গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গিদের সেই নৃশংস, বর্বর হত্যাযজ্ঞের এক বছর পূর্তিতে সেদিনের হামলার শিকার নিরীহ, নিরাপরাধ ব্যক্তিদের স্বরণ করে তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, ওয়ার্কাস পার্টি, প্রজন্ম ৭১, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটিসহ বিভিন্ন সংগঠন।
শনিবার সকাল ৭:২২ মিনিটে জাপানের রাষ্ট্রদূত মাসাতো ওয়াতানাবে হামলায় নিহত নাগরিকদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। মিনিট দশেক হলি আর্টিজানে থাকার পর প্রতিনিধি দলসহ তারা বের হয়ে অাসেন। তবে গণমাধ্যমের সঙ্গে কোনো কথা বলেনি তারা।
এরপর হলি আর্টিজানের নিহতদের স্বরণে শ্রদ্ধা জানান আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার, ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিনী, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবীর, বীর মুক্তিযোদ্ধা আক্কু চৌধুরী, লেখক ও কলামিস্ট আনিসুল হকসহ নানা শ্রেণি ও পেশার মানুষ।
সকাল সাড়ে ১১টার দিকে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আসেন ইতালির নিহতদের স্বজন ও দাতা সংস্থার প্রতিনিধিরা।চার সদস্যের প্রতিনিধি দল বেশ কিছুক্ষণ নিরবতা পালন করেন এবং নিহতদের প্রতি প্রার্থনা করেন।

এছাড়াও পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোখলেছুর রহমান, ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়াসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা শ্রদ্ধা জানাতে আসেন হলি আর্টিসানে।
পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (প্রশাসন ও অপারেশনস) মো. মোখলেছুর রহমান বলেন, পুলিশ জীবন দিয়ে হলি আর্টিসানের হামলা মোকাবেলা করেছে। এর নেপথ্যে কারিগরদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে।

শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ইংল্যান্ড, ফান্সের পুলিশ যেটা পারেনি বাংলাদেশের পুলিশ সেটা করে দেখিয়েছে।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, হলি আর্টিসানের ঘটনাটি হৃদয়বিদারক। উগ্রবাদীদের হাত আছে এখানে। সারাদেশে উগ্রবাদীদের নেটওয়ার্ক চেপে বসেছে। এক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দল এগিয়ে আসছে না বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির বলেন, জঙ্গিবাদ দমনে বাংলাদেশ সফল। কিন্তু জঙ্গি নির্মূলে আরো অনেক কিছু করার রয়েছে।শক্তি দিয়ে জঙ্গিবাদ নির্মূল সম্ভব নয়। মানুষকে ধর্মের বিষয়ে ভুল বার্তা প্রদানকারী জামায়াত-শিবির, মওদুদীবাদী, ওয়াহাবিবাদ ধর্মভিত্তিক রাজনীতি বন্ধ করার আহ্বান জানান তিনি।
শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বীর মুক্তিযোদ্ধা আক্কু চৌধুরী বলেন, এ ঘটনা ভোলার নয়,আমরা স্মৃতি নিয়ে কাজ করি, ৭১ এর স্মৃতি, এটাও একটা স্মৃতি, এ রকম বর্বোরচিত হামলা যেন আর না হয়।
শ্রদ্ধা নিবেদনের পর সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য অসাম্প্রদায়িক চেতনার। সেই জায়গাটিতে হলি আর্টিজানের ঘটনা বড় আঘাত। আমরা কখনই ভাবিনি এ রকম একটি ঘটনা ঘটতে পারে। জাতি এ জন্য প্রস্তুত ছিল না।
এছাড়াও হলি আর্টিজানের নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন সমাজের সকল স্তরের মানুষ। সাধারণ জনগণ জানিয়েছে ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে যারা কোমলমতি তরুণদের বিপদগামী করছে তাদের খুঁজে বের করতে হবে।

বেসরকারী নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নুরুল আমিন চ্যানেল আইঅনলাইনকে বলেন: এক বছর যে জঙ্গি হামলাটি হয়েছে তা আামদের বাঙ্গালি সংস্কৃতির একটি কালো অধ্যায়। যারা এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে তারাও আমার মতো তরুণ, তাদের ধর্মের নামে অপব্যাখ্যা দিয়ে মগজ ধোলাই করা হয়েছে। ধর্মের নামে যারা অপব্যাখ্যা দিয়ে তরুণ সমাজকে নষ্ট করছে তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
শিকাগোতে লেখাপড়া করা তরুণী অধরা মাধুরী বলেন: জঙ্গি হামলা মেনে নেওয়ার মতো কিছু না, আমার বয়সী কয়েকজন তরুণীও এখানে ছিল, আসলে দেশে হঠাৎ করে এমন পরিস্থিতি হবে যা কল্পনা করি নাই।এর দু’মাস পর লেখাপড়ার জন্য আমি দেশ ছেড়ে শিকাগোতে যাই আমি ভেবেছিলাম ওখানকার ফ্রেন্ডরা আমাকে অন্যভাবে গ্রহন করবে, কিন্তু তেমন কিছুই হয়নি।

একসময় ইতালি নিবাসী সুবোধ কুমার হালদার পরিবারসহ শ্রদ্ধা জানাতে এসে বলেন, ‘বাংলাদেশের পর সবচেয়ে বেশি সময়, প্রায় ১১ বছর ছিলাম আমি ইতালিতে। সেই ইতালির এতগুলো মানুষকে আমার দেশে হত্যা করা হয়েছে, এ নিয়ে একটা অপরাধবোধ নিয়ে এতদিন ছিলাম। আজ তাদেরকে শ্রদ্ধা জানাতে এসেছি, তাদেরসহ সবার কাছে ক্ষমা চাইতে এসেছি।’
ইশারাতের বন্ধু, মামা ও পরিবারের অন্য সদস্যরা আজ সেই স্থানে এসে দাঁড়ান। কারও মুখে কথা নেই। মামা বিচারপতি ওবায়দুল হাসান সেখানে গিয়ে নীরবে দাঁড়িয়েছিলেন।

ওবায়দুল হাসান গণমাধ্যমকে বলেন: জঙ্গিবাদ দূর করতে আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর পাশাপাশি পরিবার ও সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে।আপনার ছেলে কাদের সঙ্গে মিশতেছে তা বাবা-মা হিসেবে আপনার জানতে হবে।
মায়ের সঙ্গেই এসেছিলেন এ প্রজন্মের ছেলে আবেদীন। তিনি জানান, ছোট থাকতে একবার রমনার বটমূলে বোমা হামলা হয়েছিল, তখন বুঝতাম কি হয়েছিল, বড় হয়ে যখন হলি আর্টিজানে হামলা হলো এর ভয়াবহতা আঁচ করতে পারিনি।এটি বিভীষিকাময় অধ্যায় দেশ ও জাতির জন্য।এরকম কোনো ঘটনা আমরা চাই না।

ছবি: ওবায়দুল হক তুহিন








