‘এমনটা কখনো হতে দেখিনি’ -লাঞ্চ বিরতির সময় মাইক হাতে বলছিলেন অস্ট্রেলিয়ান কিংবদন্তি সাবেক অধিনায়ক স্টিভ ওয়াহ। যাকে উদ্দেশ্য করে বলছিলেন, সেই স্টিভেন স্মিথের কথাটা তখনই শোনার কথা নয়! কারণ ৯৮ রানের পর একটু অপেক্ষায় রেখে তিনি চলে গেছেন ভোজন বিরতিতে!
বিরতির পরের ঘটনা, দর্শক সারিতে হাজার হাজার অস্ট্রেলিয়ান সমর্থক তখন অপেক্ষায়। সবাই যেন জানতেন অপেক্ষাটা হবে মধুর! একটা ভুলের প্রায়শ্চিত্ত হবে এমন মন্ত্রমুগ্ধ ব্যাটিংয়ে মধুর করে রাঙানো। ১২ মাসের জন্য নিষেধাজ্ঞায় বন্ধী রাখা গেছে, তাতে যে সামর্থ্যে ঝুল জমেনি সামান্যও।
বিরতি থেকে ফিরেই আবারও তাই মাইলফলকে স্মিথ। দ্বিতীয় সেশনের প্রথম ওভারেই ঝলসে উঠল তার ব্যাট। স্টুয়ার্ট ব্রডকে চোখ জুড়ানো এক কাভার ড্রাইভে চার মেরে পৌঁছে গেলেন তিনঅঙ্কের ঘরে। হয়ে গেল এক টেস্টের দুই ইনিংসেই সেঞ্চুরি! দুটি সেঞ্চুরির এমনই গুরুত্ব যে, এ দুইয়ে ভর করে ইংল্যান্ডকে তাদের মাটিতে চলতি অ্যাশেজের প্রথম টেস্টে হারিয়ে দেয়ার মঞ্চ গড়েছে অস্ট্রেলিয়া।
দ্বিতীয় ইনিংসে ৭ উইকেটে ৪৮৭ করার পর ইনিংস ঘোষণা করেছে অজিরা। ইংলিশদের জন্য লক্ষ্য দাঁড়িয়েছে ৩৯৮ রানের। প্রথম তিনদিন দাপট দেখানো রয়-স্টোকসের দলের জন্য এখন ম্যাচ বাঁচানোই কঠিন হয়ে উঠেছে!
প্রথম ইনিংসে ১৪৪ করেছিলেন স্মিথ। তাতেই ধন্য ধন্য পড়ে গিয়েছিল চিরপ্রতিপক্ষ ইংলিশ সমর্থকদের মাঝেও। ১২২ রানে ৮ উইকেট পড়ে যাওয়ার পর সাবেক অধিনায়কের সেই ইনিংস সাহস যুগিয়েছিল অজিদের। এনে দিয়েছিল লড়াইয়ের পুঁজি।
সেই ইনিংসের পর স্মিথের ঝুলিতে দেখা মিলল আরও জাদুকরী মুহূর্তের। তৃতীয় দিন শেষ করেছিলেন ৪৬ রানে। চতুর্থ দিনের শুরুটা হওয়ার দরকার ছিল সাবধানী। প্রথম দিন থেকেই যে খেল দেখিয়েছে এজবাস্টনের উইকেট, তাতে চতুর্থ দিন ব্যাটসম্যানদের অগ্নিপরীক্ষা দিতে হবে সেটা বোঝা যাচ্ছিল। চতুর স্মিথ তাই শুরুতে উইকেট পড়লেন, থাকলেন সাবধানী, পরে খেললেন স্বাচ্ছন্দ্যেই। লাঞ্চের আগেই পৌঁছে গেলেন টেস্ট ক্যারিয়ারের ২৫তম শতকের দোরগোড়ায়।
১৪৭ বলে ১০ চারে সেঞ্চুরির হাসি হেসেছেন অজি তারকা। ঢুকে গেছেন অ্যাশেজে অভিজাত অস্ট্রেলিয়ানদের এক সংক্ষিপ্ত তালিকায়। অ্যাশেজে এর আগে এক টেস্টের দুই ইনিংসে সেঞ্চুরি ছিল কেবল চার অজির। ওয়ারেন ব্রেডলি (১৯০৯), আর্থার মরিস (১৯৪৬/৪৭), স্টিভ ওয়াহ (১৯৯৭) ও ম্যাথু হেইডেনের (২০০২/০৩) পর পঞ্চম ব্যাটসম্যান সেই তালিকায় ঠাই পেলেন স্মিথ।
সেঞ্চুরির পর তার উদযাপনটাও ছিল দেখার মতো! মাথার হেলমেট খুলে ব্যাট উঁচিয়ে সাজঘরের দিকে তাক করে যেন বোঝাতে চেয়েছেন ‘এই আমাকেই দূরে সরিয়ে রেখেছিলে তোমরা!’
সেঞ্চুরির পর আরও ৪২ রান যোগ করলে স্মিথকে থামাতে পেরেছেন ইংলিশ বোলাররা। ২০৭ বলে ১৪২ করার পর ক্রিস ওকসের বলে বেয়ারস্টোকে ক্যাচ দিয়ে যখন ফিরছেন, তখন স্মিথকে দাঁড়িয়ে সম্মান জানিয়েছে দুয়ো দেয়া কট্টর ইংলিশ সমর্থকরাও।
স্মিথের আড়ালে হয়তো ঢাকা পড়েছেন, কিন্তু ম্যাথু ওয়েডের ইনিংস সম্পর্কে না বললে অন্যায়ই হয়ে যায়! ট্রাভিস হেড ৫১ রানে ফিরে যাওয়ার পর স্মিথকে যোগ্য সঙ্গ দিয়েছেন, পরে নিজে তুলে নিয়েছেন তৃতীয় টেস্ট সেঞ্চুরি। ১৪৩ বলে ১৭ চারে ১১০ করার পর তাকে থামিয়ে দেন বেন স্টোকস।
বাকিদের মধ্যে টিম পেইন ৩৪, জেমস প্যাটিনসন ৪৮ বলে ২ চার ও ৪ ছক্কায় ঝটপট অপরাজিত ৪৭ ও প্যাট কামিন্স ৩৩ বলে অপরাজিত ২৬ রান করে লিড দ্রুত বাড়িয়ে নেন।
শেষবেলায় অবশ্য ৭ ওভার ব্যাট করে কোনো উইকেট হারায়নি ইংল্যান্ড, তুলেছে ১৩ রান। ররি বার্নস ৭ ও জেসন রয় ৬ রানে উইকেটে। পঞ্চম দিনে এজবাস্টনের চেনা উইকেটে তাদের দীর্ঘ কঠিন চ্যালেঞ্জই পাড়ি দিতে হবে।








