একটি ছেলেকে চারদিক থেকে ঘিরে ধারালো চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে চলেছে আরো কয়েকটি ছেলে। চারদিকে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে দেখছে জনগণ। কেউ ছবি তুলছে, তো কেউ ভিডিও করছে। চারদিকের মানুষগুলোর অর্ধেকও দলবদ্ধভাবে এগিয়ে গেলে বেঁচে যাবে আক্রান্ত ছেলেটা।
পাশের বাসার বউটাকে নিয়মিত পেটায় লোকটা। মাঝরাতে চিৎকার ভেসে আসে মাঝে মাঝেই। কান না পাতলেও শোনা যায় চাপা হিসহিসানী আর কান্নার আওয়াজ। ফ্ল্যাটবাড়িটায় এটা ওপেন সিক্রেট। লিফটে দেখা হলে নিয়মিত কুশল বিনিময় হয় প্রতিবেশী লোকটার সাথে। এটা ওটা নিয়ে কথা হয়। কিন্তু ব্যক্তিগত বিষয় বলে রোজ বউ পিটানো নিয়ে কোন কথা হয় না। বউটা গলায় দড়ি বেঁধে ঝুলে পড়লো একদিন। সবাই আহা উহু করলো। অথচ ফ্ল্যাটবাড়িটার সবাই রুখে দাঁড়ালে বউটা বাঁচতে পারতো।
স্কুলে যাওয়ার পথে কিশোরী মেয়েটাকে রোজ উত্যক্ত করে পাড়ার বখাটে ছেলেটা। এলাকার কেউ কিছু বলে না। রাজনৈতিক ব্যাকআপ অনেক শক্ত ওর। তাছাড়া মাত্রাছাড়া বেয়াদব। অপমানিত হওয়ার ভয়ে সবাই এড়িয়ে চলে। মেয়েটাকে একদিন দলবেঁধে ধরে নিয়ে গেলো ওরা। রাতভর ধর্ষণ করে মেরে ফেললো।
লাশটা অর্ধউলঙ্গ পড়ে রইলো সবুজ ঘাসে। পুলিশ এলো, সাংবাদিক এলো। পত্রিকায় বড় করে খবর ছাপা হলো। মেয়েটার পরিবার সাংবাদিকদের শুধু বললো, এলাকার সবাই মিলে যদি একটু প্রতিবাদ করতো, আমার মেয়েটা আজ তবে বেঁচে থাকতো।
ছেলেকে স্কুলে ভর্তি করতে হবে। খোঁজ নিতে স্কুলে গেছে মা। দুইটা সন্তানকে নিয়ে তার একার কষ্টের জীবন। সন্তানদের মানুষ করার বিশাল দায়িত্ব তার একার কাঁধে। স্কুল থেকে খবর নিয়ে সন্তানদের কাছে আর ফেরা হয় না মায়ের। খোলা রাজপথে ছেলেধরা সন্দেহে তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলে ‘বীর জনতা’৷
এবার আর কেউ দূরে দাঁড়িয়ে থাকে না। কেউ দূরে দাঁড়িয়ে ভিডিও করে না। সন্তানেরা মায়ের পথ চেয়ে থাকে। কিন্তু মা আর ঘরে ফেরে না। একা নিথর পড়ে থাকে রাজপথে। চারদিকের মানুষগুলো যদি দলবদ্ধভাবে গনপিটুনীতে এগিয়ে না আসতো, তবে বেঁচে যেতো এই মা।
আমরা কখন একতাবদ্ধ হই, আর কখন নিষ্ক্রিয় থাকি, এ এক বিরাট বিস্ময়! আমাদের এই এগিয়ে আসা বা না আসা নিয়ন্ত্রণ করে আমাদের ভিতরে বাস করা এক সুযোগসন্ধানী ডক্টর জেকিল। সে আপাত ভদ্রতার মুখোশ পড়ে বিপদ থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখে। তবে মওকা মতো ঠিক বের হয়ে আসে।
কেউ আলাদা করে চিনতে পারবে না এমন সুযোগ পেলে নৃশংসতায় সামিল হয় নিশ্চিন্তে। ক্ষণিকের এই বীরত্বে ভেতরের ডক্টর জেকিলের সেই স্বত্তাটার আত্মশ্লাঘা হয়। নইলে বেঁচে যেতো বিশ্বজিৎ, রিফাত, পাশের বাড়ির বউটা, ধর্ষণের শিকার মেয়েটা, গণপিটুনির শিকার মা।
অনেকে বলবে, আইনশৃঙ্খলার উপর মানুষের আস্থা নাই, তাই মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নেয়। আমি একমত হতে পারি না। পুলিশ, আইন এসব তৎপর থাকলে আক্রান্ত মানুষটাকে হয়তো বাঁচানো যেতো। কিংবা আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কিছুটা কমতো। কিন্তু ভিতরের সুপ্ত দানবটা তাতে মরতো না।
শুধু কি গণপিটুনি? গৃহকর্মী নির্যাতন কিংবা গরীব রিকশাওয়ালাকে চর থাপ্পড় মারা বা এমন যে কোনো ন্যূনতম সুযোগে হাতের সুখ মেটানোর লোভ আমরা ছাড়তে পারি না কিছুতেই। আমরা ঘরে ঘরে বউ পিটাই নিজের অধিকার মনে করেই।
আমরা আসলে মানসিকভাবে অসুস্থ্য এক জাতি। আমাদের সম্মিলিত মানসিক চিকিৎসা দরকার। শুধুমাত্র আইন-পুলিশ-বিচার এসব দিয়ে এই রোগ সারবে না। কিছুতেই সারবে না।
এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)









