিনি আবার ফিরতে চান লাইট, ক্যামেরা, অ্যাকশনের পুরনো ছন্দে। সম্প্রতি একটি মঞ্চ নাটকে কাজ করলেন। নতুন জীবন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে শারমিন আঁখি কথা বললেন চ্যানেল আই অনলাইনের সাথে…
আপনার শারীরিক মানসিক অবস্থা এখন কেমন?
আলহামদুলিল্লাহ্ সুস্থ আছি। এখনো শারীরিক অনেক দুর্বলতা আছে। অনেক নিয়মকানুন মেনে চলতে হচ্ছে। ভালো থাকার চেষ্টা করছি। মানসিক অবস্থার কথা বলতে গেলে যেই দুর্বিষহ স্মৃতি আমাকে প্রতি মুহূর্তে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে সেটা ভুলতে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এর শরণাপন্ন হয়েছি। আজ ২৫ তম সেশন শেষ হলো। জীবনের উপর দিয়ে যে ঝড় বয়ে গেছে, সব তো প্রায় দুমড়ে মুচড়ে গিয়েছিল! চেষ্টা করছি সব ভুলে সুন্দর থাকতে।
ঝড়ের পরে নাকি আকাশটা সুন্দর হয়। যে ঝড় জীবনে বয়ে গেল এরপর আপনার ভবিষ্যৎ নিয়ে কী ভাবছেন?
ঝড় ঝাপটা তো প্রতিনিয়ত সয়ে যাচ্ছি। শিখেছি কীভাবে নিজেকে সামলে চলতে হয়। সমাজে কিছু নেতিবাচক মানুষ থাকবে, তারা কুৎসা রটাবে, কান ভারী করবে, জটিলতা তৈরি করবে। তারা একসময় হারিয়েও যাবে। আমি শিখেছি নেতিবাচক সব দৃষ্টিভঙ্গি ভুলে সবসময় ইতিবাচক থাকতে হবে। আমি সবসময় সব কিছু নিয়ে ইতিবাচক। জীবন সত্যি সুন্দর আর মানুষগুলো আরো সুন্দর। জীবনকে নতুন করে দেখতে শিখেছি। চারপাশের মানুষদের নতুন করে জানতে শিখেছি। গত একবছরে এটা বুঝেছি যে মানুষগুলো আমার পাশে ছিল তারা এভাবে পাশে না থাকলে আমি হয়তো এ পথ পাড়ি দিতে পারতাম না এবং আমার আর ঘুড়ে দাঁড়ানো হতো না। তাই তাদের ধন্যবাদ দিয়েও শেষ হবে না। আমার পরিবার, আমার বন্ধুরা, বিশেষ করে এই অঙ্গনের আমার সব সহকর্মী শিল্পী এবং আমার সংগঠনের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। অতীত ভুলে কাজে মনযোগী হতে হবে। আমি যেহেতু অভিনয়শিল্পী, তাই কাজই আমাকে মাতিয়ে রাখতে পারবে। এক চরিত্র থেকে অন্য চরিত্রে রূপান্তরে অদম্য একটা আনন্দ কাজ করে। অভিনয়ের বাইরে আর কিছু ভাবতে পারি না। আগামীতে একজন ভালো অভিনয়শিল্পী হিসেবে নিজেকে দেখতে চাই। নতুন করে অভিনয় যাত্রাটা আরও সুদীর্ঘ করে যেতে চাই। ভালো ভালো কাজ দর্শকদের উপহার দিয়ে যেতে চাই যেনও তারা আমার কাজগুলোর মধ্য দিয়ে আমাকে মনে রাখে।
জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় আপনাকে কী কী শিক্ষা দিয়ে গেল, আর যেসব উপলব্ধি অর্জন করলেন?
মিডিয়াতে কাজ করি মানে তো এই নয় যে আমি এলিয়েন। আমি রক্ত মাংসের মানুষ। তাই আমারও আবেগ, অনুভূতি, যন্ত্রণা আছে। যেদিন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলাম তখন আমার দুই হাত পা ডিপ বার্ন আর মুখ সুপার ফেসিয়াল বার্ন, সঙ্গে শ্বাসনালীও এফেক্টেড ছিল। ডক্টর নিশ্চয়তা দিতে পারছিলেন না আমি বাঁচবো কিনা! প্রতি রাতে ১০৪-১০৫ ডিগ্রী জ্বরের ঘোরে শুধু ফ্লাশব্যাকের মত ফেলে আসা স্মৃতিগুলো চোখের সামনে আসতো। মনে হতো মানুষ তার অন্তিম মুহূর্তে এভাবেই বুঝি ভালো স্মৃতিগুলো দেখতে দেখতে চলে যায়। কিন্তু এই ভালো স্মৃতিগুলো আমাকে ফিরে আসতে শক্তি যুগিয়েছে। বোঝাতে পারবো না হাসপাতালে দুমাস ধরে কি কঠিন যুদ্ধ আমাকে করতে হয়েছে। এক একটা রাতের অসহ্য যন্ত্রণা শুধু আমি জানি। আইসিইউতে সারারাত আশপাশের রোগীদের আর্তচিৎকারে কেঁপে কেপে উঠতো শরীর আর মন। ভারী হয়ে উঠতো বাতাস। প্রতিরাতেই কেউ না কেউ এই যন্ত্রণার কাছে হার মেনে নিয়ে মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়তো। প্রতিদিন সকালে কোনো না কোন বেড খালি দেখে বুঝে নিতাম আরেকজন জীবন যুদ্ধে পরাজিত হলো। অসহ্য যন্ত্রণায় দিন রাত কাতরেছি, ধৈর্যশক্তির অধিক ধৈর্য ধারণ করে সব যন্ত্রণা গিলেছি। আর একটা কথাই মনে মনে বলেছি, মনবল ভাঙা যাবেনা, শেষবিন্দু পর্যন্ত চেষ্টা করবো। বাকিটা আল্লাহ ভরসা। আল্লাহ স্বয়ং তার রহমতের চাদর দিয়ে আমাকে জড়িয়ে রেখেছিলেন বলেই আমি বেঁচে ফিরেছি।

চিকিৎসার বাইরে এমন কী কী করেছেন যেটা আপনার অসুস্থতাকালীন সুস্থ হতে গুরুত্বপূর্ণভাবে সাহায্য করেছেন?
প্রচুর গাছ লাগিয়েছি। বীজ থেকে চারা , চারা থেকে গাছ। গাছের সতেজতা দেখেছি। বেড়ে উঠা দেখেছি। জীবনের সৌন্দর্য দেখেছি। মোটিভেশন নিয়েছি জীবন সত্যি সুন্দর।
নতুন জীবনে আপনার দুটি প্রধান উপলব্ধি বলবেন? একজন মানুষ হিসেবে এবং একজন শিল্পী হিসেবে…
একজন শিল্পী কিংবা অভিনেত্রী হিসেবে উপলব্ধি হচ্ছে, শিল্পটাই যদি জীবন হয় তবে শিল্পের জন্য এর চেয়ে বেশি কীভাবে মূল্য দেয়া যায় আমি জানি না। একজন মানুষ হিসেবে উপলব্ধি আল্লাহ কখনো কাউকে ঠকান না। তিনি কখনো কারোর একার না।
অনেক বছর পর মঞ্চে ফিরলেন। মঞ্চের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কতদিনের এবং আবার ফিরে কেমন লেগেছে?
হুম প্রায় ৫ বছর পর মঞ্চে ফেরা। শেষ কাজ করেছিলাম ২০১৯-এ। এরপর তো করোনা দুবছর নাই করে দিল। এখানে কাজ করতে হলে পুরো সময়টা দিয়ে করতে হয়। ফাঁকিবাজির সুযোগ নেই, আর অনেক কমিটেড হয়ে কাজ করা লাগে। এই মঞ্চই আমাকে মাতিয়ে তোলে। তাই যখন দলের ডাক আসে সব ছেড়ে ছুটে যাই। মঞ্চ দিয়ে কাজে ফিরতে পেরে কেমন লাগছে এই অনুভূতি প্রকাশ করার মত না। যেই মঞ্চ দিয়ে আমার শিল্প চর্চা শুরু, সেই মঞ্চেই দ্বিতীয় শিল্পী জীবনের নতুন অধ্যায়ের শুরু করতে পেরেছি এটা ভাবতেই একটা নতুন জন্মের অনুভূতি পাই।
আবার সামনে টিভি নাটকে ফিরবেন নিশ্চয়ই! এতে চারপাশের অনেককিছু হয়তো চেঞ্জ হবে। নিজেকে মিলিয়ে নিতে পারবেন নাকি নিজের স্বকীয়তা বা স্বতন্ত্র ভাবনা চিন্তা কাজ করবে?
নিশ্চয়ই। আমি প্রথমে একজন মঞ্চকর্মী। মহড়াকক্ষে নাটকের চরিত্র বিশ্লেষণ করতে গিয়েই প্রেমে পড়ি অভিনয়ের। অভিনয়টা সাধনা আর চর্চার বিষয়। এমন নয় যে আসলাম, পাঠ গাইলাম আর অভিনয় হয়ে গেলো। সবাই খুব দ্রুত ফেম চায়। তাই মাঝপথে পথভ্রষ্ট হয়ে পড়ে। লক্ষটা যদি ঠিক থাকে আর কাজের প্রতি কমিটমেন্টের জায়গাটা যদি সৎ থাকে তবে যেকোন কাজ সহজ হয়ে যায়। সব ধরনের চরিত্রে কাজ করতে গিয়ে অভিনেত্রী হিসেবে দীর্ঘ একযুগে নিজেকে অনেক পরিণত করার চেষ্টা করেছি। পেশাদার জায়গা থেকে কাজ করতে গেলে অনেক কাজ আমাদের করতে হয়। অনেক সীমাবদ্ধতা থাকে। এর মধ্যে থেকেই চেষ্টা করবো ভাল গল্প, কিংবা গল্পের চরিত্রটির একটা ভিন্ন আঙ্গিক দেয়ার।
আপনার নাটক ও উল্লেখযোগ্য সিনেমার সংখ্যা বা কিছু উল্লেখ করবেন…
ধারাবাহিক নাটকের মধ্যে রয়েছে আশাপুর্ণা দেবীর বালুচুরি উপন্যাস অবলম্বনে অপরাজিতা, রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরের মধ্যবর্তিনী, গিয়াসউদ্দিন সেলিমের রৌদ্র ছায়ার খেলা, বাশার জর্জিজের গ্রামের নাম সুবর্ণপুর, সালাউদ্দিন লাভলুর মাই নেম ইজ ব্যাড। এছাড়া ইমপ্রেস টেলিফিল্মের এন্থলজি ফিল্ম ইতি তোমারই ঢাকা, শঙ্খ দাসগুপ্তর বলি, বাংলাদেশ ও ভারত এর জয়েন্ট কোলাবোরেশান এ নির্মিত অরিজিত মুখার্জির স্বল্প দৈর্ঘ্য “শেডো” তে অভিনয় করেছি। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে গেছে আরিক আনাম খানের ট্রানজিট, নোমান রবিনের এ কোয়ার্টার মাইল কান্ট্রি, ইমতিয়াজ সজীবের জাস্ট এ জোক ডার্লিং। এছাড়া বায়স্কোপে ওমর ফারুকের বাতাসের লাল ফুল, আফজাল হোসেন মুন্নার শেভুলুশন, মাহমুদ হাসান চন্দ্রগ্রস্ত।








