সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতদের পরিবারকে দেয়া হয়েছে ৩২২ কোটি টাকা

ছবি: সংগৃহীত
আইনের আলোকে সড়ক পরিবহন বিধিমালা কার্যকর হওয়ার পর সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত ৭ হাজার ৮৭৭ জনের পরিবারকে ৩২২ কোটি ৮৯ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দেয়া হয়েছে।
সড়ক পরিবহন আইন ও বিধিমালার অধীন সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীকে আর্থিক সহায়তা প্রদানের উদ্দেশ্যে ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। সড়ক পরিবহন বিধিমালা-২০২২ কার্যকর হওয়ার মাধ্যমে ট্রাস্টি বোর্ডের আওতায় সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সহায়তা প্রাপ্তির আবেদন গ্রহণ করা হয়। আর সড়ক পরিবহন বিধিমালার ১৫০(১) উপবিধি অনুযায়ী সড়ক দুর্ঘটনা সংঘটনের ৯০ দিনের মধ্যে নির্ধারিত ফর্ম-৩২ এর মাধ্যমে আর্থিক সহায়তার আবেদন করা যায়।
বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) এর আইন উপদেষ্টা সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ রাফিউল ইসলাম বলেন, কেউ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত বা আহত হলে সড়ক পরিবহণ আইন- ২০১৮ ও সড়ক পরিবহণ বিধিমালা ২০২২ অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট ক্ষতিপূরণ পাওয়ার বিধান রয়েছে।
ভুক্তভোগীরা যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আবেদন করলে ট্রাস্টি বোর্ড দুর্ঘটনায় বিধি অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন।
আইনজীবী মোহাম্মদ রাফিউল ইসলাম বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ১৬২ জনকে আর্থিক সহায়তার চেক প্রদানের কার্যক্রম শুরু হয় ২০২৩ সালের ১৯ অক্টোবর। ট্রাস্টি বোর্ডের চেক বিতরণের বিবরণী অনুযায়ী সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত ৭ হাজার ৮৭৭ জনের জন্য ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ৩২২ কোটি ৮৯ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দেয়া হয়েছে। যেখনে গত জানুয়ারি থেকে এই অক্টোবর পর্যন্ত দেয়া হয়েছে ২০৬ কোটি ৮ লাখ টাকা। এ পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা পাওয়া ৭ হাজার ৮৭৭ জনের মধ্যে আহত ১৪৩২ জন, গুরুতর আহত ৬৮৪ জন এবং নিহত ৫৭৬১ জনের পরিবারকে তাদের প্রাপ্য টাকার চেক দেয়া হয়েছে।
দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণে আর্থিক সহায়তা ৫ লক্ষ টাকা
২০২২ সালের সড়ক পরিবহণ বিধিমালার ১৪৯ বিধি অনুযায়ী দুর্ঘটনায় নিহত বা আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করলে আর্থিক সহায়তার পরিমাণ হবে এককালীন অন্যূন ৫ লক্ষ টাকা। আর দুর্ঘটনা কবলিত ব্যক্তির গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গহানি হলে আর্থিক সহায়তার পরিমাণ হবে অন্যূন ৩ লক্ষ টাকা। এছাড়া গুরুতর আহত ও চিকিৎসার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সম্ভাবনা না থাকলে আর্থিক সহায়তার পরিমাণ হবে অন্যূন ৩ লক্ষ টাকা। তবে গুরুতর আহত কিন্তু চিকিৎসার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সম্ভাবনা থাকলে আর্থিক সহায়তার পরিমাণ হবে অন্যূন ১ লক্ষ টাকা।
এদিকে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ হাসিবুর রহমান বাসস’কে বলেন, সড়ক দূর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সহায়তা বা ক্ষতিপূরণ দেয়াই সবকিছুর শেষ কথা নয়। সড়ক দুর্ঘটনা যাতে রোধ করা যায় কিংবা একেবারে কমিয়ে আনা যায় সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। আর সড়কে যানবাহন চলাচলের ক্ষেত্রে আইনের যথাযথ প্রয়োগের পাশাপাশি আমাদের নাগরিকদের আরো দায়িত্বশীল হতে হবে।
দুর্ঘটনায় আঘাতপ্রাপ্ত ব্যক্তির দ্রুত চিকিৎসা
২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইনের ৬২(১) ধারায় বলা হয়েছে যে, কোনো সড়ক দুর্ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট মোটরযান চালক, কন্ডাক্টর বা তারের প্রতিনিধি তাৎক্ষণিকভাবে দুর্ঘটনা সম্পর্কে নিকটস্থ থানা, ফায়ার সার্ভিস, চিকিৎসা সেবা কেন্দ্র বা হাসপাতালকে অবহিত করবেন। সেই সাথে আঘাতপ্রাপ্ত ব্যক্তির জীবন রক্ষার্থে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিকটস্থ চিকিৎসা সেবা কেন্দ্র বা হাসপাতালে প্রেরণ ও চিকিৎসার ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
এই আইনে ৬২(১) ধারায় বলা হয়েছে যে, পুলিশ দেশব্যাপী টোল ফ্রি টেলিফোন নম্বর প্রবর্তন করবে। যে নম্বরের মাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনা কবলিত মোটরযানের চালক, কন্ডাক্টর, মালিক, প্রতিষ্ঠান বা পরিচালনাকারী বা তাদের প্রতিনিধি বা তাদের পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি বা যাত্রী বা সড়ক দুর্ঘটনা প্রত্যক্ষকারী কোনো ব্যক্তি দুর্ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নম্বরে টেলিফোন করে জরুরি উদ্ধার কিংবা চিকিৎসা জন্য তাৎক্ষণিক সহায়তা চাইতে পারবেন।
হাইকোর্টের রায়ে ক্ষতিপূরণের দৃষ্টান্ত
সড়ক পরিবহণ আইনের মাধ্যমে আর্থিক সহায়তার বাইরে হাইকোর্টে রিট মামলা করে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার কয়েকটি দৃষ্টান্ত রয়েছে। এক্ষেত্রে বাসের চাপায় পা হারান রাসেল সরকারের ক্ষতিপূরণ পাবার রায়টি দৃষ্টান্তমূলক। ২০১৮ সালের ২৮ এপ্রিল কেরানীগঞ্জ থেকে ঢাকায় ফেরার পথে যাত্রাবাড়ীর হানিফ ফ্লাইওভারে গ্রিন লাইন পরিবহনের বাসের চাপায় একটি পা হারান তরুন প্রাইভেটকারচালক রাসেল সরকার। পরবর্তীতে রাসেলের পা হারানোর এই ঘটনায় রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানায় একটি মামলা হয়। অন্যদিকে ক্ষতিপূরণ চেয়ে একটি রিট করা হয় হাইকোর্টে। সে রিটের শুনানি শেষে বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রাসেল সরকারকে ক্ষতিপূরণ দিতে রায় দেন। হাইকোর্টের এই রায়ের পর গ্রিন লাইন কর্তৃপক্ষ ৩০ লাখ টাকা এবং চিকিৎসাবাবদ ৩ লাখ ৪০ হাজার টাকা দিয়েছেন বলে বাসস’কে জানান রাসেল সরকার।
সাভারের সিআরপি থেকে একটি কৃত্রিম পা লাগানো হয়েছে জানিয়ে রাসেল সরকার বলেন, হাইকোর্টের প্রতি চির কৃতজ্ঞ। হাইকোর্টের রায়েই মোট ৩৩ লাখ ৪০ টাকা হাজার টাকা পেয়েছি। তবে যে ক্ষতি আমার হয়েছে তা তো আর টাকায় পূরণ হবার নয়।






