গত সাড়ে চার বছর যাবত রাজধানীবাসীর কাছে ভোগান্তির অপর নাম হয়ে থাকা মৌচাক-মালিবাগ ফ্লাইওভারের সবগুলো রাস্তা অবশেষে যান চলাচলের জন্য খুলে যাচ্ছে। বৃহস্পতিবার মৌচাক-মালিবাগ-শান্তিনগর-রাজারবাগ-মগবাজার অংশ উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে এ ফ্লাইওভারের চারটি অংশের সবগুলো সড়ক উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে। এ যেন সাড়ে বছর ধরে যানজটে থাকার পর সামনে চলার সবুজ সিগনাল ।
রাজধানীতে বসবাস করছেন অথচ মৌচাক-মালিবাগ-মগবাজার-রাজারবাগ-শান্তিনগর এলাকায় যানজট-জলজটের ভোগান্তিতে পড়েননি এমন লোক নেই বললে চলে। ২০১৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি উদ্বোধনের পর নির্মান কাজ শুরু হওয়ার পর থেকে দীর্ঘ যানজটের চরম ভোগান্তি এই এলাকার নিত্যসঙ্গী। একটু বৃষ্টি নামলে পানি জমে সৃষ্টি হয় তীব্র জলজট। ওই এলাকার ভোগান্তি প্রায়ই গণমাধ্যমের শিরোনাম হতে দেখা গেছে। নিচের সড়ক মেরামতসহ উড়াল সড়কের সবগুলো রাস্তা উদ্বোধনের খবরে তাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন ওই এলাকাসহ ওই রাস্তা দিয়ে নিয়মিত চলাচলকারীরা।
ফ্লাইওভারটি বুধবার সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, শেষ মূহূর্তের কাজে ব্যস্ত শ্রমিকরা। ধোয়া মোছা ও রঙ লাগানোর কাজ চলছে পুরোদমে। নির্মান কোম্পানির লোকজন সড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে ঘুরে ঘুরে দেখছেন কোথাও কোন ত্রুটি রয়েছে কিনা।
খবর পেয়ে আশে পাশের এলাকা থেকে মানুষজন এসেছেন ফ্লাইওভারটি দেখতে। বন্ধু-বান্ধব, পরিবার পরিজন নিয়েও অনেকে এসেছেন। ঘুরে দেখছেন, ছবি তুলছেন।
মগবাজার পয়েন্টে কথা হয় শায়লা আক্তার নামে এক গৃহিনীর সঙ্গে। ওই এলকাতেই থাকেন তিনি। ফ্লাইওভার উদ্বোধনের খবর পেয়ে ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে চলে এসেছেন সরেজমিন দেখতে।
চ্যানেল আই অনলাইনকে তিনি বলেন: আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না যে ফ্লাইওভারের কাজ শেষ হয়েছে। সকালে খবরে দেখলাম। তাই নিজের চোখে দেখতে এসেছি।
‘গত সাড়ে চার বছর যাবত যে কী পরিমাণ ভোগান্তি আমাদের পোহাতে হয়েছে সেটা আপনাদের বোঝাতে পারবো না। এই শেষ হয়, এই শেষ হয় করে সাড়ে চার বছর চলে গেছে। তাই সত্যি সত্যিই এবার উদ্বোধনের করা হচ্ছে কিনা তা নিজের চোখে দেখতে এলাম।’
মৌচাক পয়েন্টে কথা হয় রাজারবাগ পুলিশ লাইনস স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী সাদমানের সঙ্গে। স্কুল ছুটির পর সেও দেখতে এসেছে ফ্লাইওভার।‘গত কয়েক বছর যাবত স্কুলে যেতে আসতে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে আমাদের। ফ্লাইওভার চালু হওয়ার পর আমাদের সে কষ্ট দূর হবে বলে আশা করছি।’ বলেন এ কলেজ পড়ুয়া।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের জন্য মৌচাক মার্কেটের সামনে মঞ্চ প্রস্তুতির কাজও চোখে পড়লো অবশ্য সে মঞ্চে প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারেন বলে জানা গেছে।বৃহস্পতিবার (২৬ অক্টোবর) দুপুর ১২টায় গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এ ফ্লাইওভারের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অস্থায়ী মঞ্চে স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী, ঢাকা দক্ষিণের মেয়র ও রাজনৈতিক নেতারা উপস্থিত থাকবেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের কারণে সকাল থেকে মৌচাক থেকে মালিবাগ রেলগেট পর্যন্ত রাস্তাটি উদ্বোধনপূর্ব সময় পর্যন্ত বন্ধ থাকবে বলে জানিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন। যানজট এড়াতে এ সময়টুকুতে বিকল্প রাস্তা ব্যবহারের অনুরোধ করেছেন তিনি।
২০১১ সালে একনেকে এই ফ্লাইওভার নির্মাণ প্রকল্প চূড়ান্ত হওয়ার পর ২০১৩ সালে ১৬ ফেব্রুয়ারি এর নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, প্রথমে এ প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৪৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এরপর বেড়ে ৭৭২ কোটি ৭০ লাখ টাকায় দাঁড়ায়। পরে নকশায় পরিবর্তন আনা হয়। শেষ পর্যন্ত ব্যয় বেড়ে ১ হাজার ২১৮ কোটি ৮৯ লাখ টাকায় গিয়ে ঠেকে।
এ প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকার অর্থায়ন করেছে ৪৪২ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। ৭৭৬ কোটি ১৬ লাখ টাকা দিয়েছে সৌদি ফান্ড ফর ডেভেলপমেন্ট (এসএফডি) এবং ওপেক ফান্ড ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট (ওএফআইডি)।
চারটি অংশে বিভক্ত প্রকল্পটির তিনটি অংশ আগেই খুলে দেওয়া হয়। এর মধ্যে সাতরাস্তা-মগবাজার-হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল পর্যন্ত অংশটি গত বছরের ৩০ মার্চ যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়। ওই বছরের বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর খুলে দেওয়া হয় নিউ ইস্কাটন থেকে ওয়ারলেস মোড় পর্যন্ত এক দিকের অংশ। চলতি বছরের ১৭ মে এফডিসি মোড় থেকে কারওয়ান বাজার পর্যন্ত তৃতীয় অংশ যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হয়। সর্বশেষ মৌচাক-মালিবাগ-শান্তিনগর-রাজারবাগ-মগবাজার অংশ খুলে দেওয়ার মাধ্যমে চালু হয়ে যাচ্ছে পুরো ফ্লাইওভারটি।







