ময়মনসিংহে হামে মৃত্যুর সংখ্যা দিন দিনে বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামের উপসর্গে আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে হাসপাতালে ৭২ দিনে ৪১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ১৭ মার্চ থেকে আজ পর্যন্ত ৭২ দিনেও একটি আইসিইউ স্থাপন করতে পারেনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন সকলেই।
বুধবার (২৭ মে) ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
হাসপাতালের সিনিয়র স্টোর অফিসার ডা. ঝন্টু সরকার বলেন, মৃত ১৭ মাস বয়সী শিশু গত ২০ মে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছিল। গতকাল দুপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। সে নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার বাসিন্দা। অপর ৫ মাস বয়সী শিশু গত ৬ মে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামের উপসর্গে ভর্তি হয়েছিল। গতকাল রাতে তার মৃত্যু হয়। সে নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার বাসিন্দা।
হাসপাতাল সুত্র জানায়, গত ১৭ মার্চ থেকে আজ সকাল পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ১ হাজার ৬২৩ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ১ হাজার ৫৩৫ শিশু। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে ১৪ শিশু। হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ২৭ শিশু। হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি রয়েছে ৪৭ শিশু।
গাজীপুর শ্রীপুরের গড়গড়িয়া মাস্টার বাড়ির বাসিন্দা চা দোকানদার পারভেজ মোশাররফ। সম্প্রতি তার সন্তান রাফসানের জ্বর ও নিউমোনিয়া দেখা দিলে শুরু হয় ছোটাছুটি। ২৬ এপ্রিল হামের টিকা দেওয়ার পর ফের তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। মাওনা আল হেরা হাসপাতাল থেকে গত ৫ মে তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেলে রেফার্ড করা হয়। এরপর থেকে হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে ছিল শিশুটি। কিন্তু শেষ রক্ষা আর হলো না। সন্তান হারানো বাবা পারভেজ মোশাররফের বুকফাটা আর্তনাদে ভারি হয়ে উঠে হাসপাতাল। বিলাপ করে তিনি বলছিলেন, ছেলেকে বাঁচাতে চেষ্টার কমতি রাখিনি। আক্ষেপ শুধু একটাই, যদি একটা আইসিইউ থাকত, তাহলে হয়তো আমার কোল খালি হতো না। বিভাগীয় শহরের হাসপাতালে আইসিইউ থাকবে না, এটা মেনে নেওয়া যায় না। হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, আইসিইউর বিকল্প হিসাবে প্লাস্টিকের একটি পানির বোতলের সাহায্যে বিশেষ পদ্ধতিতে যন্ত্রটি তৈরি করা হয়েছে। যন্ত্রটি শিশুটির শয্যার নিচে রাখা হয়। বোতলে পানি ও সেটিতে একটি নল লাগানো। যার মাধ্যমে হাসপাতালের কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহের সঙ্গে সংযোগ ঘটিয়ে শিশুটির নাক দিয়ে অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে।
শিশুদের আইসিইউ না থাকায় হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন শিশুদের যখন অতিরিক্ত শ্বাসকষ্ট শুরু হয় এবং আইসিইউয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা সৃষ্টি হয়, তখন বিকল্প হিসেবে বাবল সিপ্যাপ ব্যবহার করার কথা জানান ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ও হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডের দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক মাজহারুল আমিন।
তিনি বলেন, বাবল সিপ্যাপ তৈরিতে সরকার প্রশিক্ষণ দিয়েছে এবং বাবল সিপ্যাপ সরবরাহ করেছে। নির্দেশনা অনুযায়ী যে বাচ্চাদের অতিরিক্ত শ্বাসকষ্ট হচ্ছে, স্বাভাবিক অক্সিজেনে যাদের অক্সিজেন স্যাচুরেশনের মাত্রা কমে যায়, সেই বাচ্চাদের সাধারণত বাবল সিপ্যাপ দিয়ে থাকেন।
হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডের ফোকাল পারসন ও সহযোগী অধ্যাপক মোহা. গোলাম মাওলা বলেন, হামের টিকা নেওয়া শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় সংক্রমণ কমে আসছে। যার ফলে আক্রান্তের পাশাপাশি হাসপাতালে ভর্তি কমছে। তবে যেসব শিশু মারা যাচ্ছে তারা হামের পাশাপাশি অন্য রোগেও আক্রান্ত ছিল।
হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. মো. জাকিউল ইসলাম বলেন, আমরা আইসিইউ’র জন্য আবেদন করেছি। সরকার থেকে বরাদ্ধ পেলেই আইসিইউ স্থাপন করা হবে।








