মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ৯০ মিনিটের এক ফোনালাপে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ (এনরিচমেন্ট) ইস্যুতে তাকে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, প্রস্তাবটি ইরান থেকে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে নেওয়ার সম্ভাব্য পরিকল্পনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
তবে ট্রাম্প দাবি করেন, তিনি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে পুতিনকে বরং ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করার দিকে মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
এদিকে জাতিসংঘের পারমাণবিক তদারকি সংস্থা আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা জানিয়েছে, মস্কো এখনও ইরান থেকে ইউরেনিয়ামের মজুদ সরিয়ে নিতে আগ্রহী। পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ক্ষেত্রে এই মজুদ একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
ট্রাম্প ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে নিউক্লিয়ার ডাস্ট হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, তেহরানের ইসলামী শাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর প্রধান কারণ এটি। ৬০ দিনের বেশি সময় ধরে চলা এ সংঘাতে তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে দেওয়া হবে না। একইসঙ্গে তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে ইরানের সামরিক সক্ষমতায় বড় ধরনের ক্ষতি সাধন করেছে।
ইরানের ‘নিউক্লিয়ার ডাস্ট’ কতটুকু?
গত আট বছরে, ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে করা পারমাণবিক চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার পর, নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান প্রায় ২২ হাজার পাউন্ড বা প্রায় ১১ টন সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম জমা করেছে।
তবে এই বিপুল মজুদের বর্তমান অবস্থান এখনও অনিশ্চিত। আইএইএ মনে করছে, এর বেশিরভাগই ইরানের ইসফাহান পারমাণবিক কমপ্লেক্সে রয়েছে, যা গত বছরের জুনে বিমান হামলার শিকার হয় এবং চলতি বছরের যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল হামলায়ও আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
আইএইএ প্রধান রাফায়েল গ্রসি স্যাটেলাইট চিত্রের ভিত্তিতে জানান, ২০২৫ সালের জুনে ১২ দিনের যুদ্ধ শুরুর সময় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সেখানে সংরক্ষিত ছিল এবং এখনো সেখানেই থাকতে পারে। তবে সরাসরি পরিদর্শনের সুযোগ না থাকায় বিষয়টি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
ইউরেনিয়াম মজুদ নিয়ে জটিলতা
ইউরেনিয়াম নিম্নমাত্রায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত হলেও উচ্চমাত্রায় এটি ভয়াবহ ধ্বংসাত্মক অস্ত্রে পরিণত হতে পারে। আইএইএ অনুযায়ী, ইরানের কাছে বর্তমানে ৪৪০ দশমিক ৯ কেজি ইউরেনিয়াম রয়েছে, যা ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ যা ৯০ শতাংশ অস্ত্রমানের খুব কাছাকাছি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউরেনিয়ামের সমৃদ্ধকরণ যত বাড়ে, পরবর্তী ধাপে পৌঁছানো তত সহজ হয়। শূন্য থেকে ২০ শতাংশে পৌঁছানো যেখানে কঠিন, সেখানে ২০ থেকে ৬০ বা ৯০ শতাংশে পৌঁছানো তুলনামূলক সহজ।
ইরান ২০০৬ সাল থেকে শিল্প পর্যায়ে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শুরু করে, যদিও দেশটি দাবি করে এর উদ্দেশ্য শান্তিপূর্ণ। ২০১০ সালে তারা ২০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধকরণ শুরু করার ঘোষণা দেয়, যা গবেষণা রিঅ্যাক্টরের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের কথা বলা হয়। তবে এই মাত্রা সামরিক ব্যবহারের দিকেও অগ্রগতির ইঙ্গিত দেয় বলে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়।
চুক্তি, প্রত্যাহার ও নতুন উত্তেজনা
২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ছয়টি দেশ ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে, যেখানে ইউরেনিয়ামের সমৃদ্ধকরণ ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশে সীমাবদ্ধ রাখা হয় এবং মজুদের পরিমাণও নিয়ন্ত্রণ করা হয়। চুক্তি অনুযায়ী, ইরান তার মজুদ ৬৬০ পাউন্ডের নিচে নামিয়ে আনে।
তবে ২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রশাসন চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ালে ইরান নির্ধারিত সীমার বাইরে সমৃদ্ধকরণ শুরু করে। ২০২১ সালের শুরুতে তারা আবার ২০ শতাংশে পৌঁছে যায় এবং পরবর্তীতে তা ৬০ শতাংশে উন্নীত করে।
২০২৫ সালে ট্রাম্প পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর আইএইএ জানায়, ইরানের ইউরেনিয়াম মজুদ দ্রুততম হারে বাড়তে শুরু করে। একই বছরের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের পর ইরান আইএইএর সঙ্গে সহযোগিতা স্থগিত করে, ফলে তাদের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর সরাসরি তদারকি বন্ধ হয়ে যায়।
উল্লেখ্য, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপি)-এর সদস্য হলেও, বর্তমানে সরাসরি পরিদর্শনের অভাবে স্যাটেলাইট নজরদারিই তাদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের একমাত্র উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে ১১ টন ইউরেনিয়াম মজুদের সুনির্দিষ্ট অবস্থান এখনও অজানা।








