টাইম মেশিনে যেন ফিরে এল ১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফি জয়ের মুহূর্ত। এক ছাদের নিচে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে সেই দলের সকলে, আর মধ্যমণি কোচ গর্ডন গ্রিনিজ। রূপকথার মতো বাংলাদেশের ক্রিকেট ফিরে গিয়েছিল ২১ বছর আগেই! আকরাম, মিনহাজুল, শাহরিয়ার, মেহরাব, হাসিবুল, রফিকদের মাঝে তখনকার গুরু গ্রিনিজ। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত যতই গভীর হচ্ছিল, সোনারগাঁও হোটেলের গ্র্যান্ড বলরুম শুধু মায়াই বাড়িয়ে যাচ্ছিল।
১৯৯৭ সালে আইসিসি ট্রফি জয়ের মধ্য দিয়ে ঘটেছিল বাংলাদেশ ক্রিকেটের জাগরণ। মালয়েশিয়ায় ফাইনাল নিশ্চিত করেই প্রথম বারের মতো বিশ্বকাপ খেলার টিকিট কেটে আনন্দের বানে ভেসেছিল পুরো দেশ, পরে কেনিয়ার সঙ্গে অসাধারণ জয়ে চ্যাম্পিয়ন।
এর দু’ বছর পর ১৯৯৯ বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে হারানোর স্মৃতি এখনও শিহরণ জাগায়। সেই স্বপ্নযাত্রায় অসামান্য অবদান রেখেছিলেন ক্যারিবীয় ব্যাটিং কিংবদন্তি গর্ডন গ্রিনিজ। মাত্র তিন বছর কোচের দায়িত্ব সামলে বাংলাদেশ দলকে গেঁথেছিলেন মালায়। বিদায়টা সুখকর না হলেও সেটি আর মনে রাখেননি গ্রিনিজ। তার হৃদয়ে এখন বাংলাদেশ নিয়ে শুধুই সুখস্মৃতি!
বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু গ্রিনিজকে সংবর্ধনা জানানোর মঞ্চ প্রস্তুত ছিল সোমবার সন্ধ্যা থেকেই। একে একে এলেন সাবেক-বর্তমান ক্রিকেটার, বিসিবি কর্মকর্তা, সাংবাদিকরা। তখন অপেক্ষা অনুষ্ঠানের মধ্যমণি গ্রিনিজের জন্য। তিনি এসেই একে একে আলিঙ্গন করলেন তার সময়কার ক্রিকেটাঙ্গনের মানুষদের। পরে গ্রিনিজ মঞ্চে পৌঁছাতে সকলে দাঁড়িয়ে করতালিতে সম্মান জানালেন।
সুদূরে থেকেও বাংলাদেশকে কতটা ধারণ করেন গ্রিনিজ সে কথা দিয়েই শুরু করলেন, ‘আমার হৃদয়ে এখনও বাংলাদেশ ও এদেশের ক্রিকেট। আমি আপ্লুত, আনন্দিত। ভাবতেও পারিনি আমার জন্য বিসিবি এতো বড় আয়োজন করে রেখেছে। সেজন্য বিসিবিকে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ।’
গ্রিনিজের হাতে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট অধিনায়ক নাঈমুর রহমান দুর্জয় তুলে দিয়েছেন ‘গর্ডন গ্রিনিজ’ নাম লেখা বাংলাদেশ দলের লাল-সবুজ জার্সি। বিসিবি পরিচালক এনায়েত হোসেন বোর্ডের পক্ষ থেকে তুলে দিয়েছেন উপহার। আর বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসানের হাত থেকে গ্রিনিজ গ্রহণ করেন একটি ক্রেস্ট ও ৫ লাখ টাকার সম্মাননা চেক।
১৯৯৯ বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে হারানোয় বাংলাদেশ দলকে পুরস্কৃত করেছিল বিসিবি। ওই বিশ্বকাপেই বরখাস্ত হন গ্রিনিজ। প্রাপ্য টাকা বুঝে পেয়ে গ্রিনিজ ঘোষণা দিয়েছেন সেটি কাজে লাগাবেন বার্বাডোজে নিজের নামে গড়া একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি গ্রন্থাগারের জন্য।
বাংলাদেশকে টেস্ট মর্যাদা দেয়ার ব্যাপারে তাড়াহুড়ো না করার কথা ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমে বলেছিলেন গ্রিনিজ, এমন অভিযোগ উঠেছিল সেসময়। তাতে তখনকার বিসিবি কর্তাদের বিরাগভাজন হন। বাংলাদেশ ক্রিকেটের অনন্য কারিগরের নীরবে প্রস্থান ঘটে তখন।
পরেও দু’বার বাংলাদেশে এসেছিলেন গ্রিনিজ। ২০০০ সালে বাংলাদেশের অভিষেক টেস্টের আমন্ত্রিত অতিথি হয়ে, ২০০৪ সালে আরেকবার এসেছিলেন পাসপোর্ট নবায়ন করতে। কোচের চাকরি হারানোর পর এ নিয়ে তিনবার বাংলাদেশে এলেন ৬৭ বছর বয়সী ক্যারিবীয় কিংবদন্তি। জানালেন, আবার আসতে চান।
১৯৯৭ সালে আইসিসি ট্রফি জয়ের পর গ্রিনিজকে সম্মান জানিয়ে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেয়া হয়েছিল। বাংলাদেশের সেই পাসপোর্ট নবায়ন করবেন বলে জানিয়ে গেলেন বিদায় নেয়ার সময়। আর তাতে আরেকবার প্রকাশ পায় বাংলাদেশের প্রতি তার অকৃত্রিম ভালবাসা।







