পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার চরকাজল ইউনিয়নের চরশিবায় বিএনপি ও গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে নারীসহ উভয় পক্ষের অন্তত ২৫ জন আহত হয়েছেন। আহতদের অনেকে গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হয়েছেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার (৬ নভেম্বর) রাত ৯টার দিকে চরশিবা গ্রামের দক্ষিণ কপালবেড়া খলিফা বাড়ির সামনের চৌরাস্তায় এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় উভয়পক্ষ একে অপরকে দোষারোপ করছেন।
আহতদের মধ্যে রয়েছেন, চরশিবা ওয়ার্ড যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস রাড়ী, সদস্য সবুজ রাঢ়ী, নুরনবী রাঢ়ী, হাসান রাঢ়ী, কুদ্দুস ব্যাপারী, ইয়াকুব রাঢ়ী, ওমর রাঢ়ী, রাহান রাঢ়ী, সলেমান রাঢ়ী ও অন্যরা। তারা সবাই বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের রাজনীতির সাথে জড়িত।
অন্যদিকে গণঅধিকার পরিষদের আহতদের মধ্যে রয়েছেন যুব অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মো. সোহেল খলিফা। আজমির খলিফা, শাহাবুল খলিফা, আমেনা বেগম, নাঈম খলিফা ও নবীন খলিফা ও অন্যরা। তারা গণঅধিকার পরিষদের কর্মী-সমর্থক।
স্থানীয় সূত্র জানায়, চরশিবা সাংগঠনিক ইউনিয়নের ৯ নং ওয়ার্ডে কমিটি গঠন উপলক্ষে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কপালবেড়া বাজারে গণঅধিকারের সভা ছিল। সভায় বিভিন্ন স্থান থেকে নেতাকর্মীরা মোটরসাইকেল শোডাউন দিয়ে অংশ নেয়। অন্যদিকে ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে গলাচিপায় বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য হাসান মামুনের আগমনে রাতে শুভেচ্ছা মিছিল করে চরশিবা সাংগঠনিক ইউনিয়ন বিএনপি।
একদিকে সভা শেষ করে গণঅধিকার নেতাকর্মীরা ফিরছিল। অন্যদিকে মিছিল শেষে বিএনপির নেতাকর্মীরাও বাড়ি ফিরছিল। পথে দক্ষিণ কাপালবেড়া চৌরাস্তা বাজারে দুই দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সভায় লোক উপস্থিত হওয়া নিয়ে বাকবিতণ্ডা হয়। এসময় বিএনপির মনোনয়ন হাসান মামুন পাবে না, গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুর পাবে এ বিষয় নিয়ে তাদের তর্ক হয়। একপর্যায়ে দুই দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়।
আহত যুবদল নেতা ইলিয়াস রাড়ী বলেন, শুক্রবার (৭ নভেম্বর) হাসান মামুন ভাইয়ের প্রোগ্রাম উপলক্ষে রাতে আমরা কপালবেড়া বাজারে শুভেচ্ছা মিছিল করেছি। মিছিল শেষে বাড়ি ফেরার সময় গণঅধিকার পরিষদের কর্মীরা আমাদের লোকজনের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। গণঅধিকার পরিষদের ওয়ার্ড কমিটি গঠন উপলক্ষে কপালবেড়া বাজারে তাদের সভা ছিল। আমরা তাদের বলেছি, ৭ নভেম্বরের প্রোগ্রামে হাসান মামুন ভাই যে নির্দেশনা দেবেন, আমরা সেই অনুযায়ী কাজ করবো। কিন্তু তারা বলে, হাসান মামুন নমিনেশন পাবে না, গণঅধিকারের নুরুল হক নুরকে নমিনেশন দেওয়া হয়েছে। এই কথা বলেই তারা আমাদের লোকজনের ওপর হামলা চালায়।
আহত আজমীরের মা আমেনা বেগম বলেন, আমার ছেলে মোটরসাইকেল চালক। কিছুদিন আগে বিএনপির সভায় গাড়ি নিয়ে যেতে বলছিল সে যায় নাই। কিন্তু আজ গণঅধিকার পরিষদের সভায় যায়। সভা শেষ করে বাসায় ফেরার পথে চৌরাস্তায় বিএনপির লোকজন তাকে ধরে মারধর করে। আমার বাসার সামনেই ঘটনা ঘটে। আমি ছেলেকে বাঁচাতে দৌড়ে গেলে আমাকেও মারধর করে।
অন্যদিকে আজমীরের বাবা শাহাবুল খলিফা বলেন, আমরা গণঅধিকার পরিষদ করি। এর আগে চরবিশ্বাসে বিএনপি ও গণঅধিকার পরিষদের মারামারির ঘটনার পর চরশিবায় পোস্টার ছিড়ে ফেলে তারা। আগেই থেকেই ক্ষোভ ছিল তাদের এবং আজকে গণঅধিকারের সভায় লোকজন যাওয়ার কারণে মারধর করে।
যুবঅধিকারের ৯ নং ওয়ার্ড সাধারণ সম্পাদক সোহেল খলিফা বলেন, দু’পক্ষের মধ্যে মারামারি শুরু হলে বিএনপির লোকজন লাঠিসোঁটা নিয়ে এসে হামলা করে। আমরা প্রতিহত করার চেষ্টা করি । এসময় উভয়ের মধ্যে মারামারিতে বেশ কয়েকজন আহত হয়।
স্থানীয় সূত্রে আরও জানা গেছে, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গত ৩ নভেম্বর ২৩৭টি আসনে দলীয় প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেন। তবে পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা–দশমিনা) আসনে প্রার্থী ঘোষণা স্থগিত রাখে দলটি। এ নিয়ে সাধারণ মানুষ, বিএনপি ও গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে তীব্র বাকযুদ্ধ শুরু হয়। পৌর শহর ও বিভিন্ন ইউনিয়নে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা দলীয় প্রতীকে হাসান মামুনের মনোনয়ন চেয়ে দফায় দফায় বিক্ষোভ মিছিল করেছে। নেতাকর্মীরা দলীয় প্রার্থীর বাইরে বিকল্প কোন প্রার্থী মেনে নিতে নারাজ। এর ধারাবাহিকতায় উপজেলার চর শিবা সাংগঠনিক ইউনিয়নের চর কপালবেড়া নামক স্থানে গণঅধিকার পরিষদ ও বিএনপির কর্মীদের মধ্যে বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে দুই দলের মধ্যে সংঘর্ষ সৃষ্টি হয়। এরপর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে নুরুল হক নুরের ভাইয়ের নির্দেশে বিএনপির উপর হামলা করা হয়েছে।
এ ঘটনায় তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় নুরুল হক নুরের ভাই ও ঢাকা মহানগর উত্তর যুব অধিকার পরিষদের সহ সভাপতি আমিনুল ইসলাম নুর বলেন, আমি এলাকায় ছিলাম না। তবে বিষয়টি হল, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় চর কপালবেড়ায় ওয়ার্ড কমিটি গঠন নিয়ে গণঅধিকারের একটি সভা ছিল। অন্যদিকে ৭ নভেম্বর উপলক্ষে বিএনপির লোকজন মিছিল করে। মিছিল শেষে আমাদের নেতাকর্মীদের উপর তারা হামলা করেছে। এতে আমাদের বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, হাসান মামুন নমিনেশন না পাওয়ার কারণে বিএনপির লোকজন উশৃঙ্খলতা শুরু করছে। এলাকায় একটা ভয়ভীতি ও ত্রাসের রাজনীতি করতে চায়, যাতে গণঅধিকারে কেউ যোগ না দেয়।
এদিকে ঘটনার পর রাত ১২ টার দিকে আহতদের দেখতে গলাচিপা হাসপাতালে যান বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য হাসান মামুন। এসময় উভয় দলের আহতদের তিনি চিকিৎসার খোঁজখবর নেন। তিনি সকলকে ধৈর্য ও শান্তি বজায় রাখার জন্য অনুরোধ জানান।
হাসান মামুন বলেন, শুক্রবার আমাদের দলের একটি র্যালি রয়েছে, সে কারণেই নেতাকর্মীরা সংগঠিত হচ্ছিলেন। সেই প্রোগ্রাম ব্যাহত করার উদ্দেশ্যে হয়তো এ ধরনের তৎপরতা চালাতে পারে। আমি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অনুরোধ করবো, সঠিকভাবে তদন্ত করে সত্য উদঘাটন করুন এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন।
এবিষয় জানতে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরের কাছে সকালে মুঠো ফোনে যোগাযোগের বারবার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি
গলাচিপা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আসাদুর রহমান জানান, দুই পক্ষের মধ্যে মারামারি হয়েছে। ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, দুই পরিবারের সদস্যরা দুই রাজনৈতিক দলের সমর্থক। প্রভাব বিস্তার নিয়ে তাদের পারিবারিক বিরোধ আছে, এ নিয়ে সংঘর্ষ হতে পারে। সংঘর্ষে দু-পক্ষই আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
এখনো কেউ লিখিত অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে, ঘটনার পর চর কপালবেড়াসহ পুরো চরকাজল ইউনিয়নে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাতেই ঘটনাস্থল ও হাসপাতালে অবস্থান করছে বলে জানিয়েছে থানা সূত্র।







