বাংলাদেশে অনেক সাইনবোর্ড সর্বস্ব রাজনৈতিক দল আছে। তাদের কর্মসূচি সচরাচর চোখে পড়েনা। এ দলগুলো অনেকটা প্রেস রিলিজ নির্ভর। কখনো দশ থেকে বিশজন লোক নিয়ে রাজপথে কর্মসূচি পালন করতে দেখা যায় তাদের।
বড় বড় নেতাদের এসব ছোট দলগুলো দুই অংক বিশিষ্ট সদস্যের মিছিল বা সমাবেশ করে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠায় বিশাল কর্মসূচির। নিউজের আকালে থাকা পত্রিকাগুলোও তাদের সংবাদ ছাপে। কেউ খোঁজও নেয়না বিশাল মিছিলে লোক সংখ্যা তিন অংক ছুঁলো কি না?
এই দলগুলোর নেতাদের টেলিভিশন টক শোতে কদর আছে। জুতা সেলাই থেকে চণ্ডিপাঠ সব বিষয়ের বক্তব্যে তাদের পারদর্শিতা লক্ষণীয়। সুই থেকে হেলিকপ্টার সাপ্লাইয়ের মতো সকল আলোচনায় অংশগ্রহণ ও জ্ঞানগর্ব বক্তব্যে রাজপথের নেতারা হয়েছেন আজ সেলিব্রেটি। তাদের কেউ ছাত্র জীবনে দেশের সর্ববৃহৎ ছাত্র সংগঠনের নেতা ছিলেন, কোনো কারণে বেরিয়ে গেছেন বা বের করে দেয়া হয়েছে।
কেউ কেউ একদা ছিলেন সামরিক বাহিনীতে। মেজর, কর্নেল, ব্রিগেডিয়ার, মেজর জেনারেল পদ থেকে চাকরি গেছে, অবসর নিয়েছেন অথবা নিতে বাধ্য হয়েছেন। পুরনো পরিচয়ের বাইরে সমাজ বা রাজনীতির জন্য কোনো অবদান রেখেছেন কিনা, তার খবর কারো রাখার সময় আছে?
আবার কেউ বড় দলের ছোট বা মাঝারি মানের নেতা ছিলেন। নেতা-নেত্রীদের সাথে বনিবনা হয়নি, ব্যক্তি স্বার্থ চরিতার্থ করতে গিয়ে বিরাগবাজন হয়েছেন। গলাধাক্কায় ছিটকে গেছেন অথবা ব্যবসায় সুবিধা নিতে না পারায় পোষাচ্ছিলোনা বলে দল ত্যাগ করেছেন। পেশাদার রাজনীতিক। এর বাইরে কিছু করতে শিখেননি। অনেকটা পেটের দায়ে যেন রাজনীতি করেন, ডাক শুনে কেউ আসুক বা না আসুক একলাই চলতে হয় পথ।
এমন অসংখ্য দল আছে যারা নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধনের যোগ্যতা অর্জনে ব্যর্থ তবে জোট বা মহাজোটের লেজে থাকার যোগ্যতা আছে। বড় দলের নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দিতে সংসদ নির্বাচনে এক বা দুটি আসনে মনোনয়ের নিশ্চয়তা যথেষ্ট। নিজেদের প্রতীক নয়, জোটের হয়ে বড় দলের প্রতীক নিয়েই নির্বচনী বৈতরণী পার হতে চাইলেও ভাগ্যে শিকে ছিড়েনা। সাংসদ হতে না পারলেও জোট ক্ষমতায় গেলে অন্যান্য পদ অথবা ঠিকাদারি বাগিয়ে নেয়া যায়।
এসব রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ডান, বামসহ সব পন্থী আছে। তেলের সাথে জল না মিশানো গেলেও এদের কেউ কেউ বিপরীত আদর্শের দলের নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দিতে দেখা গেছে। দেশের মিডিয়া তাদের সাইনবোর্ড সর্বস্ব দল হিসেবে আগেই খেতাব দিয়েছে।
নাম বা সাইনবোর্ড সর্বস্ব দলের সাথে সকলের পরিচয় আছে, কিন্তু ফেসবুক সর্বস্ব দল? একেবারে নতুন মনে হলেও দলটি অনেক পুরনো। ভুল রাজনীতি, প্রতিপক্ষের পরিপক্ক খেলায় পরাজিত, সর্বস্বান্ত দলের কর্মীরা রাজপথ থেকে চলে গেছেন ভার্চুয়াল জগতে। সেখানে তাদের বিচরণ মৌমাছির মতো দল বেঁধে।
সোশ্যাল মিডিয়া সর্বস্ব এই রাজনৈতিক শক্তির আবির্ভাব হয়েছে অনেকটা শিবিরের রগ কাটা বাহিনীর আদলে ভার্চুয়াল গলাকাটা বাহিনী রূপে। সোশ্যাল মিডিয়া আর অনলাইন সংবাদপত্রে তাদের বিচরণ চোখে পড়ার মতো। বিএনপি বা এর নেতা-নেত্রী সম্পর্কিত কোনো সংবাদ বা মতামত আপলোড হলে ঝাঁপিয়ে পড়েন তারা, জোশের সাথে কিছুটা হুশ হারিয়ে।
আলোচনা বা সমালোচনা যতই যুক্তিসংগত, তথ্য নির্ভর বা সত্য হোক, মতের সাথে অমিল হলেই তারা ঝাঁপিয়ে পড়েন পল্লী সাহিত্যের বিশাল ভাণ্ডার নিয়ে। লেখার জবাবে লেখা, যুক্তির জবাবে যুক্তি না দিয়ে লেখকের জাত পাত, ধর্ম বর্ণ নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি অকথ্য ভাষায় গালাগালিতে পটু এসব অনলাইন কর্মীরা অন্যের ভিন্নমত সহ্য করতে মানসিকভাবে প্রস্তুত না হলেও নিজেদের ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশনের দাবিতে চিৎকার চেঁচামেচিতে সবার চেয়ে এগিয়ে আছেন কয়েকগুণ।
এই কর্মী বাহিনী বিএনপি নেতা–নেত্রীর পক্ষে জীবনপণ লড়াই করে, দলের হয়ে অহেতুক অনলাইন যুদ্ধে নামছেন ততটা ঠিক যতটাই তারা রাজপথে নিরব, তাদের জাতীয়তাবাদী সোশ্যাল মিডিয়া দল বলা যেতে পারে। এই দলে লক্ষ না হোক হাজার হাজার সদস্য আছেন চোখ বন্ধ করে বলে দেয়া যায়। অনেকে যদিও ফেইক আইডি ব্যবহার করেন পরিচয় গোপন রাখার স্বার্থে। তারা দলের কতটুকু উপকার করছেন নাকি অন্যের প্রচারে সাহায্য করছেন তা গবেষণার বিষয়। তবে এরা ভার্চুয়াল দুনিয়ায় বিচরণ করে তাদের উপস্থিতি জানানোর পাশাপাশি ফটোশপের কারসাজি ও নানা অপপ্রচারে বিভ্রান্তি ছড়ানোর কাজও করে।
দিন-রাত সক্রিয় বিশাল এ কর্মী বাহিনী রাজপথে, দলীয় কর্মসূচি তথা রাজনীতির মাঠে নেই কেন?
নাম সর্বস্ব দলের নেতারা আজকাল ছোট খাটো মিছিল বা কর্মসূচি নিয়ে রাজপথে নামেন না। তবে ঘরোয়া আলোচনা অনুষ্ঠানে তাদের মাঝে মাঝে দেখা যায়। বেশ ক’বার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকা বিএনপি পাঁচ শতাধিক সদস্যের বিশাল কেন্দ্রীয় কমিটি নিয়েও কোনো কর্মসূচি পালন করছেনা, করার চেষ্টাও চোখে পড়েনা। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মাঝে মাঝে পেশাজীবী সংগঠনের সেমিনার বা আলোচনা সভায় বক্তৃতা ও নেতা জিয়াউর রহমানের কবর জিয়ারতের মধ্যে কর্মসূচি সীমিত রেখেছেন।
দলের নেত্রী সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া মাঝে মাঝে বিবৃতি বা সংবাদ ব্রিফিংয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছেন তার সকল কর্মকাণ্ড। মাঝে মাঝে বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন বা ধর্মীয় গ্রুপ তার রাজনৈতিক কার্যালয়ে দেখা সাক্ষাত পান রাতের বেলায়। জোটের মিটিংও নিয়মিত হয়না। ছোট বড় কত ইস্যু আসে যায় তিনি একদম চুপ-চাপ। দেখে শুনে, ভেবে চিন্তে কদাচিৎ বিলম্বিত প্রতিক্রিয়া জানিয়ে দায় সারেন।
দলের প্রধান হিসেবে বিকল্প না থাকলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণে তার সক্ষমতা এখন প্রশ্নের সম্মুখীন। দলের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণার পর প্রকাশ্য ক্ষোভ এরই ঈঙ্গিত করেছে সম্প্রতি। ছেলে পলাতক তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে এনে দলের কাণ্ডারি করার সুযোগ নেই উচ্চ আদালতে সাজা হওয়ার পর। তাছাড়া ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলাসহ আরো ১৬ টি মামলা আছে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে। কয়েকটিতে গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে। দেশের মানুষের কাছে তারা দু’জন ভাবমূর্তির সংকটে আছেন বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।
দলের অন্যান্য নেতারা রাজপথ, দলীয় কার্যালয় এমনকি মিডিয়া, কোথাও কি উপস্থিত আছেন? দলের মুখপাত্র রুহুল কবির রিজভী মাঝে মাঝে প্রেস ব্রিফিং এ সংবাদ মাধ্যমের মুখোমুখি হন, জেলের বাইরে থাকলে। ছোট দলগুলোর কোনো কোনো নেতার মিডিয়া বা টকশোতে উপস্থিতি থাকলেও বিএনপি নেতাদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য নয়। মামলার ভারে ন্যুব্জ অনেক নেতা প্রকাশ্যে আসতে সাহসই পান না বলে ধারণা করা হয়। কেন্দ্রের একটার পর একটা ভুল সিদ্ধান্তের খেসারতে সংসদ থেকে ছিটকে পড়া, গত বছরের ব্যর্থ আন্দোলনে পেট্রোল বোমা সন্ত্রাসের মামলায় পালিয়ে বেড়িয়ে তারাও হারিয়েছেন মনোবল যা নিম্নগামী হয়ে সংক্রমিত হয়েছে কর্মীদের মধ্যে, তৃণমূলে। তাদের মনোবল ফিরিয়ে আনতে কেন্দ্রের কার্যকরী ভূমিকা উল্লেখ করার মতো নয় বলেই কি কর্মীরা আশ্রয় নিয়েছেন ভার্চুয়াল দুনিয়ায়?
মূল দলের পাঁচ’শ ও অন্যান্য অঙ্গ দলের আরো কয়েকশ মিলিয়ে হাজার খানেক কেন্দ্রীয় নেতা রাজপথে সাহস করে কোনো ইস্যুতে একটা মিছিল করতে সক্ষম হলেও কর্মীরা কিছুটা মনোবল ফিরে পেতে পারেন, আলাপ আলোচনায় অনেকে এমন কথা বলে দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন। সে লক্ষ্যে কেন্দ্রের পরিকল্পনা কি আছে তারা জানতে বা অনুভব করতে পারছেন না বলে হতাশাও কাটছেনা। অদূর ভবিষ্যতে তারা আদৌ রাজপথে সরব হবেন কিনা তাও নির্ভর করছে বর্তমান সরকারের ইচ্ছা অনিচ্ছার উপর বলেও আশংকা আছে কারো কারো মনে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, রাজনৈতিক দল রাজনীতিতে না থাকলে রাজপথের কর্মীদের বদলে সোশ্যাল মিডিয়া দল কত দিন সক্রিয় থাকবে?
বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব যদি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির সাথে সাক্ষাতে ড. ইউনূসের বিদেশি বন্ধু মিসেস হিলারি ক্লিনটনের উপর পুনরায় আস্থা ফিরে পান, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করে দেয়ার কারো আশ্বাসে বিশ্বাস করেন, বা আগের মতো তৃতীয় কোনো শক্তিকে ক্ষমতার সিঁড়ি মনে করে নিজেদের গুটিয়ে রাখেন, তাহলে সর্বশেষ যোদ্ধা এখনো যারা সোশ্যাল মিডিয়ায় বিএনপিকে সক্রিয় রেখেছেন, হতাশায় তাদেরও কি নিস্ক্রিয় হওয়ার ঝুঁকি থাকবে না?
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







