মানচিত্র কি দাবার ঘরের মতো হয়? হয়ত হয়, বাহ্যিক অবয়বে কোথায় কতখানি এর অস্তিত্ব সে আলোচনা অপ্রাসঙ্গিক হলেও রূপক কিংবা উপমায় বিদ্যমান বলেই মনে হচ্ছে। কাব্যভাবনার মতো কোথাও এর অস্তিত্ব অর্থগত আবার কোথাও অন্তর্গত। ‘সাত মণীষীর’ চোখে সমাজ-দেশ আর বিশ্বভাবনার সঙ্কলিত রূপ দেশেদেশে সময়ে সময়ে আলোচনার দাবি রাখে, সাক্ষাৎকারদাতাদের বৈশ্বিক পরিচিতিও এর অন্যতম কারণ।
‘সাত মণীষীর দোরগোড়ায়/ মানচিত্র যখন দাবার ঘর’ শীর্ষক বই সাব্বির খান-এর। দেশ-বিদেশের সাত ব্যক্তির সাক্ষাৎকারভিত্তিক গ্রন্থ এটি। সাক্ষাৎকারগ্রহীতা লেখক প্রবাস জীবন যাপনে দীর্ঘদিন। দেশের প্রতি টানই কেবল নয় মুক্তিযুদ্ধ-বাংলাদেশ-মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস-বঙ্গবন্ধু বিষয়ে তার মগ্ন-পরিচয় সুবিদিত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি নিজেকে একজন ‘এক্টিভিস্ট’ হিসেবে পরিচয় দেন। তার এই এক্টিভিজম মানসিকতা এবং দেশের ইতিহাস ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে সংবেদনশীলতা অনেক সাক্ষাৎকারকে প্রাণ দিয়েছে। ফলে অনালোচিত অনেক বিষয় ওঠে এসেছে যার কিছুটা সরাসরি, আর কিছুটা ইঙ্গিতে।
এখানে একটা প্রশ্ন সামনে আসতে পারে- একজন সাংবাদিক নিজস্ব চিন্তাচেতনাকে কি এভাবে প্রকাশ করতে পারেন? উত্তরে নানাজন নানা কথা বললেও একটা বিষয়ে সবাই একমত হবেন সাক্ষাৎকার কারেন্ট স্টরিজ নয় যে সেখানে নানা বিষয়ে আলোচনা কিংবা মন্তব্য করা যাবে না। সাক্ষাৎকার গৎবাঁধা বিষয় নয় যে প্রচলিত রীতি কিংবা অলিখিত সিলেবাস মেনে চলতে হবে। সাক্ষাৎকারে দুপক্ষের চিন্তার গভীরতার দরকার হয়। আর এসব কারণেই ওখানে ব্যক্তিক চিন্তাও প্রকাশ হয়ে যায়। গ্রহীতার মুনশিয়ানা কিংবা উপস্থাপনাসঞ্জাত প্রশ্নে দাতার উত্তরকে মহাকালের স্থায়িত্বের পথ দেখিয়ে দিতে পারে।
‘সাত মণীষীর দোরগোড়ায়/ মানচিত্র যখন দাবার ঘর’ বইয়ে সাব্বির খানের সতর্ক দৃষ্টি ছিল বলে পাঠান্তে মনে হয়েছে। তিনি যখন নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে কথা বলছিলেন তখন প্রসঙ্গক্রমে যুদ্ধাপরাধ ইস্যু আসে, মুক্তিযুদ্ধ আসে, জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধের প্রসঙ্গ চলে আসে; এমনকি এই শতকে সারাদেশ তোলপাড় করে দেওয়া এক-এগারো প্রসঙ্গও চলে আসে। পাশাপাশি এই আলোচনায় ওঠে আসে সুইডেন-বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নির্মাণশৈলী; দুই দেশীর মধ্যকার প্রযুক্তি বিষয়ক কথকতা। আসে জীবনাচারের কথাও। দুই দেশের মানুষের মধ্যকার যান্ত্রিকতা ও সহজসরল মানসিকতাও ওখানে আলোচনা হয়। ফলে নির্মাতা হুমায়ূনের মধ্যকার রাজনৈতিক বোধ-বিশ্লেষণ, সামাজিক মানসিকতার প্রকাশটাও পাঠকের সামনে উন্মুক্ত হয়ে যায়। ফলে ‘রথ দেখা ও কলা বেচাও’ হয়ে যায় পাঠকের। সিনেমার আলোচনার খুঁটিনাটি পড়তে গিয়ে পাঠক জেনে যান সাক্ষাৎকারদাতার রাজনৈতিক বিশ্বাসের জায়গাটাও। ওই জায়গাটা আবার কখনও রবীন্দ্রনাথের সংজ্ঞায়িত ছোটগল্পের মত- ‘শেষ হইয়াও হইল না শেষ’-এর মত যেখানে পাঠকের সামনে উত্তরের ইঙ্গিত পেয়েও উত্তর না পাওয়ার হাহাকার আর কিছু উন্মুক্ত দরোজা; কবিতার মতো বিশ্লেষণের অনেকগুলো পথ যেখানে দায়িত্ব কেবল পাঠক কিংবা বিশ্লেষকের।
সাব্বির খান তার সাক্ষাৎকারের আলোচনাকে সাত পৃথক শিরোনাম দিয়েছেন, যা উদ্ধৃতি থেকেই। এর মধ্যে আছে- “প্রত্যেক দলের থলেতে একটা করে বিড়াল আছে-হুমায়ূন আহমেদ; গণহত্যার দায় থেকে কেউ রেহাই পেতে পারে না- ড . বার্নার্ড ওয়েন্সটেইন; ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করে কোনো দেশই সভ্যতার নাগাল পায়নি- তসলিমা নাসরিন; একাত্তরের হত্যাযজ্ঞ গণহত্যা ছাড়া আর কিছুই নয়- লর্ড এভেবুরি; মহাত্মা গান্ধিকে শান্তিপুরস্কার না দেয়া নোবেল কমিটির ভুল ছিল- ওলে ডানবোল্ট; শরিয়া আইন শুধু রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলেরই হাতিয়ার- পারভিন আরদালান; উনি আমারও জাতির পিতা- ওমিদ খান”। এই শিরোনাম দিয়েই যদি পাঠক পুরো সাক্ষাৎকারকে বিশ্লেষণ করতে বসেন তবে সেটা ভুল হবে; অথবা বলা যায় শিরোনামেই পাঠক-ভাবনা আটকে থাকলে সাব্বির খানের প্রতিই অবিচার করা হবে। কারণ সাক্ষাৎকারের চুম্বক অংশ শিরোনামে থাকলেও পুরো আলোচনা যাবতীয় পূর্বধারণা অতিক্রম শেষে নানা শাখা-প্রশাখা বিস্তার করেছে। ফলে এখানে মগ্নপাঠ জরুরি, দুপক্ষই জানতে।
ইরানের নারীনেত্রী পারভিন আরদালানের আন্দোলন নিয়ে কথা বলার সময়ে সাব্বির খান বাংলাদেশ প্রসঙ্গ এনেছেন। যেখানে পারভিন আরদালান অন্য অনেক কথার সঙ্গে নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিনকে দেশে ফিরতে দেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছেন। এই বইয়েও সন্নিবেশিত সাক্ষাৎকারে দেশে ফিরতে তার আকুতির কথাও জানিয়েছেন তসলিমা। পারভিন আরদালান তার আলোচনায় বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে তার সমর্থনসূচক ইতিবাচক কথা বলেছেন। তার ভাষ্য, ‘মৌলবাদী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারলে,সামাজিকভাবে নারীর উপর অত্যাচার অনেকাংশে লোপ পাবে বলে আমার বিশ্বাস’।
সাত মণীষী হিসেবে বইয়ে লেখক যাদের মণীষী হিসেবে চিত্রিত করে সাক্ষাৎকার গ্রন্থিত করেছেন তাদের মধ্যে আছেন- প্রখ্যাত লেখক ও নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ড. বার্নার্ড ওয়েন্সটেইন,নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন, ব্রিটিশ মানবাধিকার বিষয়ক সংসদীয় কমিটির সহ-সভাপতি প্রয়াত লর্ড এভেবুরি, নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান ওলে ডানবোল্ট, ইরানের নারীনেত্রী পারভিন আরদালান, এবং লেখক-পুত্র ওমিদ খান।
এদের মধ্যে প্রথম ছয়জনই স্ব স্ব ক্ষেত্রে পরিচিত ও বিখ্যাত। তারা মণীষী হিসেবে পরিচিত হবেন কিনা এর উত্তর আগামীর গর্ভে, তবে তাদের স্বাতন্ত্র্য ও পরিচিতি তাদেরকে আলাদাভাবে উল্লেখের দাবি রাখে; এবং এটা ভৌগলিক সীমারেখা অতিক্রম করে বিশ্বব্যাপীই। সে হিসেবে লেখক সাব্বির খানের সাক্ষাৎকারের বিষয়বস্তু হয়েছেন প্রথমে এবং এরপর মলাটবদ্ধ হয়েছেন ‘মানচিত্র যখন দাবার ঘর’ বইয়ে। এই সাক্ষাৎকার গ্রহণের পদ্ধতি সম্পর্কেও ‘আমার কৈফিয়ত’ শিরোনামের মুখবন্ধে লেখক উল্লেখ করেছেন সবিস্তার। সাক্ষাৎকার গ্রহণের পরিচিত লিখিত, সরাসরি, সম্পূরকসহ নানা পদ্ধতি গ্রহণ শেষে উপস্থাপনযোগ্য করেছেন লেখক। ওইসব সাক্ষাৎকার নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু শেষে রাজনীতি-সমাজনীতিসহ সার্বিক দিক স্পর্শ করেছে। এখানে সাক্ষাৎকারদাতা সঙ্গে সঙ্গে সাক্ষাৎকারগ্রহীতার মুনশিয়ানা প্রণিধানযোগ্য।
লেখকপুত্র ওমিদ খানের সাক্ষাৎকার এই বই নিয়ে আলোচনার মধ্যে অনালোচিত দিক হয়ে থাকলেও থাকতে পারে। তবে এই স্বতন্ত্র ধারণা কিংবা সাহসের জন্য আমি লেখককে ধন্যবাদ দিতে চাই, কারণ এরমধ্যে পরিচিত ও খ্যাতিমানের ভিড়ে অপরিচিত ও অখ্যাতের ভাবনাও ওঠে এসেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ওমিদ খানও বড় হতে থাকবে, এর সঙ্গে তার ভাবনারও বিস্তৃতি ঘটবে। কিশোরমনের মলাটবদ্ধ ভাবনাগুলোকে পরিণত সময়ের বিভিন্ন সময়ে যখন সে মেলাবে তখন তার সামনে আরও বিশাল পৃথিবী উন্মুক্ত হবে। এখানে লেখক ও পিতার দায়বদ্ধতার জায়গাকে সুন্দরভাবে যূথবদ্ধ করতে চেয়েছেন সাব্বির খান।
‘সাত মণীষীর দোরগোড়ায়/ মানচিত্র যখন দাবার ঘর’ বইয়ের ‘কৈফিয়ত’ অংশে সাব্বির খান বলছেন, ‘সাদাকালো দাবার ঘরগুলো মূলত প্রতীকী দ্বন্দ্বের নাম, যার শুরুটা আদিতে হলেও অনন্তের মাঝে আজও তা বিরাজমান’। তিনি বিশ্বমানচিত্রে অন্য দেশের মত বাংলাদেশকে ‘একটি দাবার ঘর’ হিসেবে উল্লেখ করে বলছেন, ‘যাকে ঘিরে কূটচাল হয় প্রতিনিয়ত;ভেতরে এবং বাহিরে। জানতে চাই কূটচালের গোপনীয়তাগুলো’।
সাব্বির খান ‘কূটচালের গোপনীয়তা’ জানতে স্বকালের পাঠকের কাছে অনাগতকালকে ঘিরে কিছু ইঙ্গিত দিতে চেয়েছেন। সাক্ষাৎকারমূলক আলোচনার পথ ধরে সমকালে বসা পাঠকের একজন হিসেবে কিছু উত্তর এই কাল এবং কিছু উত্তর মহাকালের কাছ থেকে নিতে চাইছি।
অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৯-এ বইটি প্রকাশ করেছে বর্ষা দুপুর প্রকাশনী। প্রচ্ছদ করেছেন শিবু কুমার শীল। মূল্য ২০০ টাকা। পাওয়া যাচ্ছে গ্রন্থমেলার ২৯৬-২৯৭ নং স্টলে।







