স্বাধীনতার ৪৭তম বার্ষিকীর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন উঠেছে মুক্তিযোদ্ধা বা তার পরিবারের কেউ কেন কোটা সুবিধা পাবে? কেন তারা যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে শিক্ষা, চাকরি বা অন্য কোন সরকারি সুবিধা লাভ করবে না? কেউ কেউ দাবি তুলেছেন, এই কোটা সুবিধার কারণে অনেক অযোগ্য মানুষ গুরুত্বপূর্ণ পদ দখল করে আছেন, বাদ পড়ে যাচ্ছেন যোগ্যতমরা। সত্যিই কি অবস্থাটা এরকম? নাকি শুধু অনুমান আর অনিয়মের সাধারণ অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করে কিছু মহলে এক ধরনের বিরোধিতা তৈরি হয়েছে?
স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত গত ৪৭ বছরে মোট কতজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান বা পরিবারের কোন সদস্য কোটা সুবিধা ভোগ করেছে? এর মধ্যে কতজন নিতান্তই অযোগ্য কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছেন? অথবা উল্টা করে বললে, এই দেশে যেসকল অযোগ্য মানুষ গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছেন, তাদের কতজন মুক্তিযোদ্ধা কোটা সুবিধাপ্রাপ্ত? এই হিসাব কারো কাছে নেই। যারা বিরোধিতা করছেন তাদের কাছে আমি একথা জানতে চেয়েছি, কিন্তু কেউ আমাকে বস্তুনিষ্ঠ, সঠিক কোন উদাহরণ দিতে পারেননি। তবুও শুধুমাত্র অনুমানের ভিত্তিতে তারা লাগাতার বিরোধিতা করে চলেছেন। এই বিরোধিতায় বাড়তি ঘি ঢেলেছে, অনেক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের সনদ জোগাড় না করা এবং অনেক অমুক্তিযোদ্ধাদের হাতে এই সনদ থাকা।
৪৭ বছর আগে আমরা একটি দেশ পেয়েছিলাম, একটি স্বাধীন ভূখণ্ড। আর পেয়েছিলাম শত শত বধ্যভূমি, অগুনতি লাশ, কঙ্কাল আর স্বজনহারা, আহত, বিধ্বস্ত এক জনপদ। আজ স্বাধীনতার ৪৮তম দিবসে দাঁড়িয়ে আমরা যদি হিসাব করি, যাদের চরম আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা একটা স্বাধীন দেশ পেয়েছি, তাদের জন্য আমরা কী করেছি? শত শত পিতৃ-মাতৃহীন, স্বজনহীন পরিবারগুলোর জন্য আমরা কী করেছি? কী করেছি মুক্তিযোদ্ধা পরিবার ও তাদের সন্তানদের জন্য?
আমাদের কাছে খুব গর্ব করার মতো কোন উত্তর নেই। তাদের অবদান মনে না রেখে বরং কত দ্রুত সব ভুলে যাওয়া যায়, কত দ্রুত গোটা মুক্তিযুদ্ধটাকেই আমাদের ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা যায়, আমরা সেই চেষ্টাই করেছি। মুক্তিযোদ্ধারা নয়, এই দেশে নন্দিত হয়েছে, পুরস্কৃত হয়েছে স্বাধীনতা বিরোধীরা। রাজাকারদের আমরা মন্ত্রী বানিয়েছি, পরম আদরে তাদের গাড়িতে তুলে দিয়েছি লাল সবুজ পতাকা। তার বিপরীতে আমরা কেউ কোনদিন খবর নেইনি মুক্তিযোদ্ধারা, তাদের পরিবারের লোকজন কেমন আছেন? বরং ৭৫ পরবর্তী সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারগুলো নিগৃহীত হয়েছে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়। আর আজ যখন মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের জন্য কোটা ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে তখন ত্রাহি ত্রাহি রব তোলার আগে আমাদের কিছু বিষয় বুঝে নেয়া দরকার।
প্রথমত: কোটা ব্যবস্থা কেন সেটা আমাদের বুঝতে হবে। কোন নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কোন নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর জন্য পৃথিবীজুড়েই কোটা ব্যবস্থার প্রচলন আছে। অধিকারের ডিসকোর্সে সমান অধিকার বা সমান সুযোগ বা সাম্যের যে ধারণা, সেই ধারণা মতে কোন নির্দিষ্ট জনপদে বা প্রেক্ষাপটে যদি সকলকে প্রতিযোগিতা করার জন্য বা প্রতিযোগী হয়ে ওঠার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে না পারা যায়, তবে সমান প্রতিযোগিতাও আশা করা হয় না। স্বল্পোন্নত দেশগুলো ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যে বিশেষ ছাড় বা সুবিধা লাভ করে থাকে সেটাও একই কারণে।
দ্বিতীয়ত: মুক্তিযোদ্ধার সন্তান বলতে আমরা প্রতিষ্ঠিত পরিচিতমুখ যে কয়জনকে চিনি তারাই সবাই নয়। তাদের বাইরে অসংখ্য পরিবার ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সারাদেশে যারা নিঃস্ব, অসহায়, মানবেতর জীবন যাপন করেন। যাদের কোনদিন কেউ খোঁজ রাখেনি, রাখে না।
তৃতীয়ত: মুক্তিযুদ্ধে অভিভাবক হারানো সন্তানেরা আজ যতটুকু হতে পেরেছে, অভিভাবক থাকলে তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু হতে পারতো। বিশেষ করে ৭৫ পরবর্তী সময়ে যে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ আর দুঃসময় তারা কাটিয়েছেন সেটা আমরা কেউ কাটাইনি। কোন শহীদ পরিবারের সন্তানদের কাছে শুনে দেখতে পারেন অভিভাবকহীন বৈরি পরিবেশে তারা কেমন করে বেঁচে থেকেছেন। আর এসবকিছুই হয়েছে তাদের বাবা কিংবা মা এই দেশের জন্য অকাতরে নিজেদের বিলিয়ে দিয়েছেন বলে।
চতুর্থত: যে মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে এবং তাদের সন্তানদের অভিভাবকহীন কষ্টকর জীবনের বিনিময়ে পাওয়া স্বাধীন দেশে বসে আমরা বাবা মায়ের ছায়ায় ও পূর্ণ সহযোগিতায় যে যোগ্যতা অর্জন করেছি, তার সাথে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের প্রতিযোগিতা করতেই হবে কেন? আমাদের জন্য কোটার বাইরের সুযোগগুলোতো রয়েছে।
মুক্তিযোদ্ধা কোটার বিরোধিতাটা অনেকটা বাসে মেয়েদের জন্য সংরক্ষিত সিটের বিরোধিতার মতো একটি কুতর্ক ছাড়া কিছু নয়। যারা বিরোধিতা করেন তারা ভুলে যান ওই ছয় সাতটি সিট ছাড়া বাসে বাকীগুলোর সবগুলোতেই অন্যদের বসার সুযোগ আছে। আবার অনেক মেয়েরা আছে যারা ইচ্ছা করে এই সুবিধাটা নিতে চায় না। তাই বলে বাসে সংরক্ষিত সিটের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় না। তেমনি যেসব মুক্তিযোদ্ধা বা তাদের পরিবার এই সুবিধা চান না তাদের কারণে এই কোটা পদ্ধতির প্রয়োজন ফুরায় না।
আমাদের যদি আওয়াজ তুলতেই হয় তবে মুক্তিযোদ্ধা নির্বাচনে ও সনদ প্রদানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে হবে। যদিও দুর্নীতি করার জন্য আমাদের কোটা লাগে না। দুর্নীতি এখন সর্বগ্রাসী বাংলাদেশে। যেকোন ব্যবস্থা বাস্তবায়নে সঠিক মনিটরিং এর অভাব সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আমাদের। সেটা কোটা না থাকলেও হবে। কী করলে এই সর্বগ্রাসী দুর্নীতি আর অসততা বন্ধ করা যাবে, সরকার বরং সেদিকে নজর দিক।
মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট নিয়ে যারা অসততা করছে, তার দায় মুক্তিযোদ্ধারা কেন নেবে? আমরা অসততা আটকাতে পারি না বলে কারো ন্যায্য পাওনা দেবো না? আমার-আপনার অসততার দায় আমার-আপনার, মুক্তিযোদ্ধাদের নয়। এবং এই কর্মসূচি সঠিকভাবে বাস্তবায়নের দায়ও সরকারের, মুক্তিযোদ্ধাদের নয়। কোটা নয়, এসব ধান্দাবাজ আর দুর্নীতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুুুুলুন। কেন আপনারা মনে করছেন মুক্তিযোদ্ধারা অনেক কিছু পেয়ে যাচ্ছেন এই কোটার কারণে? বছরের পর বছর এই পরিবারগুলো কিছু পায়নি। তখন কেউ কথা বলেননি।
কোটা লাগবে, লাগবেই। এটা মুক্তিযোদ্ধাদের অধিকার। শুধু মুক্তিযোদ্ধা না, আরও যেসব জনগোষ্ঠীর জন্য নানারকম কোটা রয়েছে, সেগুলোও লাগবে। এই বৈষম্য সমানাধিকার ধারণার একটি অপরিহার্য অংশ, একে affirmative action বা reverse discrimination বলা হয়।
একটা সময় নিশ্চই আসবে যখন আর কোন কোটা রাখার দরকার হবে না। কিন্তু এখনো সেই সময় আসেনি।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)।







