‘তিনি গাড়ি চালান’-এর ইংরেজি কী হবে? He drives a car নাকি She drives a car? আগপিছ চিন্তা করে অধিকাংশই প্রথম উত্তরটি লিখবেন। কিন্তু কোনো নারী যদি এই উত্তরে আপত্তি জানিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করেন যে, ‘তিনি গাড়ি চালান’- এর উত্তর কেন She drives a car হবে না- তার জবাব দেয়া কঠিন। আবার কেউ যদি ‘তিনি গাড়ি চালান’-এর ইংরেজি She drives a car লেখেন, তাহলে তাকেও প্রশ্ন করা হতে পারে যে, কেন He drives a car হবে না? কেননা, গাড়িটি নারী চালাচ্ছেন নাকি পুরুষ- তা বলা হয়নি।
ইংরেজিতে এই জটিলতাগুলো আছে। বাংলায় নেই। যেমন বাংলায় তিনি বা তার বলতে নারী-পুরুষ উভয়কেই বোঝায়। কিন্তু ইংরেজিতে He মানে তিনি পুরুষ অর্থে আর She মানেও তিনি, তবে নারী অর্থে। কিন্তু তিনি যদি নারী-পুরুষ কিছুই না হন, অর্থাৎ যদি তিনি তৃতীয় লিঙ্গের বা হিজড়া হন, তাহলে তার বেলায় ইংরেজিতে আমরা কী ব্যবহার করব? এই জটিলতা নিরসনের একটা উদ্যোগ নিয়েছে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ইউনিয়ন কর্মকর্তারা ‘জি’ (ze) নামে নতুন একটি সর্বনাম চালু করেছেন- যেখানে বলা হয়েছে, এখন থেকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীকেই ‘হি’ অথবা ‘শি’র বদলে এই ‘জি’ সর্বনাম নারী-পুরুষ-তৃতীয় লিঙ্গ-সব অর্থেই ব্যবহার করা যাবে। অর্থাৎ আমরা যখন ‘তিনি গাড়ি চালান’-এর ইংরেজি করব তখন সেটি হবে ze drives a car, যেখানে He বা She-এর জটিলতায় পড়তে হবে না।

এত বছর পরে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে He বা She এর বদলে আমরা কবে ze চালু করতে পারব এবং তিনি গাড়ি চালান-এর ইংরেজি ze drives a car বা ‘এই গাড়িটি তার’-এর ইংরেজি This is his car বা This is her car-এর বদলে This is zer car লিখতে পারব জানি না, তবে ইংরেজির এই হি ও শির মতো বাংলায়ও কিছু জটিলতা আছে- যেগুলোও জেন্ডারনিরপেক্ষ করার সময় হয়েছে।
কে হবেন নারায়ণগঞ্জের নগরপিতা? ২২ ডিসেম্বর সেখানে ভোট হবে। ভোটের হাওয়া বলছে সেখানে আওয়ামী লীগের প্রার্থী এবং সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী এবারও বিজয়ী হবেন। সেক্ষেত্রে তার বিজয়ের পরে কি আমরা লিখতে পারব- নারায়ণগঞ্জের নতুন নগরপিতা হলেন আইভী? পারব না, কারণ নারীর সঙ্গে পিতা শব্দটি যায় না। তাহলে কি আমরা লিখব নারায়ণগঞ্জের নতুন নগরমাতা আইভী? তাও হবে না। কারণ এভাবে বলে বা লিখে আমরা অভ্যস্ত না। আবার যে অর্থে আমরা পিতা লিখি, অনেক সময় সেই অর্থে মাতা লিখি না। যেমন সভাপতি। আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা। তাকে সাধারণত সভানেত্রী বলা হয়। কিন্তু আমরা জেন্ডার নিরপেক্ষ করতে গিয়ে তাকে সভাপতি লিখি বা বলি। কিন্তু পতি শব্দের অর্থ যে স্বামী- সেটি খেয়াল থাকে না। ফলে মেয়র অর্থে নগরপিতা যেমন জেন্ডারনিরপক্ষে নয়, তেমনি দলীয় বা সংগঠনের প্রধান হিসেবে সভাপতি বা সভানেত্রীও জেন্ডারনিরপেক্ষ নয়। তাহলে আমরা কী লিখব? বিএনপির প্রধান খালেদা জিয়াকে বলা হয় চেয়ারপারসন। এটি জেন্ডারনিরপেক্ষ শব্দ। কারণ পারসন বলতে নারী-পুরুষ-তৃতীয় লিঙ্গ সবই বুঝায়। আবার সভাপতি বা সভানেত্রীর ইংরেজিতে অনেক সময় প্রেসিডেন্ট লেখা হয়। যেমন আওয়ামী লীগের প্রেসিডেন্ট শেখ হাসিনা। এটি জেন্ডার নিরপেক্ষ। কিন্তু এটির বাংলা কী লেখা উচিত? অনেকে সভাপতি বা সভানেত্রীর বিকল্প হিসেবে সভাপ্রধান ব্যবহার করেন। এটি জেন্ডারনিরপেক্ষ।
সিটি করপোরেশন এবং পৌরসভায় মেয়র শব্দটি চালু হলেও জেলা, উপজেলা এবং ইউনিয়ন পরিষদ প্রতিনিধির পদ চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান। কিন্তু কোনো জেলা, উপজেলা বা ইউপিতে নারী যদি চেয়ারম্যান হন, তাহলে তাকেও কি আমরা চেয়ারম্যান বলব নাকি চেয়ারওম্যান বলব? চেয়ারওম্যান প্রচলিত নয়। আবার চেয়ারম্যান জেন্ডারনিরপেক্ষ নয়। সেক্ষেত্রে স্থানীয় সরকারের এই প্রতিষ্ঠানগুলোয় ‘মেয়র’ শব্দটি চালু করা উচিত বলে মনে হয়।
শিক্ষক-শিক্ষিকা। ইংরেজিতে Teacher বললে শিক্ষক-শিক্ষিকা অর্থাৎ নারী-পুরুষ দুটোই বুঝায়। কিন্তু আমাদের দেশে এখনও শিক্ষক-শিক্ষিকা দুটি শব্দই ব্যবহৃত এবং নারী শিক্ষকের ক্ষেত্রে আমরা শিক্ষিকা ব্যবহার করি। এটি ব্যকরণসম্মত এবং গ্রহণযোগ্য হলেও আধুনিক এবং জেন্ডারনিরপেক্ষ নয়। ফলে এখন নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই শিক্ষক শব্দটি ব্যবহৃত হচ্ছে। জনাব-জনাবার ক্ষেত্রেও এখন নারী-পুরুষ সবার ক্ষেত্রে জনাব লেখা হচ্ছে। নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রে ‘স্যার’ বলা হচ্ছে। আলাদা করে ‘ম্যাডাম’ লেখার প্রবণতা বা চর্চা ধীরে ধীরে কমছে।
এভাবে তালিকা করলে আরও অনেক শব্দ পাওয়া যাবে যেগুলো জেন্ডারনিরপেক্ষ নয়। অর্থাৎ পুরুষতান্ত্রিক সমাজে শত বা হাজার বছর ধরে কিছু শব্দ ও শব্দের প্রয়োগ হয়ে আসছে পুরুষকে প্রাধান্য দিয়ে। আধুনিক বিশ্ব নারী-পুরুষ-তৃতীয় লিঙ্গের জন্য একটি সমমর্যাদার সমাজ গঠনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এবং সেই ধারাবাহিকতায় অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি ‘হি’ এবং ‘শি’র বিকল্প ‘জি’ উদ্ভাবন করেছে। তারই আলোকে বাংলায় যেসব জেন্ডারপক্ষপাতদুষ্ট শব্দ রয়েছে- সেগুলোরও বিকল্প তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)








