গত বছর সিনেমা অঙ্গনে নতুন উদ্যোম নিয়ে আসে ‘পরাণ’ ও ‘হাওয়া’। দর্শক খরা নিয়ে দীর্ঘদিনের অচলায়তন ভেঙে দেয় ছবি দুটি। হুমড়ি খেয়ে দর্শক আসেন সিনেমা হলে! তখন অনেকেই ভাবতে শুরু করেছিলেন, বদলে যাবে বাংলা ছবির চেহারা! অচল অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়াবে ঢাকাই সিনেমা!
কিন্তু বাস্তবতা পুরোপুরি ভিন্ন। ছবি মুক্তির সংখ্যা নিয়ে যে হতাশা ছিলো, সেটা ঘুচলেও ‘দর্শকপ্রিয়তা’ নিয়ে ঘুরে ফিরে আটকে থাকতে হচ্ছে সেই পুরনো প্রশ্নেই!
পরিসংখ্যানের হিসেবে, জানুয়ারি থেকে ১০ মার্চ পর্যন্ত শুক্রবারের সংখ্যা দশটি। নতুন বছরের এই দশ সপ্তাহে মুক্তি পেয়েছে অন্তত এক ডজন ছবি। হল মালিকদের সঙ্গে আলাপ করলে তারা জানান, ‘সবগুলো সিনেমাই বাণিজ্যিকভাবে ব্যর্থ।’
১০ মার্চ (শুক্রবার) পর্যন্ত দেশের সিনেমা হলে মুক্তি পেয়েছে ব্ল্যাক ওয়ার, অ্যাডভেঞ্চার অব সুন্দরবন, সাঁতাও, বীরকন্যা প্রীতিলতা, ভাগ্য, কথা দিলাম, মন দিয়েছি তারে, বুবুজান, মায়ার জঞ্জাল, ওরা সাতজন, জেকে ৭১, একটি না বলা গল্প (এরমধ্যে এই সিনেমাটি মুক্তি পেয়েছে ১০ মার্চ)। সিঙ্গেল স্ক্রিনের পাশাপাশি সিনেপ্লেক্সগুলোতেও চলেছে বেশির ভাগ সিনেমা।
কিন্তু একটি ছবিতেও সপ্তাহব্যাপী উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়নি, হয়নি ব্যবসায়িকভাবে হিট। চ্যানেল আই অনলাইনকে সিনেমা হল মালিক সমিতি ছাড়াও নির্দিষ্ট করে বিভিন্ন হল মালিকরাও বলছেন, ‘হাওয়া’, ‘পরাণ’ এর পর আর কোনো সিনেমা চালিয়ে তারা ব্যবসায়িক সাফল্যের মুখ দেখেননি।
বাধ্য হয়ে কোনো কোনো সিনেমা হল থেকে ছবি নামাতে হয়েছে বলেও জানান কেউ কেউ। আরও জানান, চালু থাকা সিঙ্গেল স্ক্রিনে বাণিজ্যিক ছবির চাহিদা বেশি। চাহিদামত সিনেমা না থাকায় কোনো ছবি চলেনি। হল মালিক সমিতির সেক্রেটারি আওলাদ হোসেন বলেন, দেশের ছবি চলছে না বিধায় আমরা হিন্দি ছবি আনতে চাই।
‘মিশন এক্সট্রিম’ থেকে ‘ওরা ৭জন’- অনেকগুলো সিনেমা প্রদর্শিত হয়েছে রাজধানীর বিখ্যাত সিনেমা হল মধুমিতায়। কিন্তু কোনো ছবি চলেনি বলে জানিয়েছেন হলটির কর্ণধার ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ। তিনি বলেন, জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত যত সিনেমা চালিয়েছি ব্যবসায়িকভাবে ফ্লপ গেছে।
নওশাদ বলেন, ফেসবুকের দর্শক আর রিয়েলিটি আকাশ-পাতাল তফাৎ। দু’চারজনের সিনেমা ভালো লাগলে হয়তো তারা লেখে কিন্তু হল তো খালি থাকে। দিনশেষে হল খালি, প্রযোজক হলমালিক সবার লস হয়।
“৩ মার্চ থেকে এক সপ্তাহ ‘ওরা ৭জন’ চালিয়ে যে টাকা সেল হয়েছে। এটা বলার মতো না। শুধু এটাই নয়, ‘পরাণ’ ‘হাওয়া’র পর সব ছবির অবস্থায় নাজেহাল। আসলে চলার মতো সিনেমা নেই, তাই শুধু শুধু লোকসান গুনতে দেখে আবার হল বন্ধ করেছি।”
১২টির মধ্যে ৯টি সিনেমা চলছে স্টার সিনেপ্লেক্সে। দেশের সর্বাধুনিক এই সিনে থিয়েটারটির জৈষ্ঠ্য বিপণন কর্মকর্তা মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ১০ মার্চ পর্যন্ত মুক্তি পাওয়া কোনো সিনেমা থেকে আশানুরূপ সাফল্য আসেনি সিনেপ্লেক্সে। যে সিনেমাগুলো চলেছে কোনোটি আহামরি চলেনি।
“বলার মতো সর্বশেষ ছিল ‘হাওয়া’ ও ‘পরাণ’। পরে আর কোনো সিনেমাই চলেনি। শোতে অন্তত ৫০ পারসেন্ট দর্শক থাকলেও কিছুটা সন্তোষ প্রকাশ করা হয়। অনেক খরচের ফলে এতে সামান্য বেনিফিট আসে। কিন্তু তাও হয়নি। শুধু সিনেপ্লেক্স নয়, অন্য কোথাও খুশি হওয়ার মতো চলেনি।”
দর্শকদের চাহিদায় ও ভালো সিনেমা সংকট এবং বাংলা ছবিতে দর্শক খরার কারণে শুক্রবার (১০ মার্চ) থেকে নতুন করে আবার সিনেপ্লেক্সের বসুন্ধরা সিটি ও বঙ্গবন্ধু হাইকেট পার্ক (রাজশাহী) ব্রাঞ্চে ‘পরাণ’ ও ‘হাওয়া’ প্রদর্শিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সিনেপ্লেক্সের কর্মকর্তা মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ।
ব্ল্যাক ওয়ার, ভাগ্য এবং ওরা ৭জন তিনটি ছবি ডিসট্রিবিউশনের সঙ্গে জড়িত জাহিদ হাসান অভি বলেন, যেহেতু সিনেমা হল কম, তাই সেখান থেকে সিনেমার বাজেটের চারভাগের একভাগ টাকা ওঠে না। গত কয়েক বছরে এটি সব সিনেমার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এমনকি সিনেমা মুক্তিতে সার্ভার/প্রজেক্টর ভাড়া, পোস্টারসহ আনুসাঙ্গিক যে টাকা খরচ হয় সেটাও ওঠে না। হল থেকে সিনেমার বাজেট তুলতে গেলে হাওয়া, পরাণ-এর মতো হিট হতে হবে।
তবে এখন নতুন নতুন উইংস তৈরি হয়েছে। হল বাদে স্পন্সর, ওটিটি বা ডিজিটাল প্লাটফর্ম থেকে সিনেমার মেরিট অনুযায়ী মোটা অঙ্কের টাকা আনা সম্ভব।- এমনটাই মনে করেন এই পরিবেশক।
তবে হল মালিকদের একাংশ অপেক্ষায় আছেন হিন্দি ছবি নিয়ে সরকারি সিদ্ধান্তের, আর অন্য অংশ অপেক্ষায় আছেন আগামি ঈদের ছবি নিয়ে। কারণ বছর জুড়ে যেসব বড় আয়োজনের সিনেমা নির্মাণ হয়, সেগুলোর বেশিরভাগই দুই ঈদে মুক্তির টার্গেট থাকে। আসন্ন ঈদুল ফিতরে মুক্তি পেতে পারে এমন সিনেমাগুলোর মধ্যে আছে- লিডার আমিই বাংলাদেশ, আগুন, লালশাড়ি, অন্তর্জাল, নূর।
এ তালিকায় নতুন করে যুক্ত হতে পারে অন্তরাত্মা, কিল হিম, প্রহেলিকা, ক্যাসিনো’র মতো আরও কয়েকটি সিনেমা।








