‘সু চি আপনি শুধু আমার ঘরবাড়ি না, বইও পুড়িয়েছেন। সেইসঙ্গে পুড়িয়েছেন আমার স্বপ্ন, আমার আশা’- এভাবেই মিয়ানমারের নোবেলজয়ী নেত্রী অং সান সু চি’র প্রতি ক্ষোভ জানিয়েছেন এক রোহিঙ্গা যুবক।
কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা যুবক রো মায়ু আলী আল জাজিরার কাছে এক খোলা চিঠিতে সু চি’র প্রতি তাদের গভীর ভালোবাসা কেন আজ ঘৃণায় পরিণত হয়েছে, সেই কথা জানিয়েছেন।
রো মায়ু আলী বলেন: সু চি আপনি যে বছর নোবেল পুরস্কার পান, সে বছরই আমার জন্ম। এই পুরস্কারে ভূষিত করে আপনাকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, যা আমাদের দেশের জন্য সম্মানের ছিল। এই খবরে আমার জন্মস্থান রাখাইন রাজ্যের ওয়াংদুর প্রতিটি মানুষ খুশিতে আত্মহারা হয়ে পড়ে এবং আপনার পুরস্কার নিজেদের বলে উদযাপন করে।
‘স্বাধীনতার পর তখন প্রথমবারের মতো আমরা রোহিঙ্গারা ভেবেছি আমরাও এই দেশের অংশ। নিজেদের মিয়ানমারের মানুষ ভেবে আমরা আনন্দিত হয়েছিলাম। বছরের পর বছর সামরিক জান্তার হাতে নিপীড়িত রোহিঙ্গাদের আপনার নোবেল পুরষ্কার অনুপ্রানিত করতো।
বড় হতে হতে দেখেছি আমার দাদা সবসময় আপনার সম্পর্কে বড় বড় কথা বলতেন এবং আপনার দলের নেতাকর্মীরা রাখাইনে আসলে দাদা বড় বড় গরু-ছাগল জবাই করে খাওয়াতেন। আমার বাবা এবং দাদী চেয়েছিলেন আপনি যে পথ বেঁছে নিয়েছিলেন, আমিও যেন সেই পথ অনুসরণ করি। আপনার শক্তিশালী কন্ঠ আর কর্মকাণ্ড দেখে আমার মা আপনার ছবিই আঁকতেন।’
ওই চিঠিতে রো মায়ু আলী আরও বলেন: ‘২০১০ সালেও আপনি যখন চূড়ান্তভাবে বন্দীদশা থেকে মুক্তি লাভ করেন, তখন আমরা উল্লাস করি। কিন্তু সাত বছর পর আপনার হাত দিয়েই আমরা রোহিঙ্গারা নিষ্ঠুরতা এবং গণহত্যার শিকার হয়েছি।

আপনার প্রশাসন আসার পরই রাখাইনে অভিযানের অনুমোদন দেয়। এই সময়ে অসংখ্য নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয়, নারীরা গণধর্ষণের শিকার হন। আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক সমালোচনার পরও আপনি এসব অপরাধ অস্বীকার করেছেন। এমনকি আপনি আমাদের জাতিগত পরিচয় রোহিঙ্গা শব্দটি উচ্চারণ করতেও অস্বীকৃতি জানিয়েছেন, যারা শত শত বছর ধরে রাখাইনে বসবাস করে আসছে।’
২৫ আগস্ট সহিংসতা শুরুর পর থেকে পাঁচলাখের অধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে গেছে। এক হাজারের বেশি রোহিঙ্গাকে গ্রামবাসীকে হত্যা করা হয়েছে। ১৫ হাজার ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। যারা থেকে গেছে তারাও আতঙ্কের মধ্যে বাস করছে।
এই রোহিঙ্গা যুবক বলেন: ‘সেপ্টেম্বরের ১ তারিখে আমার বাবা-মা এবং আমাকে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য করা হয়। ছোট নৌকাতে করে আমরা তিন দিন-তিন রাত ধরে বাংলাদেশে পৌঁছাই। পরে আমরা কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্পে আশ্রয় নেই। এখান থেকে খবর পেয়েছি আমাদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। অনেকেই বলছে, সেনাবাহিনী এবং উৎসুক লোকজন ঘরবাড়ি পুড়িয়েছে। কিন্তু আমার অভিযোগ আপনি সু চিই এই কাজ করেছেন। আপনি শুধু আমার ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেননি, আমার বইপত্রও পুড়িয়ে দিয়েছেন।’
‘আমি সবসময় ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে সিটিওয়ে ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করে লেখক হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম। কিন্তু আপনি জানেন এখানে রোহিঙ্গাদের পড়াশোনা নিষিদ্ধ, এরপরও আমি বই পড়ে সেখানে পড়ার ইচ্ছা পোষণ করি। কিন্তু আপনি আমার বইগুলো পুড়িয়ে দিয়েছেন। আপনি নেলসন ম্যান্ডেলার লংওয়াক টু ফ্রিডম, মহাত্মা গান্ধীর জীবনীসহ আপনার নিজের বই ফ্রিডম ফ্রম ফেয়ারও পুড়িয়েছেন। আপনি একমাত্র ব্যক্তি, যে আমার স্বপ্ন এবং আশা আগুনে পুড়িয়ে ফেলার জন্য দায়ী।
এখন আমরা শরণার্থী হিসেবে বাংলাদেশে বাস করছি। আমার বাবার আপনার কাছে প্রশ্ন, কেন আপনি রোহিঙ্গাদের দেখতে রাখাইনে যাননি? কিংবা বাংলোদেশ থাকা রোহিঙ্গাদের ভাগ্যে কি ঘটেছে তা জানার চেষ্টা করেননি কেন? অবশ্য আমাদের এই অবস্থায় কি আপনার কিছু আসে যায়?
আপনি আপনার পথ বেঁছে নিয়েছেন, সবার কাছে এখন তা পরিস্কার। তবে জেনে রাখবেন, নির্যাতিত লাখ লাখ রোহিঙ্গা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আপনার নামটিও স্বৈরশাসকের সমার্থক হিসেবে বিশ্বে পরিচিতি পাবে।’







