এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
পাকিস্তানের অভিনেত্রী হুমায়রা আসগর আলির মৃত্যু ছিল চরম নিঃসঙ্গ ও মর্মান্তিক। প্রায় নয় মাস ধরে তার নিথর দেহ পড়ে ছিল করাচির ডিফেন্স হাউজিং অথরিটির ইত্তেহাদ কমার্শিয়াল এলাকার একটি ফ্ল্যাটে!
এমনটাই জানিয়েছে করাচি পুলিশ। ডিজিটাল তথ্য, ফরেনসিক আলামত এবং পরিচিতজনদের সাক্ষ্য বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীরা এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন, বৃহস্পতিবার (১০ জুলাই) আরব নিউজ-কে এমনটাই জানিয়েছেন তারা।
অভিনেত্রীর পচাগলা মরদেহ মঙ্গলবার (৮ জুলাই) করাচির ডিফেন্স হাউজিং অথরিটির ইত্তেহাদ কমার্শিয়াল এলাকার একটি ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার করা হয়। বাড়ির মালিক ভাড়াবাকি নিয়ে আদালতে অভিযোগ করলে আদালতের বেইলিফ উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করতে এসে তালা ভেঙে ফ্ল্যাটে ঢোকেন এবং ভিতরে হুমায়রার মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন।
শুরুতে পুলিশ সার্জন ডা. সুমাইয়া সায়েদ ধারণা দিয়েছিলেন, হুমায়রা অন্তত এক মাস আগে মারা গিয়েছেন। তবে তদন্তকারীরা এখন বলছেন, ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া আলামত, ডিজিটাল তথ্য, ফোন রেকর্ড, সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট ও পরিচিতদের বক্তব্য অনুযায়ী অক্টোবর ২০২৪-এর পর থেকে তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
হুমায়রার সর্বশেষ ফেসবুক পোস্ট ছিল ২০২৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর, আর ইনস্টাগ্রামে শেষ পোস্ট ৩০ সেপ্টেম্বর। তার ফোন রেকর্ড অনুযায়ী, শেষ কলটি করা হয় অক্টোবরেই—এরপর থেকে ফোনটি পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় ছিল।
ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল (ডিআইজি) সায়েদ আসাদ রাজা বলেন, “কল ডিটেইল রেকর্ড অনুযায়ী হুমায়রার শেষ ফোনকল ছিল অক্টোবর ২০২৪-তে। এরপর থেকে ফোনটি নিষ্ক্রিয়।” তার সর্বশেষ ফেসবুক পোস্ট ছিল ১১ সেপ্টেম্বর, আর ইনস্টাগ্রাম পোস্ট ছিল ৩০ সেপ্টেম্বর।
দুইজন তদন্ত কর্মকর্তা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) আরব নিউজকে বলেন, হুমায়রার মৃত্যুর সময়কাল প্রায় ৯ মাস আগে, অর্থাৎ অক্টোবরের আশপাশেই। প্রথমজন বলেন, “তিনি সম্ভবত বিদ্যুৎ বিল না দেওয়ার পর ফ্ল্যাটের বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়—সেই সময়ের মাঝেই তার মৃত্যু হয়।” দ্বিতীয়জন বলেন,“রান্নাঘরের জারগুলোর মরিচা ধরা অবস্থায় ও ছয় মাস আগে মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার উদ্ধার পাওয়া গেছে, যা এই সময়সীমাকে নিশ্চিত করে।”
চিত্রশিল্পী ও স্টাইলিস্ট দানিশ মকসুদ, যিনি হুমায়রার সঙ্গে শেষ একটি ফটোশুটে কাজ করেছিলেন, জানান—তাদের শেষ কথা হয়েছিল অক্টোবরেই। হুমায়রা তখন বেশ উৎফুল্ল ছিলেন। কিন্তু ফটোশুটের ছবি পোস্টের জন্য আর তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। ফোনে ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন তারা।
দানিশ জানান, উদ্বিগ্ন হয়ে তিনি কয়েকটি সোশ্যাল মিডিয়া পেজে অভিনেত্রীর নিখোঁজ বিষয়ে জানান, কিন্তু কেউ গুরুত্ব দেয়নি। হুমায়রার নিঃসঙ্গতা যেন নিঃশব্দে গিলে খেয়েছিল তাকে।
তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানান, ফেব্রুয়ারিতে একই ফ্লোরের একটি ফাঁকা ফ্ল্যাটে এক প্রতিবেশী ফেরত এলে গন্ধ তখন আর ছিল না, কারণ ব্যালকনির দরজা খোলা ছিল।
ফ্ল্যাট থেকে দুটি মোবাইল ফোন উদ্ধার করে ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত নমুনাও পরীক্ষাধীন। পুলিশ জানিয়েছে, মৃত্যুর পেছনে কোনো অপরাধ সংশ্লিষ্টতা পেলে পরিবার মামলা করুক না করুক, তারা যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে।
মঞ্চ থেকে টেলিভিশন, সিনেমা- সব মাধ্যমে কাজ করেছেন হুমায়রা। এক দশকের বেশী সময় ধরে বেশ ব্যস্ততাতেই ছিলেন। কিন্তু ক্যারিয়ারের বাইরের জীবন ছিল অনেকটাই নিঃসঙ্গ। প্রায় দুই বছর আগে তার বাবা তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। মেয়ে মারা গেছে—এই খবর জানার পরেও শুরুতে তিনি মরদেহ নিতে অস্বীকৃতি জানান।
তবে সর্বশেষ খবরে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার (১০ জুলাই) লাহোর থেকে তার পরিবারের সদস্যরা করাচিতে এসে হুমায়রার মরদেহ গ্রহণ করবেন।
নিঃসঙ্গতায় হারিয়ে যাওয়া এক শিল্পীর এই করুণ মৃত্যু ও দীর্ঘ সময় অজানায় পড়ে থাকা লাশ—পাকিস্তানের বিনোদন অঙ্গনে এক বেদনাদায়ক প্রশ্ন তুলে দিয়েছে- “কতটা একা হলে একজন শিল্পীকে কেউ খোঁজেও না?” –আরব নিউজ ও কারেন্ট.পিকে








