ট্রাম্প সরকারের ৭ টি দেশের রেফুজি আমেরিকাতে ঢুকতে দেবা না দেবার বিষয়ে হাজারে হাজার সাধারন আমেরিকান কেন রাস্তায় নেমেছে তা নিয়ে মুসলিম অধ্যুসিত দেশের অনেক মানুষ বিরক্ত। কেউ বলছে এটা ঢং, হিপক্রিসি, ভাওতাবাজী ইত্যাদি। যারা এমন কথা বলছেন, তাদেরকে আমি খুব সহজ সরল মানুষ বলব। এদের অনেকে লেখা লিখিও করেন। এদের সহজ সরল বলছি কেননা “গবেট” বললে ব্যাপারটা খারাপ শুনায়।
এই সহজ সরল লেখকদের একটা বৈশিষ্ট হলো, এনারা সাদা-কালো, পক্ষ-বিপক্ষ, শত্রু-মিত্র, ভালোবাসা-ঘৃনা এরকম বাইনারি বিষয়ের বাইরে চিন্তা করতে পারেন না। সাদা কালোর মাঝামাঝি যে ধুষর আছে, শত্রু-মিত্র এর মাঝামাঝি যে “ওকে” সম্পর্ক থাকে, কিংবা ভালোবাসা ঘৃনার মাঝামাঝি যে নিউট্রাল বা সাদামাটা সম্পর্ক রাখা যায় এগুলো বুঝার মতো ক্ষমতা এদের নাই। ট্রাম্পকে ভোট দিয়ে যেহুতু আমেরিকানরা একবার জিতিয়েছে, সেহুতু আমেরিকার সব মানুষ সারাজীবন মুসলমানকে ঘৃনা করবে, মেরে ফেলবে, এমনটাই হবার কথা, এমনটাই হতে থাকবে — এদের বুঝার জন্যে এটা খুব সহজ সরল আইডিয়া। ইজি এনালাইসিস। কিন্তু ট্রাম্পের দেশে মুসলমানের পাশে দাঁড়ানোর মতো প্রতিবাদী — তাও আবার সাদা আমেরিকান — এরা কারা, কেন এরা বেড় হলো, এই সব কমপ্লেক্স ইস্যু এনালাইজ করার মতো মেধার অপচয় এই সব সহজ সরল মেধাবীর পক্ষে করা সম্ভব না। “
কই সিরিয়ায় কিংবা ইয়েমেনে যখন আমেরিকা বোমা মারে, তখন কোথায় থাকে এইসব প্রতিবাদী” —- এইটা হচ্ছে সহজ সরল মানুষের প্রশ্ন।এই প্রশ্নটার গুরুত্ব আছে, এবং এটার একটা ভালো উত্তর দিব আজকের লেখায়। যে কোন দেশের সাধারন মানুষ কে “সাধারন” মানুষ বলা হয় একটা বিশেষ কারনে। সেই কারনটা হলো, এই মানুষ গুলো “অসাধারন” না — তাই। আমেরিকার সাধারন মানুষ অসাধারন না বলেই, তার দেশ থেকে ৫০০০ হাজার মাইল দূরে কোন দেশে কোথায় গিয়ে তার দেশের মিলিটারি বোমা ফেলে, কেন ফেলে, মিলিটারির কথা সত্যি, নাকি নিউজ মিডিয়ার নিউজ সত্যি, কে আসলে টেররিস্ট, কে নিরাপরাধ ইত্যাদি নিয়ে বিশ্লেষন করে বেড় করা এদের পক্ষে সম্ভব হয় না সব সময়। একারনে এরা যখন টিভিতে দেখে তার দেশ অন্য দেশে গিয়ে কিছু করেছে, এরা হয়তো টিভি খুলে একটু বুঝার চেষ্টা করে।
তার পরে সন্ত্রাস, যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক মিলিটারি বিষয়ক ব্যাপার স্যাপার দেখে, “এতো বুঝে আমার কাজ নাই” এমনটা ভেবে চ্যানেল চেঞ্জ করে হাসি তামাশার শো দেখে। কিন্তু আবার এই সাধারণ মানুষ গুলোই যখন দেখলো যে তার বাসা থেকে মাত্র ৩০ মিনিট দূরে ১০০ রিফুজিকে তার দেশের পুলিশ আটকিয়ে রেখেছে, এই একই সাধারণ মানুষ গুলো ভিন্ন ভাবে রিয়াক্ট করলো। তাদের এই রিয়াকশনটাও কিন্তু ছিল খুব সাধারন। সেটা হলো, তার ভাবলো, এটাতো মিডিল ইস্ট বা এশিয়া না, একে বারে আমার বাসার পাশেই। যাই তো দেখি কেন এমন করছে পুলিশ? খামাখা মুসলমান রিফুজিকে আটকে রাখাতো খুব খারাপ কাজ। দেখিতো আমি রাস্তায় দাঁড়ায় চিল্লালে পুলিশ ছাড়ে কিনা? চিন্তাটা কিন্তু খুবই সাধারণ, তাই না? এখন এই সাধারণ আমেরিকানের সাথে সাধারণ বাংলাদেশী মুসলমানের তুলনা করি চলেন।
রোহিঙ্গা রেফুজিরা যখন নৌকায় চড়ে চট্টগ্রামে এসে পাগলের মতো কাদছিল, তখন চট্টগ্রামের কিংবা ঢাকার কয়জন আধুনিক ছেলে মেয়ে দৌড়ে চট্টগ্রাম চলে গিয়ে হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে বলেছিল, ” Let Them In”?? ঢাকার মোহাম্মদপুরে আমার বড় হওয়া। জেনেভা ক্যাম্পের বিহারী, যাদের পূর্ব পুরুষরা আসলে ভারতের মুসলিম নাগরিক, কিন্তু যাদেরকে আমরা নাম দিয়েছি “আটকে পড়া পাকিস্তানি”, এদের আসে পাশেই ছিল আমার অবাধ বিচরণ। অনেক বড় হয়ে বুঝতে পেরেছিলাম এই বিহারি মানুষগুলোর বাংলাদেশি নাগরিকত্ব নেই। এরা ইমিগ্রেন্টও না, নাগরিকও না, এরা হলো রেফুজি। ১৯৯০ সালের দিকে হাতে গোনা কিছু এক্টিভিস্টকে দেখতাম বিহারীদের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল রাস্তায়। মডেল স্কুলের পিছে। কিন্তু কোন দিন দেখি নাই ১০-২০ জনের বেশী মানুষ হয়েছে। 
অথচ, এই বিহারীরা, যাদের সন্তানরা বাংলাদেশে জন্ম নিয়েও বাংলাদেশি নাগরিক হতে পারছিল না, যাদের সবাই মুসলিম, যারা সবাই প্রচন্ড কর্মঠ, এদের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে আমাদের প্রতিবাদী হয়াটা কিন্তু খুবই ইজি একটা ব্যাপার ছিল। উপরের মতো আরো অনেক উদাহরন আনা যায়। উদাহরন দিয়ে লজ্জা দেবার জন্যে এই লেখাটা আসলে না। শুধু রেফুজি এবং ইমিগ্রান্ট এই দুই বিশয়ের কাছাকাছি আছে এমন দুইটা উদাহরন দিয়ে বুঝালাম সুযোগ যখন হাতের কাছে আসে ঘরের পাশে দাঁড়িয়ে, নির্দোষ প্রতিবাদ করার, তখন সাধারণ বাঙালি আর সাধারণ আমেরিকানের মধ্যে পার্থক্যটা কোথায়? যা কিছু চোখের সামনে ঘটে না, যা কিছু হাতের নাগালের বাইরে, সাধারণ মানুষ তা নিয়ে প্রতিবাদে খুব কমই ফুসে উঠে। এটা সাধারণ মানুষের একটা লিমিটেশন।
একারনে সাধারন আমেরিকানের পক্ষে আমেরিকার সরকার কোথায় ৫০০০ মাইলে দূরে গিয়ে ২৬০০০ বোমা ফেলল তা রাস্তায় নেমে থামানো সম্ভব না (যদিও ইরাক ও ভিয়েত্নাম যুদ্ধের সময় ৩০-৫০ লক্ষ আমেরিকান রাস্তায় নেমে সেই চেষ্টাও করেছিল)।
ঠিক একই ভাবে সাধারন বাঙ্গালির পক্ষেও সম্ভব না তার সরকার, তার চোখের আড়ালে, কখন চট্টগ্রাম হিল্ট্রাক্সে পাহাড়িদের সাথে কি অবিচার করে করে তা নিয়ে রাস্তায় নেমে সব অবিচার বন্ধ করার। যদি সাধারণ বাঙালি ও সাধারণ আমেরিকানের কান্ড জ্ঞ্রান ও নাগরিক দায়িত্ববোধ বিচার করতে চান, তাহলে তা করতে হবে এই সাধারণ মানুষের নাগালের বা সাধ্যের মধ্যে, চোখের সামনে ঘটা অন্যায় অবিচারের সময় তারা কে কি করেছে তার তুলনা দিয়ে। এমন তুলনা করলে সাধারণ বাঙ্গালির লজ্জা পেতে হবে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)








