চ্যানেল আই অনলাইন
Advertisement
English
  • সর্বশেষ
  • বাংলাদেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • রাজনীতি
  • খেলাধুলা
  • বিনোদন
  • অপরাধ
  • অর্থনীতি
  • আদালত
  • ভিডিও
  • স্বাস্থ্য
  • জনপদ
  • প্রবাস সংবাদ
  • চ্যানেল আই টিভি
No Result
View All Result
চ্যানেল আই অনলাইন
En

সে এলো বৃষ্টির রাতে

চ্যানেল আই অনলাইনচ্যানেল আই অনলাইন
৮:৪০ অপরাহ্ন ০২, ডিসেম্বর ২০২৪
শিল্প সাহিত্য
A A

ঠিক সন্ধ্যার পরপরই প্রচণ্ড বৃষ্টি শুরু হল, সাথে দমকা বাতাস। বৃষ্টি মানে একেবারে মুষলধারে বৃষ্টি। এরকম ভারি বৃষ্টি অনেকদিন দেখিনি। আর বাতাসটাও এমন প্রচণ্ড গতির যে বৃষ্টির ভারি ফোটাগুলিকে পেঁজা তুলোর মতো করে আছড়ে নিয়ে অনেক দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছে। বাসার সামনের অল্প আলোর রোড লাইটের দিকে তাকালে বৃষ্টি আর বাতাসের এই খেলাটা বেশ ভালোভাবে বোঝা যায়। আলোর কারণে বৃষ্টির ভার আর বাতাসের মধ্যে যুদ্ধের কারণে একটা ধোঁয়াশা মাখা সাদাটে আবহ তৈরি হয়েছে। দমকা বাতাস বারবার দিক পরিবর্তন করে বৃষ্টিকে একবার এদিকে তো আরেকবার ওদিকে ধেয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

এরকম ঝুম বৃষ্টি দেখতে দেখতে এক কাপ চা না খেলেই না। জালানার পাশে একটা চেয়ার পেতে হাতে এক্ কাপ চা নিয়ে বসেছি। চা ছাড়া এরকম বৃষ্টি দেখা একেবারে রসহীন মনে হয়। ছোট এই মফস্বল শহরে আমার সময় কাটানোর খুব বেশি উপাদান নেই। বন্ধু বান্ধব কম, আড্ডা দেই না। কাজের পরে অধিকাংশ সময়ই বাসায় বসে সময় কাটে। একাকি জীবনে এই ছোট শহরে এর চেয়ে বেশি কিছু আশা করা বৃথা। আর সুযোগ থাকলে তা যে আমার জন্যই প্রযোজ্য হত তাও মনে হয় না। জীবন উপভোগ করার মতো সময় আমি কয়েক বছর আগেই পার করে এসেছি।

এরকম ছোট শহরে রাতে ন’টার পর সবকিছুই খুব ধীর গতির হয়ে যায়। আমার এই ভাড়া বাসাটি শহরের কেন্দ্র থেকে মোটামুটি মাইল দুএক দূরে। এটা আবাসিক এলাকা, কিন্তু বাসাবাড়ির ঘনত্ব খুব কম। বড় বড় শহরের কংক্রিটের জঙ্গল হয়ে উঠতে পারেই এখন পর্যন্ত।

বৃষ্টি আর দমকা বাতাসের রাজত্ব এখনও চলছে। রাস্তায় লোকজনের চলাচল এখন একেবারেই প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এরকম আবহাওয়ার খুব জরুরি না হলে কেই বা বাইরে বের হয়। চা শেষ হয়ে গিয়েছে। আরেক কাপ চা করতে রান্না ঘরের দিকে পা বাড়াতেই বিদ্যুৎ চলে গেলো। বিদ্যুৎ যাওয়া আসা এখানে বেশ স্বাভাবিক ঘটনা। আসলে এরকম আবহাওয়ার মধ্যে এতক্ষণ যে বিদ্যুৎ ছিল সেটাই বরং আশ্চর্য ব্যাপার। আপাতত চা বানানোটা বাদ দিয়ে চার্জার লাইটটা খুঁজতে নেমে গেলাম। অন্ধকারে হাতরে হাতরে কোনমতে পেয়েও গেলাম সেটা। সুইচটা অন করলেও জ্বললো না যন্ত্রটা, হয়ত চার্জ দেওয়া হয়নি। অগত্যা শেষ ভরসা মোমবাতি। ঘরে দু’একটা মোমবাতি থাকার কথা, কিন্তু কোথায় যে রেখেছি মনে করতে পারছি না। অনেক চেষ্টা করে ছোট একটা মোমবাতি খুঁজে পাওয়া গেলো। সিগারেট খাই নিয়মিত, কাজেই লাইটারটা পকেটেই ছিল। মোমবাতিটা জ্বালিয়ে সেটা উপুর করে টেবিলের কোনার দিকে একটা গলা মোম ফেলে মোমবাতিটা রাখতেই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। একবার কড়া নাড়ার পর একটা দীর্ঘ বিরতির পর দ্বিতীয়বার। আমার বাসায় রাত নটার পর হয়তো এই প্রথম কড়া নাড়ার শব্দ শুনলাম। তাও আবার এরকমের এক ঝড়-বৃষ্টির রাতে। খুব আশ্চর্য হলাম। প্রথমে ভেবেছি হয়তো বাতাসে কোন কিছু নড়ার শব্দ। কিন্তু তৃতীয়বার কড়া নাড়ার শব্দটা শোনার পর সেই সন্দেহ দূর হল। এ সত্যি সত্যিই কড়া নাড়ার শব্দ। কে হতে পারে? নিজেকেই প্রশ্নটা করলাম। চোর-ডাকাত নিশ্চয়ই না। এতো কম রাতে ওদের হানা, তাও আবার তার মতো ব্যাচেলার কারও বাসায় খুব বেমানান। তার অফিসের কলিগ সাহেদ অনেকদিন আগে একবার এসেছিল, সে কি? কিংবা বাড়িওয়ালা। সে মাসের শেষ তারিখে একবার ভাড়া নিতে আসে, তাও বিকালের দিকে। আজ না মাসের শেষ দিন না বিকেলবেলা। সবচেয়ে যে সম্ভাবনাটা বেশি সেটা হল কোন লোক হয়তো ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে রাস্তায় বিপদে পড়ে সাময়িক কিছু সময়ের জন্য আশ্রয় চাইছে।

এই সম্ভাবনাটাই আমার কাছে বেশি যুক্তিসঙ্গত মনে হচ্ছে। এসব ভাবতে ভাবতে দরজার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি যখন তখন আরেকবার কড়া নাড়ার শব্দ হল। আমি দরজার ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে। একবার সামান্য একটু ইতস্তত করলাম দরজাটা খুলবো কিনা। শেষমেশ মনের সব সংশয় ঝেড়ে ফেলে দিয়ে দরজাটা খুলতেই একটা বিশাল মানসিক ধাক্কা খেলাম।
আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে নারী মূর্তি। কোনোদিন স্বপ্নেও ভাবিনি এতো রাতে আমার দরজার সামনে কোন নারী আগন্তুকের সম্মুখীন হবো। আমার পিছনে হাত দশেক দূরে টেবিলের উপরে ছোট এক মোমবাতি টিমটিম করে জ্বলছে। সেই দুর্বল আলো দরজা পর্যন্ত আসতে আসতে এতোটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে যে তাতে আমার সামনে কে বা কি দাঁড়িয়ে আছে সেটা বোঝা খুব মুশকিল। শুধু অবয়ব দেখে একটা নারী মূর্তি বলেই মনে হয়। গায়ে তার নিকষ কালো শাড়ী পরা বলেই মনে হয়। আর তার মুখের অর্ধেকটা সেই শাড়ীর আঁচল দিয়ে ঢাকা থাকায় তার চেহারাটা সম্পর্কে কোন ধারণাই করা গেলো না। একেতো অন্ধকার, তার উপরে মুখের অর্ধেকটা ঢাকা থাকায় তার চেহারা কেমন, বা কেই বা এই আগন্তুক তার পুরোটাই রহস্য রয়ে গেলো, অন্তত এখন পর্যন্ত।

আমার ধাতস্ত হতে কিছুটা সময় লাগলো। কি বলবো বা জিজ্ঞেস করবো কিছুই বুঝতে পারলাম না। কিন্তু আমাকে এ যাত্রা কিছুটা স্বস্তি দিয়ে নারীমূর্তিটি জিজ্ঞেস করলো – “ভেতরে আসতে পারি?”

Reneta

আমি আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করতে গেলাম – “ মানে, আপনাকে তো চিনতে পারছি না। ” কিন্তু বাক্যটা শেষ করতে পারলাম না। একে তো নারী, তার উপর হয়তো এই ঝড় বৃষ্টির রাতে বিপদে পরেছেন। এমন অবস্থায় তাকে দরজায় দাড় করিয়ে রেখে এসব জিজ্ঞাসাবাদ করাটা মতো “অভদ্রতা” মন থেকে সায় দিলো না। অবচেতন মনে কিছু না বলেই একপাশে সরে গিয়ে তাকে ভিতরে আসার রাস্তা করে দিলাম।

আগন্তুক ধীর পায়ে ঘরটার মাঝখানে এসে দাঁড়ালো। আমি তার কিছুটা পিছনে। সে হয়ত দেখে বসার জায়গাটা কোথায় দেখে নিতে চাইছে। আমি তাকে আমার ইংরেজি “এল” আকারের সোফাটা ইঙ্গিত করে বললাম – “ বসুন”। আমি তার পিছন দিক থেকে সোফাটা দেখানোর চেষ্টা করে বুঝতে পারলাম সে তো দেখেনি আমি তাকে কোথায় বসতে বলেছি। কিন্তু দেখলাম সে ঠিকই সোফাটায় গিয়ে বসেছে, একেবারে কোণার দিকের আসনটায়।

এই মুহূর্তে সে মোমের আলোটার কিছুটা কাছাকাছি, কিন্তু তারপরও তার চেহারাটা পরিস্কার দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু মোমের আলোয় এটুকু দেখলাম আগন্তুক দরজা থেকে সোফায় যে পথ ধরে গেছে সেই জায়গার মেঝেতে কিছুটা পানি চিক চিক করছে। সত্যিই তো, তিনি তো ঝড় বৃষ্টি মাথায় নিয়ে এসেছেন। “একটু অপেক্ষা করেন, আপনার জন্য একটা তোয়ালে নিয়ে আসি।“ – বলেই হরহর করে বাথরুমের দিকে চললাম। বাথরুমে গিয়ে তোয়ালেটা হাতে নিয়ে দাড়িয়ে থাকলাম। চিন্তা করতে থাকলাম কে এই নারী। চিনিনা জানিনা এমন একজনকে কি হুট করে বাসায় ঢুকতে দেয়াটা ঠিক হয়েছে? আজকাল প্রতিদিন কতো নানান কায়দায়ই না অহরহ অঘটন ঘটছে। নারীরাও এসব অনেক কিছুর সাথে জড়িত। হয়তো এই নারী বিপদে পড়েছে এমন একটা ভাব করে প্রথমে ঘরে ঢুকেছে আর তার সঙ্গী সাথীরা এখনও বাইরে অপেক্ষা করছে আর সময় সুযোগ বুঝে ঘটনা ঘটিয়ে চুপচাপ চলে যাবে। এরকম দুর্যোগের রাতে তাকে এ বাসায় খুন করে চলে গেলে কেউ টেরও পাবে না। কাউকে কি এখন ফোন করে আসাতে বলা প্রয়োজন সাহায্যের জন্য? কিন্তু ফোন করলেও কেউ যে খুব তাড়াতাড়ি এসে পড়বে সে সম্ভাবনাও তো খুব কম। আচ্ছা, যদি কেউ খুব তাড়াতাড়ি সাহায্যের জন্য আসেও, আর এসে দেখে সত্যিই এই নারী বিপদগ্রস্ত হয়ে এ বাসায় অল্প কিছু সময়ের জন্য আশ্রয় নিয়েছে, তাহলে তাকে নিয়ে কি ভাববে? মান সন্মানের বিষয়। একজন সামান্য নারীতে ভয় পেয়ে একজন পুরুষ অন্য মানুষকে ডেকে এনেছে। আবার ভাবলাম, আচ্ছা আমি এতো ভয় পাচ্ছি কেন? এরকম কি হতে পারে না যে এই নারী হয়ত কোথাও আসছিল বা যাচ্ছিল আর এই মারাত্মক রকমের খারাপ আভাওয়ায় একেবারে নিরুপায় হয়ে তার বাসায় ক্ষণিকের জন্য আশ্রয় নিয়েছে। এটাই তো সবচেয়ে স্বাভাবিক কারন হতে পারে তাই না? আরে ধুর, আমি অযথাই ভয় পাচ্ছি। সময় ও পরিবেশ প্রতিবেশের উপর মানুষের মনের অবস্থা অনেকটা নির্ভর করে। সেটাই হয়েছে আমার। এই ঘটনাটা কোন দিনের বেলায় ঘটতো তাহলে এ নিয়ে দুই পয়সার চিন্তাও কেউ করতো না। অবশেষে মন থেকে সব ভয় আর শঙ্কা দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়ে তোয়ালেটা নিয়ে ড্রইং রুমের দিকে এলাম।
তিনি এখনও বসে আছেন। মাথাটা নিচু দিকে নোয়ানো কিছুটা। যাবার আগেও তাকে এরকমই বসে থাকতে দেখেছি। হয়ত অপরিচিত একজন একাকি পুরুষ মানুষের সামনে সংকোচ বোধ করছেন। আমাদের দেশে এরকম ছোট শহরে এটাই স্বাভাবিক। তার দিকে তোয়ালেটা বাড়িয়ে দিয়ে বললাম – “এই নিন।“ আগন্তুক ডান হাতটা খুব ধীর গতিয়ে এগিয়ে তোয়ালেটা নিলো। হাত বাড়াতেই দেখলাম কবজিতে দুটো মোটা স্বর্ণের চুড়ি। এটা চুড়ি না বালা? আচ্ছা খুব মোটা চুড়িকে কি বালা বলে। জানি না। কোনোদিন জানার আগ্রহ হয়নি। আচ্ছা, এতো রাতে এই নারী এরকম গহনা পড়ে বের হয়েছে কেন? হয়তো কোন নিমন্ত্রনে যাচ্ছিল বা ফিরে আসছিলো।

তোয়ালেটা হাতে নিয়ে সেটা কোলের উপর নিয়ে তিনি একই ভঙ্গিতে বসে রইলেন। গা মোছার কোন চেষ্টা লক্ষ্য করলাম না। হয়ত আমার সামনে উনি গা মুছতে লজ্জা পাচ্ছেন ভেবে আমি সোফা থেকে উঠে জানালার পাশে এসে বাইরের দিকে মুখ করে তাকিয়ে আছি। আগন্তকের গা মুছে শুকিয়ে নেবার জন্য তাকে কিছুটা সময়তো দেয়া দরকার। বাহিরের দিকে তাকিয়েই এটা ওটা দেখছি । বৃষ্টি এবং বাতাস দুটিই বেড়েছে এখন। দূরে কোথাও বজ্রপাত হল মনে হয়। সেই বিজলির চমকে পুরো আকাশটা কয়েক মুহুরতের জন্য আলোর ঝলকানিতে কেঁপে উঠলো। বিজলি দেখতে দেখতেই ভাবছিলাম আগন্তুকের দিক থেকে কোন শব্দ আসছে না কেন? আমি ভেছিলাম আগন্তুকের অন্তত হাতের বালার শব্দ দু’একবার হলেও শোনা যাবার কথা। এমন সময় আবার আকাশে বিদ্যুৎ চমকাল। এবার এটার শব্দ আর দাপট এতোটাই প্রচণ্ড হল যে ঘাবড়ে গিয়ে জানালা থেকে ঘুরে দাঁড়ালাম।

বিজলি আর বজ্রপাতে ভয়ে পিছন ফিরে যা দেখলাম তাতে আমার ভয়টা আরও বহুগুনে বেড়ে গেছে। আমার সামনে দাড়িয়ে আগন্তুক নারী। সাড়া শব্দহীন ভাবে সে যে কখন আমার পিছনে এসে দারিয়েছে সেটা বিন্দুমাত্র টের পাই নি। তাকে দেখে ভুত দেখার চেয়েও বেশি হতচকিত হয়ে গেছি। কোন স্বাভাবিক মানুষ কি এভাবে একরম পিনপতন নিরবতায় চলাফেরা করতে পারে? আমার অবস্থাটাকে এখন কি ভাষায় বর্ণনা করা যাবে জানি না। হতচকিত, ভ্যাবাচ্যাকা, আতংকিত কিংবা এর সব কিছুই। একরম এই সামান্য মোমবাতির আলোয়, যাতে কিছুই ঠিকমতো দেখা যায় না, এই ঘরে, কালো শাড়ী পড়ে, মুখটি অর্ধেক ঢেকে দাড়িয়ে আছে এক নারী।
আমি কয়েকবার ঢোক গিলে জিজ্ঞাসা করলাম – “আপনি? গা… গা মোছা হয়ে গেছে?”
কোন উত্তর নেই আগন্তুকের মুখে।
আবার জিজ্ঞাস করলাম – “আচ্ছা আপনি কে? কী নাম? কেন এসেছেন?”
আগন্তক নিশ্চুপ। কিন্তু টের পেলাম সে তার নোয়ানো মাথাটা আস্তে আস্তে উপরের দিকে তুলছে।
আবার বললাম-“আচ্ছা আপনি নিজের পরিচয় না দিলে কি করে হবে? এভাবে কি কথা বলা যায়?”
এবার মনে হল আগন্তুক মুখটা আমার দিকে সোজা করে তাকিয়ে আছে। মুখ থেকে আঁচলটা সরিয়েও নিলো সে। কিন্তু আই আলো আধারিতে তখনও মুখটা আমার কাছে পরিস্কার হল না।
আমি আবার একটু জোরেই জিজ্ঞাস করলাম – “বলুন আপনি কে?”

ঠিক সেই সময়েই আমার কণ্ঠস্বরকে ছাপিয়ে, বৃষ্টি ও বাতাসের শব্দকে পদদলিত করে প্রচন্ড শব্দে এক বজ্রপাত আছড়ে পড়লো, আর তার বিজলির ঝলকানি কয়েক সেকেন্ডের জন্য আগন্তুকের মুখের উপর পড়তেই তার চেহারাটা আমি খুব পরিস্কার, হ্যাঁ, খুবই পরিস্কার ভাবে দেখতে পেলাম। এর চেয়ে পৃথিবীর অন্য যে কোন কিছুই দেখা আমার জন্য স্বাভাবিক ছিল। ভয়ে, আতংকে আমি হয়তো পড়েই যেতাম যদি পিছনে জানালার গ্রিলটাতে আমার পিঠটা না ঠেকত।
নারীমূর্তিটা আমার দিকে এক পা এগোল।

আমার মুখের কথা আটকে যাচ্ছে। চিৎকার করছে চাচ্ছি, কিন্তু পারছি না। মনে হচ্ছে আমাকে বোবা ভূতে পেয়েছে। অনেক কষ্টে মুখ থেকে শুধু বের হল – “কে? কে আপনি?”
কেমন যেন এক অদ্ভুত কণ্ঠস্বরে তার উত্তর – “চিনতে পারছ না এখনও?”
এরকম এদ্ভুত কণ্ঠস্বর কখনো শুনিনি কোনোদিন কারও মুখে। কেমন যেন একটা ফ্যাসফ্যসে কণ্ঠ, মনে হচ্ছে কণ্ঠনালীর অনেক ভেতর থেকে অনেক কষ্ট করে বের হচ্ছে।
আমি বললাম – “না, এটা হতে পারে। এটা তুমি হতে পারো না। বল সত্যি করে তুমি কে? কেন এসেছ এখানে?”
নারীমূর্তির উত্তর-“আমি, আমিই। তুমি ঠিকই চিনেছ আমাকে।”
-“না, হতে পারে না। তুমি নেই, তুমি থাকতে পারো না।”
-“অনেক খুঁজেছি তোমাকে”
-“না, এটা তুমি না। তুমি হতে পারো না। তুমি তো অনেক আগেই…।”
-“মরে গেছি?”
-“হ্যাঁ, তুমি নেই, তুমি মরে গেছো। অনেক আগেই মরে গেছো।”
-“মরে গেছি, না মেরে ফেলেছিলে?”
-“জানি না, তুমি চলে যাও, দয়া করে চলে যাও।”
এবার তার চোখের দিকে তাকাতেই আমার আতংক আরেকধাপ বেড়ে গেলো। দেখলাম লাল গনগনে আগুনের মতো একজোড়া চোখ। যেন আগুনের চুল্লি থেকে দুই টুকরো লাল কয়লা তার চোখের মধ্যে বসিয়ে দিয়ে গেছে।
– “বল কেন করেছিলে?”
– “কি করেছি আমি?”
– “খুন”
– “কাকে?”
– “আমাকে”
– “মিথ্যে, মিথ্যে কথা”
– “আমাকে মারার জন্য দুনিয়াতে তোমার বিচার হয়নি, কিন্তু আমি তার বিচার করবো”
সে আমার দিকে আরও একপা এগিয়ে এলো। এখন তার আর আমার মাঝখানে মাত্র সামান্য ব্যাবধান। দেখলাম তার হাত দুটি আমার দিকে এগিয়ে আসছে। মিথ্যে স্বপ্নের মধ্যে আছি ভেবে এখনও বাঁচার আশা ছেড়ে দেইনি। প্রতি মুহূর্তেই ভাবছি এই বুঝি সে বিদায় হবে, দুঃস্বপ্ন শেষ হয়ে যাবে। মানুষ শত বিপদেও সে নিজে বেঁচে যাবার আশা করে। আমিও করলাম। কিন্তু না, আমার দুঃস্বপ্ন শেষ না হয়ে বরং আরও বেড়ে চলল। দেখালাম সে হাত বাড়িয়ে আরও একপা এগিয়ে এসে একেবারে আমার গা ঘেঁসে দারিয়েছে। এই মুহূর্তে আমি তার গরম নিঃশ্বাসের স্পর্শ অনুভব করছি। কোন সাধারণ মানুষের নিঃশ্বাস এতোটা গরম হতে পারে না। এ নিঃশ্বাস-কে গরম না বলে তপ্ত বলাই ভালো।
সে আবার জিজ্ঞেস করল – “বল, কেন আমাকে খুন করেছিলে।”

অনেক দিন পড়ে এই নারীমূর্তি আমাকে আট বছর আগের ঘটে যাওয়া ঘটনাটা আবার মনে করতে বাধ্য করলো। আমি কখনো সেই রাতের কথা মনের ভুলেও স্মরণ করতে চাইনি। এ পৃথিবীর জীবিত আর কেউ জানে না সে রাতে কি ঘটেছিল। যদি জানতো তাহলে আমার কি শাস্তি হতো সেটা আমি নিশ্চিত না, কিন্তু দীর্ঘ কারাগার যাপন অথবা ফাঁসি যে কোন কিছুই হতে পারতো। তাই মনের ভুলেও আমি ওই রাত স্মরণ করতে চাইনি কখনও।

আমাদের বিয়ের পর তখন তিন বছরও পার হয়নি। আমাদের মাঝে ভালবাসার কখনো কোন কমতি হয়নি। কিন্তু কোন এক ঘটনাক্রমে অফিসের এক মেয়ের সাথে প্রেমে জড়িয় পড়ি। সে মেয়ে ক্রমাগত বিয়ের তাগাদা দিয়ে যাচ্ছিল। অনেকদিন যাবত মানসিক এক অস্থিরতায় কেটেছে আমার আমার। এমন সময় একদিন লঞ্চে করে গ্রামের বাড়িতে যাবার দরকার হয়ে পড়লো। মাঝরাতে টর্নেডোতে লঞ্চটা ডুবে যায়। আমরা দুজন কোনমতে একটা লাইফবয়ে ভর করে রাতের অন্ধকারে নদিতে ভাসতে থাকি। যা কখনো স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি, সেই চিন্তাটা, সেই ভয়ানক চিন্তাটা ওই লাইফবয়ে ভাসতে ভাসতেই মাথায় আসে। নারীমূর্তির ফের প্রশ্ন- “বল, আমার কি অপরাধ ছিল যে আমাকে মেরেই ফেলতে হবে। কেন আমাকে নদীর পানিতে ডুবিয়ে দিলে?”

এর উত্তরে কী বলব ভেবে পেলাম না। আমি কি বলবো যে আমার মনের পাপ আমাকে দিয়ে ওটা করিয়েছে? একটা মেয়ে আমার সাথে এক ভেলায় ভাসছে বেঁচে থাকবে বলে। অনেকক্ষন ঝড় ঝঞ্জার মাঝে নদির ঢেউয়ের সাথে যুদ্ধ করতে করতে সে দুর্বল হয়ে পড়েছে। কোনমতে হাত দুটো লাইফবয়ের মধ্যে দিয়ে তার উপর বুকের ভর দিয়ে এখনও নদিয়ে ভেসে আছে। পাশে আমি। একসময় সে আরও দুর্বল হয়ে প্রায় বেহুঁশের মতো অবস্থা। গায়ে এতোটুকু শক্তি নেই। হয়তো তার শেষ ভরসা আমি পাশে আছি। কিন্তু সে তো জানে না ওই মুহূর্তেই আমার মাথায় কি শনির খেলা শুরু হয়েছিলো। আমার হাত তার হাতের উপর রাখা ছিল তাকে ধরে রাখার জন্য। সে হাত প্রায় অবশ। আমি আস্তে আস্তে তার দুটি হাতই লাইফবয় থেকে ছাড়িয়ে দিয়েছিলাম। তার কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই অতল নদির কোথায় সে ভেসে গেছে বা ডুবে গেছে তার কিছুই সেই অন্ধকারে দেখতে পেলাম না।

তাকে এই মুহূর্তে কিছু বলার মতো আমার আর মুখ নেই। আমার চোখে মুখ থেকে এখন আতংক আর ভয় কেটে গেছে। কিন্তু এক প্রবল অপরাধবোধ সেই জায়গাটা দখল করেছে। আমি আর এখন নিজেকে দাড় করিয়ে রাখতে পারলাম না। আমার সামনের সেই নারীমূর্তি এখন আর আমার কাছে কোন ভয়ের কেউ নয়, তাকে দেখে আমি আর আতংকিত হচ্ছি না। তাকে এখন আমার মনে হচ্ছে আজ আট বছর আগের অপরাধের বিচার করতে এক বিচারক দাঁড়িয়ে আছে। আমি হাঁটু গেড়ে তার সামনে বসে পরলাম। মাথা মেঝের দিকে নুইয়ে চোখ বন্ধ করে আছি আমি। আমার দুচোখ দিয়ে অঝরে পানি পরছে। জীবনে হয়তো এই প্রথম অনবরত গুঙিয়ে কাঁদছি।
তার কণ্ঠ শুনতে পেলাম, কিন্তু খুবই নিচু কণ্ঠে সে বলল-“কেন করলে, কিসের আশায়?”
মাথা নিচু রেখেই বললাম- “ভুল করেছি, মহাপাপ করেছি। আমাকে মাফ করে দাও যদি পারো।“
– “কী পেলে?”
আমি কী করে এর উত্তর দেবো। কিছু পাবার বদলে যে আমি সব হারিয়েছি তা তো আমাকে দেখে যে কেউ বুঝবে। সেও নিশ্চয়ই জানে।

আমি পাপ আর অপরাধের অনুশোচনায় তখনও তার পায়ের সামনে হাঁটু গেড়ে বসা। আমার চোখ বন্ধ। এভাবে কতক্ষণ কেটেছে জানি না। একসময় চোখ খুলে দেখি আমার সামনে সেই নারীমূর্তি আর নেই। ঘরের চারিদিকে তাকিয়ে কোথাও তাকে দেখলাম না। জানালার কাছে দৌড়ে এসে বাইরে তাকিয়ে দেখি কেউ নেই। বৃষ্টিটা এতক্ষণে কমে আসেছে।
সোফায় গিয়ে বসে ভাবতে থাকলাম এই ঝড় ঝঞ্জার রাতে কী ঘটে গেলো। সে কি এসেছিলো আমার পাপের শাস্তি দিতে? নাকি আমাকে আজীবন নিজের পাপের স্মৃতি স্মরণ করিয়ে আত্মগ্লানিতে ডুবিয়ে দিতে?

এসব ভাবতে ভাবতেই বিদ্যুৎ চলে এলো। সোফা থেকে উঠতে যাবো, এমন সময় তার সামনের টেবিলটার উপর আলোতে জ্বলজ্বল করে উঠলো জিনিসটা। ওর হাতে যে বালা জোড়া ছিল সেইটা।

 

আরখান সোহেল 
টরন্টো, কানাডা
Jui  Banner Campaign
ট্যাগ: গল্পছোটগল্পবড়গল্প
শেয়ারTweetPin

সর্বশেষ

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনায় গণভোট প্রচারে যুক্ত হলো বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো

জানুয়ারি ২৭, ২০২৬

প্রচারে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন প্রার্থীরা

জানুয়ারি ২৭, ২০২৬

সম্প্রচার সাংবাদিকতা নীতি নৈতিকতার নতুন হ্যান্ডবুক নিয়ে চ্যানেল আইয়ে মতবিনিময়

জানুয়ারি ২৭, ২০২৬

‘গণভোট নিয়ে বিভ্রান্তি কেন?’, আসিফ সালেহের প্রশ্ন ও সমালোচনা

জানুয়ারি ২৭, ২০২৬

যশোরকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করা হবে: জামায়াত আমির

জানুয়ারি ২৭, ২০২৬
iscreenads

প্রকাশক: শাইখ সিরাজ
সম্পাদক: মীর মাসরুর জামান
ইমপ্রেস টেলিফিল্ম লিমিটেড , ৪০, শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ সরণী, তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮, বাংলাদেশ
www.channeli.com.bd,
www.channelionline.com 

ফোন: +৮৮০২৮৮৯১১৬১-৬৫
[email protected]
[email protected] (Online)
[email protected] (TV)

  • আর্কাইভ
  • চ্যানেল আই অনলাইন সম্পর্কে
  • চ্যানেল আই সম্পর্কে
  • চ্যানেল আই সকল সোস্যাল মিডিয়া

Welcome Back!

Login to your account below

Forgotten Password?

Retrieve your password

Please enter your username or email address to reset your password.

Log In

Add New Playlist

No Result
View All Result
  • প্রচ্ছদ
  • চ্যানেল আই লাইভ | Channel i Live
  • বাংলাদেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • স্বাস্থ্য
  • স্পোর্টস
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • কর্পোরেট নিউজ
  • আইস্ক্রিন
  • অপরাধ
  • আদালত
  • মাল্টিমিডিয়া
  • মতামত
  • আনন্দ আলো
  • জনপদ
  • আদালত
  • কৃষি
  • তথ্যপ্রযুক্তি
  • নারী
  • পরিবেশ
  • প্রবাস সংবাদ
  • শিক্ষা
  • শিল্প সাহিত্য
  • চ্যানেল আই সকল সোস্যাল মিডিয়া

© 2023 চ্যানেল আই - Customize news & magazine theme by Channel i IT