শতাধিক দেশের ২৭৬ চলচ্চিত্র নিয়ে ‘১৭তম বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য ও মুক্ত চলচ্চিত্র উৎসব’ আয়োজন করছে বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম ফোরাম। একদিন আগেই এমন সংবাদ বিজ্ঞপ্তির পর দিনই ফোরামের আরো একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি। জানানো হয়, উৎসব স্থগিত!
উৎসব স্থগিতের সংবাদ বিজ্ঞপ্তির বার্তা প্রেরক হিসেবে নাম রয়েছে ফোরামের প্রবীণ সদস্য নির্মাতা তানভীর মোকাম্মেল, মোরশেদুল ইসলাম এবং মানজারে হাসীন মুরাদ-এর।
তাদের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়,“বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম ফোরাম এদেশের বিকল্পধারার স্বাধীন চলচ্চিত্রনির্মাতা ও নির্মাণকর্মীদের একটি স্বাধীন সংগঠন। প্রতি দুই বছর অন্তর বাংলাদেশ শর্টফিল্ম ফোরাম এই আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য ও মুক্ত চলচ্চিত্র উৎসবটির আয়োজন করে থাকে এবং প্রাণের আনন্দেই সবাই এই উৎসবে অংশ নেন। কিন্তু এবারে দেখা যাচ্ছে কোনো কোনো মহলের অযাচিত হস্তক্ষেপের ফলে চলচ্চিত্র উৎসবটি তার নিজস্ব মূল্যবোধ ও চরিত্র হারাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ শর্টফিল্ম ফোরামের জরুরী সাধারণ সভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের সিদ্ধান্তক্রমে এই উৎসবটি আপাতত: স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে অনুকূল পরিবেশে বাংলাদেশ শর্টফিল্ম ফোরামের নিজস্ব ঐতিহ্য ও স্বকীয়তা বজায় রেখে চলচ্চিত্র উৎসবটির আয়োজন করা হবে।”
ফোরামের প্রবীণ সদস্যদের পাঠানো এমন বিবৃতি প্রত্যাখান করে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়িই ‘১৭তম স্বল্পদৈর্ঘ্য ও মুক্ত চলচ্চিত্র উৎসব’ অনুষ্ঠিত হবে বলে জানান বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম ফোরামের সভাপতি জহিরুল ইসলাম।
নির্বাহী দায়িত্বে না থেকে ফোরামের প্যাডে বিবৃতি দেয়ায় সাংগঠনিক নিয়মে প্রবীণ সদস্যদের শোকজ দেয়ার কথাও এসময় জানান বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম ফোরামের বর্তমান সভাপতি।
চ্যানেল আই অনলাইনকে জহিরুল ইসলাম বলেন,“তানভীর মোকাম্মেল, মোরশেদুল ইসলাম, মানজারে হাসীন মুরাদ- তারা যদি ব্যক্তিগতভাবে কোনো বিবৃতি দিতে চান, তাহলে সেটা তারা দিতে পারেন। কিন্তু শর্টফিল্ম ফোরামের প্যাড ব্যবহার করে যে বিবৃতি তারা দিয়েছেন, সেটার এখতিয়ার উনাদের নাই। প্রথমত ফোরামের কোনো নির্বাহী দায়িত্বে তারা নেই। দ্বিতীয়ত গেল জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানে তাদের যে অবস্থান সেটা গণবিরোধী। এমনকি তানভীর মোকাম্মেল ভারতীয় পত্রিকায় সাক্ষাৎকার দিয়ে বলেছেন, জুলাই অভ্যুত্থান হচ্ছে সিআইয়ের অর্থায়নে আইএস এর সহযোগিতায় জামাত, হিজবুত ও ইসলামি দলগুলোর অভ্যুত্থান।”
চেতনাগত কারণেই ‘১৭তম স্বল্পদৈর্ঘ্য ও মুক্ত চলচ্চিত্র উৎসব’ আয়োজনের বিরোধীতা করছেন প্রবীণ সদস্যরা। এমনটা জানিয়ে জহিরুল ইসলাম বলেন, “এবারের উৎসব আমরা জুলাইয়ে শহীদদের উৎসর্গ করেছি, উৎসবে আমন্ত্রণ জানিয়েছি সংস্কৃতি ও তথ্য মন্ত্রণালয়ের দুজন উপদেষ্টাকে। এজন্যই প্রবীণ এই সদস্যরা বিরোধীতা শুরু করেছেন। এক পর্যায়ে তারা বলেছেন, দুজন উপদেষ্টাকে বাদ দিলে উনারা এই উৎসবটি করতে দিবেন। উনাদের এমন বক্তব্য আমরা অযৌক্তিক মনে করেছি। কারণ এরআগেও আওয়ামী লীগ বা বিএনপি কিংবা অন্যান্য আমলেও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় অর্থ্যাৎ সংস্কৃতি ও তথ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের আমন্ত্রণ জানিয়ে এসেছি, এবং তারা অংশ গ্রহণ করেছেন।”
ব্যক্তিগত কোনো বিরোধ কারো সাথে নেই জানিয়ে জহিরুল ইসলাম এসময় বলেন, উনাদের সাথে ব্যক্তিগত বিরোধ নেই। বরং প্রবীণ সদস্য হিসেবে তাদের আমরা সম্মান করি। কিন্তু তাদের সাথে আমাদের যে বিরোধ, সেটা চেতনাগত। উনারা পরাজিত ফ্যাসিবাদী চেতনা ধারণ করেন, আর আমরা যে চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে ফ্যাসিবাদকে পরাজিত করেছি, সেই চেতনার প্রতিনিধিত্ব করি। ফলে এই দুই চেতনার মধ্যে বিরোধ আছে, দ্বন্দ্ব আছে- সেটারই প্রতিফলন ঘটেছে আমাদের উৎসব করতে যাওয়ার মধ্য দিয়ে, এবং তাদের উৎসব না করতে যাওয়ার মধ্য দিয়ে।
ফোরামের সভাপতি মনে করেন, “ব্যক্তিগতভাবে আওয়ামী লীগের পতনের কারণে প্রবীণ এই সদস্যদের মধ্যে দিশেহারা ভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। সেটাকেই তারা নানাভাবে প্রকাশ করছেন। উৎসব স্থগিতের এই বিবৃতি তাদের দিশেহারা ভাবের প্রকাশ।”
নির্ধারিত সময়েই উৎসব হচ্ছে জানিয়ে শর্টফিল্ম ফোরামের এই সভাপতি বলেন, ১৭তম বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য ও মুক্ত চলচ্চিত্র উৎসব হচ্ছে। এমনকি জুলাই অভ্যুত্থানের প্রেরণা নিয়েই হচ্ছে। সেই সাথে ফ্যাসিবাদের যারা দোসর, তারা যেন কোনোভাবেই সাংস্কৃতিক অঙ্গনে পুনর্বাসিত হতে না পারে- সেই প্রেক্ষিতেই আমরা কাজ করে যাবো।
জুলাই অভ্যুত্থান এবং এর নায়কদের নিয়ে যে কুৎসা প্রবীণ সদস্যরা ছড়িয়ে যাচ্ছেন, সেগুলো প্রত্যাহার করে জাতির কাছে তাদের নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানান জহিরুল ইসলাম। সেই সাথে প্রবীণদের সাম্প্রতিক চিন্তাকে তিনি ‘প্রতিক্রিয়াশীল চিন্তা’ বলেও মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, “সরকার আমাদের সহায়তা করেছে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় আমাদের অর্থ সহায়তা দিয়েছে। ভেন্যু পেয়েছি। বিগত সরকার যেভাবে পৃষ্টপোষকতা করতো, সেভাবেই সব হচ্ছে। কিন্তু উনারা বলছেন, অনুকূল পরিবেশ নেই। উৎসব নিয়ে উনারা যে বক্তব্যগুলো দিয়েছেন, তার একটিরও সত্যতা নেই।”
এ বিষয়ে ফোরামের প্রবীণ সদস্য ও নির্মাতা মোরশেদুল ইসলাম চ্যানেল আই অনলাইনের সাথে কথা বলেন।
শর্টফিল্ম ফোরামের বর্তমান সভাপতির ‘চেতনাগত দ্বন্দ্ব’ বিষয়ক অভিযোগ নিয়ে জানতে চাইলে মোরশেদুল ইসলাম বলেন, চব্বিশের চেতনা নিয়ে আমাদের কোনো বিরোধ নেই। বরং চব্বিশের চেতনাকে স্বাগত জানাই। আমাদের অবস্থান ছিলো বর্তমান কমিটি শর্টফিল্ম ফোরামের স্বভাব বিরুদ্ধ কাজ করেছে। ফোরামের অধিকাংশ সদস্যদের না জানিয়ে একা একা সব সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অন্যান্য সদস্যদের সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়নি। স্বাধীন ধারার এই চলচ্চিত্র উৎসবটি তার নিজস্ব মূল্যবোধ ও চরিত্র বিপন্ন বলেই আমরা উৎসবটি না করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছি।
নির্বাহী দায়িত্বে না থেকেও ফোরামের প্যাডে বিবৃতি দেয়ার বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে মোরশেদুল ইসলাম বলেন, “ফোরামের সদস্যদের নিয়ে বিশেষ সাধারণ সভা (ইজিএম) হয়েছে। সেখানে যে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, সেটার বিবৃতি কোথায় যাবে? অবশ্যই ফোরামের প্যাডে যাবে। এমনকি বর্তমান কমিটির সাধারণ সম্পাদকও আমাদের সাথে বিশেষ সাধারণ সভায় উপস্থিত ছিলেন। তিনিও এই উৎসব না হওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন।”
এদিকে জহিরুল ইসলাম উৎসবের সময়সূচি জানিয়ে বলেন, শুক্রবার (২০ ডিসেম্বর) বিকেল চারটায় শাহবাগের জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে উৎসবের উদ্বোধন করবেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মো. নাহিদ ইসলাম। উৎসব শেষ হবে ২৭ ডিসেম্বর। এবারের আসরের কান্ট্রি ফোকাস হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে ফিলিস্তিনকে। ২৭ ডিসেম্বর বিকেল ৫টায় জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণী আয়োজন থাকবে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী।







