শঙ্কর নামে আফ্রিকান এক হাতিকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর আবেদন জানানো হয়েছে। দিল্লীর হাইকোর্টে এ আবেদন করেছেন ‘ইয়থ ফর এনিম্যাল’ নামের এনজিও’র প্রতিষ্ঠাতা নিকিতা ধাওয়ান। ২৪ বছর আগে ওই হাতি শাবককে আফ্রিকার বন থেকে উড়োজাহাজে করে ভারতে আনা হয়েছিল। তাকে রাখা হয় দিল্লী চিড়িয়াখানায়।
দিল্লীর ১৬ বছর বয়সী তরুণী নিকিতা তার পিটিশনে বলেছেন, বছরের পর বছর ধরে শঙ্কর নিঃসঙ্গ জীবন কাটাচ্ছে। তাই হাতিটিকে চিড়িয়াখানা থেকে সরিয়ে বন্যপ্রাণী পুনর্বাসন কেন্দ্রে রাখা দরকার। যেখানে আফ্রিকা থেকে আনা অন্যান্য হাতিকে রাখা হয়েছে। চিড়িয়াখানার প্রাণীগুলোর সঙ্গে যথাযথভাবে দেখাশোনা করা হয় না বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ অবশ্য এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করেননি।
নিকিতা ধাওয়ান বলেছেন, শঙ্করকে নিঃসঙ্গতা থেকে মুক্তি দেয়ার মাধ্যমে আমরা মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে চাই। ভারতীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী হাতি প্রজাতি অবাধে চলতে পারে। তাদেরকে সব জায়গায় চোখে পড়ে। মন্দির থেকে শুরু করে ব্যক্তি মালিকানাতেও হাতির উপস্থিতি লক্ষ্য করার মতো। এই সময়ে এসে হাতিকে আর যত্ন করা হচ্ছে না।
অবরুদ্ধ হাতিদের দুর্দশাময় জীবন:
দীর্ঘদিন ধরে বন্দী হাতিগুলোকে মুক্ত করে দেয়ার জন্য আন্দোলন হয়ে আসছে। ব্যক্তি মালিকানায় অনেক হাতি আছে। ধর্মীয় শোভাযাত্রা, মালামাল টানতে এমনকি ভিক্ষা করতে হাতিদের ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ভারতীয় চিড়িয়াখানায় আফ্রিকা থেকে আনা দুটি হাতি রয়েছে। শঙ্কর ছাড়া অপর পুরুষ হাতিটিকে রাখা হয়েছে কর্নাটকের চিড়িয়াখানায়।
১৯৯৮ সালে ভারতে আসার সময় থেকে নিঃসঙ্গ অবশ্য শঙ্কর থাকেনি। জিম্বাবুয়ে সরকার রাষ্ট্রী উপহার হিসেবে তৎকালীন ভারতের প্রেসিডেন্ট শঙ্কর দয়াল শর্মাকে দুটি হাতি শাবক উপহার দেন। বিশাল বিশাল কান এর অধিকারী হাতি দুটিকে খুব সহজে এশিয়ার অন্যান্য হাতির মধ্যে আলাদা করে চোখে পড়ে।
২০০৫ সালে শঙ্করের সঙ্গে আনা বোম্বাই মারা যায় অস্বাভাবিকভাবে। দিল্লী হাইকোর্টের আবেদন বলা হয়, বোম্বাইয়ের মৃত্যুর কারণ এখনো জানা যায়নি। বোম্বাইয়ের মৃত্যুর পর থেকে শঙ্কর একাকী জীবন কাটাচ্ছে। এখন শঙ্করের বয়স প্রায় ২৬ বছর।
লক্ষী এবং হিরা নামে দিল্লী চিড়িয়াখানায় আরো দুটি হাতি আছে। তবে তাদেরকে শঙ্করের কাছ থেকে আলাদা রাখা হয়। চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ বলেছেন, শঙ্করের একাকীত্ব দূর করতে আরেকটি হাতির খোঁজ করা হচ্ছে।
ভারতীয় এক সংবাদপত্রকে চিড়িয়াখানার পরিচালক সোনালী ঘোষ জানিয়েছেন, শঙ্করের সঙ্গী হতে পারে এমন একটি হাতির খোঁজে আফ্রিকার বিভিন্ন চিড়িয়াখানায় চিঠি দেয়া হয়েছে। সঙ্গী না পাওয়া না গেলে চিঠিতে শঙ্করকে ফিরিয়ে নেয়ার প্রস্তাবও দেয়া হয়েছে।

গণমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দিল্লী চিড়িয়াখানায় রাখা তিনটি হাতিকে একসঙ্গে রাখার চেষ্টাও করা হয়েছে। তবে সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। কারণ শঙ্করকে লক্ষী এবং হিরার চেয়ে ভিন্ন ধরণের পরিবেশে রাখা হয়।
ভারতের নির্যাতিত হাতি রক্ষায় এক নারীর লড়াই:
বনাঞ্চলে হাতি প্রজাতি সমিল্লিতভাবে জীবন কাটায়। হাতিদের একে-অপরের মধ্যে গভীর সম্পর্ক লক্ষ্য করা যায়। বনাভূমিতে জাতিরা যেভাবে চলাফেরা করে চিড়িয়াখানায় তাদেরকে সেরকম পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, হাতিদের চলাফেরার জন্য যথাযথ পরিবেশ না দেয়া হলে তারা অস্বাভাবিক আচরণ করতে পারে।
শঙ্করকে স্বাভাবিক পরিবেশ না দিয়ে বদ্ধ এবং বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রাখা হয়েছে। বিষয়টি পরিবেশবাদীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। সে কারণে যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাসপিনাল ফাউন্ডেশন’ তাদের খরচে শঙ্করকে আফ্রিকায় ফিরিয়ে দেয়ার প্রস্তাব করেছে। নিকিতা ধাওয়ানও আফ্রিকায় বন্য পরিবেশে শঙ্করকে ফিরিয়ে দিতে অনলাইন প্রচারণ চালিয়ে যাচ্ছেন। সেই অনলাইন প্রচারণায় এখন পর্যন্ত সমর্থন জানিয়েছেন ৯৬ হাজার ৫০০ জন।
আদালত শঙ্করকে চিড়িয়াখানা থেকে স্থানান্তরের পক্ষে রায় দিয়েছেন। তবে তার আগে শঙ্করের শারীরিক অবস্থা স্থানান্তরযোগ্য কি না, সেটা চিকিৎসকরা পরীক্ষা করে দেখবেন।

বিশ্বের সবচেয়ে একাকী হাতিটি অবশেষে মুক্ত হতে চলেছে:
শঙ্করের উদারহরণটি আরো নতুন নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রধান প্রশ্ন হলো, কোন হাতিকে এভাবে বন্দী করে রাখা কি উচিত?
সোনালী ঘোষ বলেছেন, হাতি আসলে চিড়িয়াখানায় থাকতে পারে না। বিশ্বে বহু গবেষণা এর পক্ষে মত দিয়েছে। সে প্রেক্ষিতে কোন হাতিকে ধরে এনে চিড়িয়াখানার মতো কৃত্রিম পরিবেশে নির্যাতিত হতে দেয়া ঠিক না।
২০০৯ সালে ভারতের কেন্দ্রীয় চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ কোন চিড়িয়াখানায় হাতি রাখা নিষিদ্ধ করেছে। এমনকি কোন হাতিকে ছয় মাসের বেশী একাকী রাখাও নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। কিন্তু পরিবেশবাদীরা দাবি করছেন, নিয়ম-নীতি থাকা সত্বেও শঙ্করের মতো হাতিদের পরিস্থিতি পরিবর্তনে তেমন কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।








