বনানীর একটি হোটেলে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া দুই শিক্ষার্থীর ধর্ষণের ঘটনার পর ধর্ষণকাণ্ডের অভিযোগে অভিযুক্ত আসামীদের নিয়ে দেশের সর্বস্তরে আলোচনা হচ্ছে। তেমনি আরেকটি বিষয় এই আলোচনায় যুক্ত হয়েছে, তা হচ্ছে স্বর্ণ। ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত সাদমান সাকিফ, নাঈম আশরাফ ও সাফাত আহমেদ বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে। সাফাত আহমেদের বাবা দেশের স্বর্ণবিক্রেতা প্রতিষ্ঠান আপন জুয়েলার্সের মালিক। সেই সূত্র ধরেই আলোচনায় যুক্ত হয়েছে স্বর্ণ।
স্বর্ণের প্রতি মানুষের আকর্ষণ সহজাত। অপরিবর্তনীয় বৈশিষ্ট্য, চকচকে রঙ, বিনিময়ের সহজ মাধ্যম, কাঠামোর স্থায়ীত্বের কারণে সেই প্রাচীনকাল থেকেই এটিকে অত্যন্ত মূল্যবান ধাতু হিসেবেই চিহ্নিত করা হয়েছে। তাই মানুষের আগ্রহ ও আলোচনার জায়গাতে বরাবরই বেশ জ্বলজ্বল করে স্বর্ণ।
তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে জ্বল জ্বল করা সাফাত আহমেদের বাবা স্বর্ণব্যবসায়ী দিলদার আহমেদের ব্যবসার সবগুলো স্বর্ণই চোরাচালানের। সেকথা উঠে আসে সাফাতের কথা থেকেই। ধর্ষণের শিকার এক ছাত্রী সাংবাদিকদের বলেন ধর্ষণের পর সাফাত তাকে বলেছিলো, তারা স্বর্ণ চোরাচালান করেন। দুই একটা খুন বা ধর্ষণ করে পুলিশকে টাকা দিলে তাদের কেউ কিছু করতে পারবে না।
এরপরই সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে আপন জুয়েলার্সের মালিকের ‘অবৈধ সম্পদ’ খুঁজতে তাদের প্রতিষ্ঠানের পাঁচটি বিক্রয়কেন্দ্রে ১৪ই মে অভিযান চালায় শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তর। আপন জুয়েলার্সের পাঁচটি দোকানে গত ১৪ ও ১৫ মে শুল্ক গোয়েন্দার অভিযানে সাড়ে ১৩ মণ স্বর্ণ ও ৪২৭ গ্রাম ডায়মন্ড আটক করে শুল্ক কর্মকর্তারা। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও অনুসন্ধানের ভিত্তিতে এবং প্রমাণের আলোকে আপন জুয়েলার্সে এ অভিযান পরিচালিত হয় বলে বৈঠকে জানায় শুল্ক গোয়েন্দা কর্তৃপক্ষ। ১৭ই মে তলব করা হয় আপন জুয়েলার্সের মালিককে।
তবে এই ধরনের অভিযান দিয়ে স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের হয়রানি করা হচ্ছে বলে প্রতিবাদ জানায় বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস)। ১৯ মে সকালে ধর্মঘটের আহ্বান জানিয়ে রাতেই আবার সেই ধর্মঘট প্রত্যাহারও করে নেন তারা।
স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের হয়রানি করার অভিযোগ এনে এবং স্বর্ণ আমদানিতে সুষ্ঠু নীতিমালা প্রণয়নের দাবিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য ডাকা ধর্মঘট শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের সঙ্গে বৈঠকের পর প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন নেতারা।
শুধু দিলদার আহমেদই নয়, সাম্প্রতিক তথ্য বলছে বিগত পাঁচ বছরে দেশে কোনো বৈধ স্বর্ণই আমদানি হয়নি। ফলে নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, যে পরিমাণ স্বর্ণ দেশে কেনাবেচা চলে তার সবটাই চোরাচালানের।
প্রতিবছরই বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ আটক করা হয় বিমানবন্দর থেকে। শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. মইনুল খান সাংবাদিকদের বলেন, বিগত ৪ বছরে ১ হাজার ১০১ কেজি স্বর্ণ জব্দ করেছে শুল্ক গোয়েন্দা।
চোরাচালানোর দায়ে আটক স্বর্ণ ও বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা এবং পরবর্তীতে বাজেয়াপ্ত করা স্বর্ণ নিলামে বিক্রি করার বিধান রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০০৮ সালের পর থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে এ ধরনের বাজেয়াপ্তকৃত স্বর্ণের নিলাম অনুষ্ঠিত হয়নি।
শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর থেকে বলা হয়, ফলে এসব স্বর্ণ বাংলাদেশ ব্যাংকে দীর্ঘদিন ধরে জমা পড়ে আছে। স্বর্ণব্যবসায়ীদের দাবি, দেশের ভেতরের উৎস থেকে বৈধ স্বর্ণ পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে তাদের ব্যবসায় ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
বাজুস নেতারাও দীর্ঘদিন ধরেই ‘বাংলাদেশে বৈধ স্বর্ণ সরবরাহের ব্যবস্থা করার’ দাবি করছেন। স্বর্ণ আমদানি ও ব্যবসার শুল্ক ও নীতিমালা নিয়ে নতুন করে ভাবতেও বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্বর্ণের প্রতি সহজাত আকর্ষণের কারণেই দেশে প্রতিবছর স্বর্ণের চাহিদাও বেশি, প্রায় ২১ টন। সারা বছর এ পরিমাণ স্বর্ণের অলঙ্কারই বিক্রি হচ্ছে দেশে। হিসাব অনুযায়ী ২১ টন স্বর্ণের সমপরিমাণ হচ্ছে ১৮ লাখ ৪১১ ভরি।
এর মধ্যে মাত্র ৫ শতাংশ যাত্রীর সঙ্গে ব্যাগেজ রুলের আওতায় আসে। নির্দিষ্ট পরিমাণের (একশ’ গ্রাম বা সাড়ে আট ভরি) বেশি স্বর্ণ আনলে প্রতি ভরিতে তিন হাজার টাকা হিসাবে শুল্ক পরিশোধ করতে হয়। চাহিদার বাকি ৯৫ শতাংশ বৈধভাবে আমদানি করলে এ হিসাবে (ভরিতে ৩ হাজার টাকা) সরকার ৫১২ কোটি টাকা রাজস্ব পেত। কিন্তু এ পরিমাণ স্বর্ণ বৈধভাবে আমদানি না হওয়ায় প্রতিবছর সরকার ৫১২ কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে।
তবে স্বর্ণ কোন নিষিদ্ধ পণ্য নয়। আমদানি নীতি আদেশ ২০১৫-১০১৮ এর অনুচ্ছেদ ২৬(২২) অনুযায়ী, বাণিজ্যিক ভিত্তিতে স্বর্ণ আমদানির স্পষ্ট সুযোগ রয়েছে। তবে এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমতি নিতে হয়। এই অনুমতি নিয়ে ব্যবসায়ীরা বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বৈধভাবে যেকোনো সময় ও যেকোনো পরিমাণ স্বর্ণ আমদানি করতে পারেন।
এসব কিছু বিবেচনায় রেখেই শুল্ক গোয়েন্দাসহ অন্যান্য সংস্থার অভিযানে আটক স্বর্ণ নিয়মিতভাবে নিলাম এবং বাণিজ্যিকভাবে তা আমদানির প্রক্রিয়া সহজ করতে গত ১৭ই মে বাংলাদেশ ব্যাংককে চিঠি দেয় শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ।







