গুলশানের হলি আর্টিজানে হামলার ঘটনায় গ্রেফতার হাসনাত করিমের পক্ষে তার পরিবার বিশ্ব গণমাধ্যম এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা করছে। সম্প্রতি দ্য গার্ডিয়ানকে দেয়া সাক্ষাৎকারে হাসনাত করিমের স্ত্রী পারভিন দাবি করেন, আর ১০-১৫ মিনিট পরে গেলেই সেখানে তারা ঢুকতে পারতেন না। এক বছরে সব কিছু বদলে গেছে তাদের।
ব্রিটিশ ওই গণমাধ্যমকে তিনি জানান, যে স্কুলে চাকরি করতেন সেখানকার শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের অভিযোগের সেটা হারিয়েছেন। মাসে দুইবার ছয় ঘণ্টা ‘জার্নি’ করে কাশিমপুর কারাগারে যেতে হয় উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন: কারাগারে হাসনাত করিম কষ্ট পাচ্ছে। তার হার্টে অনেকগুলো রিং পরানো রয়েছে। তাকে মেঝেতে ঘুমাতে হয়। কানে ও ইউরিন ইনফেকশনে ভুগছে সে। কারাগার থেকে হার্টের ডাক্তারের কাছে যাওয়ার অনুমতি চেয়েও মেলেনি। এমনকি নভেম্বরে তার বাবা মারা গেলেও নিরাপত্তার অজুহাতে সে দাফনে অংশ নিতে পারেনি।
হাসনাত করিমের বোন যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তরে এক ইমেইলে হাসনাতের শারিরীক অবস্থা তুলে ধরে লিখেছেন, তার জীবন নিয়ে তারা ভীত।
ভয়াবহ ওই জঙ্গি হামলার পর ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে হাসনাত করিমের বিরুদ্ধে। তবে, হাসনাত করিমের স্ত্রী গার্ডিয়ানের কাছে দাবি করেছেন, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয় এমন কোন প্রমাণ আনতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।
তিনি দাবি করেন, ঘটনার সময়ে হাসনাত ও অন্য বাংলাদেশিদের বসে থাকতে বাধ্য করে আক্রমণকারীরা। রাত একটার দিকে একজন আক্রমণকারী তার সন্তানদের দেখিয়ে জানতে চায়, এগুলো কার পরিবার? হাসনাত জবাব দিলে, তারা কম্পাউন্ডের গেট লক করার কথা বলে। এরপর তারা আটক মুসলিমদের ভাত ও মাছ সরবরাহ করে। কিন্তু অনেকগুলো মৃতদেহের মধ্যে বসে খাওয়া সম্ভব ছিল না বলে মন্তব্য করেন পারভীন।
তার দাবি: ভোরের দিকে তারা তাহমিদ ও হাসনাতকে ছাদে নিয়ে যায়। আমরা ভেবেছিলাম তাকে মেরে ফেলতেই নিয়ে যাচ্ছে, যেন কিছু বন্দী কমে যায় এবং তারা ঠিকভাবে সবকিছু ম্যানেজ করতে পারে।
পরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া প্রতিবেশীর তোলা ছবিতে দেখা যায় হাসনাত ধূমপান করছে, হাঁটছে এবং জঙ্গিদের সঙ্গে কথা বলছে। তবে, ‘সেখানেও একজন অপহৃত মানুষের বিনয়ী আচরণই দেখতে পান,’ বলে গার্ডিয়ানকে জানিয়েছেন পারভীন।
হলি আর্টিজান থেকে বের হয়ে আসার পার হাসনাত করিমের পরিবারকে দুইদিন ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এরপর হাসনাতকে ছাড়াই তাদের মুক্তি দেওয়া হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, তারা দুই সপ্তাহ তার কোন খোঁজ পাননি। এক মাস পর জানতে পারেন তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
হাসনাতের এই আটককে বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের গুম ও গোপনে আটক করার ঘটনাগুলোর মতো বলে দাবি করেন পারভীন। হাসনাতের হয়ে লড়বে এমন কোন আইনজীবী পাননি বলেও জানিয়েছেন তিনি।
২০১৬ সালের ১ জুলাই ঢাকার হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা চালায় জঙ্গিরা। হামলায় জঙ্গিরা ২০ জনকে হত্যা করে যাদের ৯ জন ইতালি, ৭ জন জাপানি, ৩ জন বাংলাদেশি এবং ১ জন ভারতীয় নাগরিক ছিলেন। এছাড়া সন্ত্রাসীদের হামলায় দুজন পুলিশ সদস্য প্রাণ হারান। কমান্ডো অভিযানে ছয় জঙ্গি নিহত হয়। সন্ত্রাসীগোষ্ঠী আইএস এর পক্ষ থেকে এই হামলার দায় স্বীকার করা হলেও ঘটনার সাথে আন্তর্জাতিক কোন সন্ত্রাসীগোষ্ঠীর সম্পর্ক ছিলো না বলে মনে করে বাংলোদেশের পুলিশ।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে গুলশানের হলি আর্টিজানে জিম্মি দশার একটি ভিডিওচিত্র প্রকাশ হওয়ার পর সাবেক শিক্ষক হাসনাতের বিরুদ্ধে হামলায় জড়িত থাকার সন্দেহের কথা উঠে আসে।
গত বছরের ৩ আগস্ট হাসনাত রেজাউল করিমকে সন্দেহভাজন হিসেবে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তারের কথা জানায় পুলিশ। পরে হাসনাতকে গুলশান হামলার ঘটনায় সন্ত্রাস দমন আইনে করা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। বর্তমানে সে কাশিমপুর কারাগারে আছে।
জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে হাসনাত করিম: পুলিশ
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ১ জুলাই গুলশানে হলি আর্টিজানে হামলার দিনক্ষণ নির্ধারণ করে হাসনাত করিম। ঘটনাস্থলে থাকা ও পুরো বিষয়টি মনিটরিংয়ের জন্য আগে থেকেই মেয়ের জন্মদিন পালনের নামে হলি আর্টিজানের দুটি টেবিল বুকিং দিয়েছিল সে। নিজেকে সন্দেহের ঊর্ধ্বে রাখতে ঘটনার কিছুক্ষণ আগে রাত ৮টার দিকে সে দুই সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে সেখানে হাজির হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে হাসনাত করিম জানায়, হামলার মাস্টার মাইন্ড তামিম চৌধুরী ছাড়া হামলাকারীদের কাউকেই সে চিনত না। ঘটনার রাতে তামিম চৌধুরী হলি আর্টিজান বেকারির সামনে হামলাকারীদের রিসিভ করে পরে অজ্ঞাত জায়গায় চলে যায়।
তদন্ত কর্মকর্তারা আরো বলেন, হলি আর্টিজানে হামলার রাতে হাসনাতের দায়িত্ব ছিল দেশী-বিদেশী নাগরিকদের জিম্মি করে হত্যার ভিডিওচিত্র ধারণ ও মোবাইলের বিশেষ অ্যাপ ব্যবহার করে সেটি দেশের বাইরে পাঠানো।
কে এই হাসনাত করিম
হাসনাত করিমের জন্ম বাংলাদেশে। তবে কিশোর বয়সেই সে যুক্তরাজ্যে চলে যায়। সেখানে কুইন ম্যারি ইউনিভার্সিটি ইন লন্ডন থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিগ্রি লাভ করে। পরে লিডস ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতকোত্তর করার আগে ডব্লিউএস অ্যাটকিনসে কাজও করে কিছুদিন। ১৯৯৩ সালে হাসনাত চলে যায় যুক্তরাষ্ট্রে। পরে আবার ফিরে আসে ব্রিটেনে। গত দশকের শুরুর দিকে সে বাংলাদেশে চলে আসে।
দেশে ফিরে হাসনাত ২০০৭-০৮ শিক্ষাবর্ষে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করে। তবে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হিজবুত তাহরীরের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা থাকার অভিযোগে ২০১২ সালে তাকে চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য করে নর্থ সাউথ কর্তৃপক্ষ।







