দেশে সাইবার অপরাধে ৮ ধরনের অভিযোগ পাওয়া যায়। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারকারীদের নিরাপদ ব্যবহারের নূন্যতম ধারনা দেওয়া জরুরি বলছেন সংশ্লিষ্ঠরা।
শনিবার (১ অক্টোবর) বাংলাদেশ উইম্যান ইন্টারনেট গর্ভনেন্স ফোরাম এর উদ্যোগে ‘কম্বাইন্ড টেকনোলজি ফ্যাসিলিটিজ জেন্ডারবেইজড ভায়োলেন্স’ শীষর্ক সেমিনারে বক্তরা এই কথা বলেন। রাজধানীর আন্তর্জাতিক মার্তভাষা ইন্সটিটিউটে বাংলাদেশ ইন্টারনেট গর্ভনেন্স ফোরাম বিআইজিএফ’র উদ্যোগে তথ্য প্রযুক্তির নিরাপদ ও কার্যকর ব্যবহারে দিনব্যাপী সেমিনারের আয়োজন করে।
বাংলাদেশ ইন্টারনেট গর্ভনেন্স ফোরামের সহযোগী সংগঠন হিসেবে উইম্যান ইন্টারনেট গর্ভনেন্স ফোরাম তৃতীয় বারের মত তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক জ্ঞান, দক্ষতা, ধারনা এবং নিরাপত্তায় সচেতনাতা বাড়াতে ছিল এই আয়োজন।
তৃতীয় ও শেষ দিনে উইম্যান ইন্টারনেট গর্ভনেন্স ফোরামের আলোচনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইউএনএফপি এর জেন্ডার এন্ড হিউম্যান প্রজেক্টের ন্যাশনাল প্রোগ্রাম অফিসার আবু সৈয়দ সুমন।
চতুর্থবারের মত অনুষ্ঠিত উইমেন ইন্টারনেট গভনেন্স ফোরামের এবারের আয়োজনের আরো উপস্থিত ছিলেন, ইউএন উইমেন ওম্যান এর প্রোগ্রাম কোর্ডিনেটর সারবানা দত্ত, সাউথ এশিয়ান উইমেন নেটওয়ার্ক এর খন্দকার ফৌজিয়া ইভা এবং ডিজস্টার ম্যানেজমেন্টের পরিচালক, যুগ্ম সচিব নাহিদ সুলতানা মল্লিক এবং ন্যাশনাল লিগ্যাল এইড সার্ভিসেস’র সহকারি পরিচালক আরিফা চৌধুরী হিমেল, আইপাস বাংলাদেশ’র প্রোগ্রাম প্রজেক্ট ডিরেক্টর ডা. রাহাত আরা নূর এবং উইমেন ইন্টারনেট গর্ভনেন্স’র চেয়ারপারসন শামীমা আকতার অংশ নেন।
মূল প্রবন্ধে আবু সৈয়দ সুমন জানান, বিশ্বব্যাপীই সাইবার অপরাধের ঘটনা ঘটছে। গ্লোবালি প্রতি তিন জন নারীর দুই জনই তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার সংক্রান্ত সহিংসতার শিকার হচ্ছে। উত্তর আমেরিকায় প্রতি দশ জনে সাত জন। ল্যাটিন আমেরিকায় ১০ জনে নয় জন এবং মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সবাই কোন না কোন ভাবে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুবাধে নানান ধরনের সহিংসতার শিকার হয়। বাংলাদেশেও সাইবার অপরাধে ৮ ধরনের অভিযোগের ঘটনা ঘটে থাকে। এর মধ্যে অন্যতম হলো সাইবার বুলিং, ব্লাকমেইলিং, আইডি হ্যাক, তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য ও ছবির অপব্যবহার অন্যতম।
সেমিনারে প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের নাসরিন নাহার বলেন, অবাধ তথ্য প্রযুক্তির এই সময়ে প্রযুক্তির ব্যবহার ঠেকানো সম্ভব নয়। তবে ইন্টারনেট ব্যবহারীদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং তাদের সব ধরণের সুরক্ষায় তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার জনিত বিভিন্ন ঝুঁকি ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়গুলো সম্পর্কে নূন্যতম ধারনা দেওয়া দরকার।
ইউএন উইমেন এর প্রতিনিধি সারবানা দত্ত বলেন, প্রযুক্তির ব্যবহারের সাথে সাথে এর অপব্যবহার ও নানান ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে নারীরাই প্রযুক্তি সংশ্লিষ্ঠ সহিংসতার শিকার হচ্ছে বেশি। তাই তথ্য প্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চত করতে মৌলিক তথ্যগুলো সকলকে জানানোর জন্য কার্যক্রম হাতে নেওয়া উচিত। আর কাজটি করছে ‘ইউএন উইমেন’। তবে বিভিন্ন পর্যায়ে বিক্ষিপ্তভাবে যেসব কাজ হচ্ছে, তা সমন্বয় করার প্রতি জোর দেন তিনি।
আই পাস বাংলাদেশের ডা. রাহাত আরা নূর বলেন, প্রযুক্তি বিষয়ক বা ইন্টারনেট ভিত্তিক নানান ডিভাইস ব্যবহারের ঝুঁকিতে তরুণ কিশোর-কিশোরী এবং নারীরা। সচেতনাই পারে তথ্য প্রযুক্তির অপব্যবহার ও নিরাপত্তা জনিত নানান ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দিতে পারে।
খন্দকার ফৌজিয়া ইভা বলেন, সব বয়সী নারীরাই তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহারের সময় নানান ভাবে হেনস্থার শিকার। তবে অল্প বয়সী, উঠতি বয়সের কিশোর-তরুণ-তরুণী নানাভাবে না বুঝে ব্যবহার করাই বেশি সহিংসতার শিকার হচ্ছে।
যুগ্ম সচিব নাহিদ সুলতানা মল্লিক বলেন, সন্তানদের হাতে তথ্য প্রযুক্তির অবাধ ব্যবহারের সুযোগ না দেওয়া আহবান জানান। তবে প্রযুক্তি সংশ্লিষ্ঠ নানান ডিভাইস সন্তানদের হাতে তুলে দেওয়ার আগে এর নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করার বিষয়ে ধারনা দেওয়ার পরামর্শ তাঁর। উন্নত দেশে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মায়েদের ক্লাব গড়ে তুলে, এই তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক নূন্যতম ধারণা দেওয়া হচ্ছে। আমাদের এদেশেও স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসাগুলোতে বিজ্ঞান নির্ভর তথ্য ও জ্ঞানের মাধ্যমে তথ্য প্রযুক্তির নিরাপদ ও ইতিবাচক ব্যবহারে শিক্ষার্থীদের সহায়তা করা যেতে পারে।
ন্যাশনাল লিগ্যাল এইড সার্ভিসেস এর সহকারি পরিচালক আরিফা চৌধুরী হিমেল জানান, তথ্য প্রযুত্তির অপব্যবহারে নারীরা যে সব সহিংসতার শিকার হচ্ছে তার প্রতিকারে ন্যাশনাল লিগ্যাল এইড সার্ভিসে সেবা দিচ্ছে। ইতোমধ্যে ১৬৬৯৯ এই নম্বরে ভুক্তভোগীরা প্রতিকার চেয়ে সাহায্য পেতে পারেন।
তিনি বলেন, উন্নত দেশে তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে সে সব সাইবার অপরাধ হচ্ছে তা মোকাবেলায় সমাজের বিভিন্ন বেসরকারী সংশ্লিষ্ঠ প্রতিষ্ঠান আদালত ও বিচারকের সাথে সংযুক্ত থেকে সহায়তাকারী হিসেবে কাজ করছেন। এতে করে একটি কেন্দ্র থেকেই ভুক্তভোগীরা প্রয়োজনীয় সহায়তা পাচ্ছে এবং তা স্বল্প সময়ের মধ্যেই প্রতিকার পাওয়া নিশ্চিত করা যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, এদেশে এমনিতেই মামলা জটের কারণে আদালতগুলো ভারাক্রান্ত। এক্ষেত্রে ন্যাশনাল লিগ্যাল এইড সার্ভিসেস সাইবার অপরাধগুলো গুরুত্ব দিয়ে সমাধানের চেষ্টা করছে।
অনুষ্ঠানে সংশ্লিষ্টরা জানান, সাইবার অপরাধ নিয়ে বাংলাদেশ পুলিশে একটি বিশেষজ্ঞ টিম কাজ করছে। তবে প্রয়োজনের তুলনায় লোকবল কম। এক্ষেত্রে পুলিশ, আইনজীনী, শিক্ষক, সাংবাদিক, স্কুল, কলেজ ও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী এরকম নানান উদ্দীষ্ঠ জনগোষ্ঠী ও পেশাজীবীদের তথ্য প্রযুক্তি বিষয় আরো বিশদ জ্ঞান, দক্ষতা ও নিরাপদ ব্যবহারের পর্যায়ক্রমিক প্রশিক্ষণের জন্য কাজ করার উপর জোর দেন। তবে সরকারি বেসরকারী পর্যায়ে সমন্বয় করেই কাজগুলো করা উচিত বলেও মন্তব্য করেন বক্তারা।
অনুষ্ঠানে উইমেন ইন্টানেট গর্ভনেন্স ফোরাম ‘ইউমেন আইজিএফর’র সেক্রেটারি জেনারেল শারমীন ইসরাইল, ভাইস প্রেসিডেন্ট চ্যানেল আই’র বিশেষ প্রতিনিধি সাংবাদিক জান্নাতুল বাকেয়াসহ এক্সিকিউটিভ কমিটির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।








