নরেন মুর্মুর মতো অনেকেই গত ১৫ বছরে কোনো ট্রাক্টর দেখেনি। নরেন অনেক ছোটকালে দেখেছিল বড় রাস্তা পাকা করার সময় একটা যন্ত্র এসে রাস্তা সমান করে দিচ্ছে। কিন্তু এবার দেখলো সেই যন্ত্র এসে তাদের ভিটেমাটি সমান করে দিল। নরেনের ভাষায় যদি বলি, ‘মুই আগত কোনোদিন ট্র্যাক্টর দেখো নাই। সেই ছোটকালে একবার দেখছিলাম একখান ইয়াও যোন্ত্র আসি হামারলার আস্তা ঘাট সব পাকা করি দিলে, সমান করি দিলে। আর এইবার দেখিনু সেই যোন্ত্র আসি হামারলার ঘরবাড়ি সব সমান করি দিলে। একপাল মাইনষি আসি প্ররথমে হামারলার ঘরবাড়ি আগুন দিয়া জ্বালি দিলে, পরে আসি যোন্ত্র আনি সামান কারি দিলে।’
জয়ন্তী কেরকাটা স্থির চোখে তাকিয়ে আছে খোলা প্রান্তরের দিকে। ঐতো ওখানেই ওদের ঘর ছিল, ওখানেই ও বিয়ে হয়ে এসে উঠেছিল, ঐ ঘরেই তার সন্তান জন্মেছিল। আজ সব শেষ। আগুনে পোড়া ঘরের ছাইটুকুও নেই। কিন্তু ছাইচাপা আগুন জ্বলছে তাদের হৃদয়ে। জয়ন্তী বলল, কুন্ঠে যাম জানিনা। ট্যাকা নাই, পাইসা নাই। ছাওয়া ছোটক ধরি কী করিম এলায়? আমার মরদ ভয়ত পালে গেইছে।’ একজন মানবাধিকার কর্মী ঐ এলাকা ঘুরে এসে এই কথাগুলো জানালো।
ভাগ্যি আমাদের ’সুপার মুনের’ এই চাঁদ আলো দেয়ার সময় ধনী-গরীব, সাঁওতাল-অসাঁওতাল কোনো ভেদ করছেনা। আর তাই হয়তো তীব্র শীতের রাতে ভিটেমাটিহীন মানুষগুলো গাছের নীচে থাকতে পারছে, আগুন জ্বালিয়ে একটু চাল ফুটিয়ে খেতে পারছে। প্রভাবশালীদের ক্ষমতা থাকলে নির্ঘাত ঐ চাঁদের আলোও তারা কেড়ে নিত, যেমন করে কেড়ে নিয়েছে দরিদ্র মানুষগুলোর আশ্রয়টুকু, জ্বালিয়ে দিয়েছে তাদের সবকিছু। গোবিন্দগঞ্জের মানবেতরভাবে দিনযাপনকারী ঐ সাঁওতাল নারী, শিশু ও কিছু পুরুষের কথা বলছি।
সত্যিতো এই অসহায়, দরিদ্র মানুষগুলো তাদের এতদিনের আশ্রয় ছেড়ে কোথায় যাবে? জাতিগতভাবে এরা একসাথে থাকে। এরা গড়ে তোলে সাঁওতালপল্লী। বাচ্চারা এখানে স্কুলে পড়তো। নিজেরা এখানে ওখানে কাজ করে দিন পার করতো। কিন্তু এরা এখন যাবে কোথায়? প্রশাসন তাদের বাস্তুচ্যুত করেছে কিন্তু কোনো আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেনি। পুরো এলাকাটা এখন সমান, শুনশান । ভিটেমাটির বা পোড়া ভিটেমাটিরও কোনো চিহ্ন নেই। এই কিছুদিন আগেও যে এখানে বসতি ছিল তা বোঝার কোনো উপায় নাই। কিছু হাঁড়িকুড়ি ও প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস নিয়ে এই শীতের দিনে এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কিছু তাড়া খাওয়া মানুষ। উত্তরাঞ্চলে এসময়টাতে ঠান্ডা অনেকটাই বেশি। রাতে প্রায় হাড়কাঁপানো শীত। শিশু ও বয়স্কদের ভোগান্তির কোনো শেষ নেই।
উত্তরাঞ্চলের সাংবাদিক পরিমল মজুমদার, যিনি গোড়া থেকেই এই উচ্ছেদ, হানাহানি, ভাংচুর প্রত্যক্ষ করছেন, তার ফেসবুকে লিখেছেন – ‘১১ এপ্রিল ১৯৭১ । সুখচর, আসাম, ইন্ডিয়া। আমরা দুপুরের খাবার খাচ্ছি। বাড়ি-ঘর ফেলে আসা আর দেশত্যাগের অপমান। ভিতরে ভাত ঢোকে না, তবু পেটে ক্ষুধা……. ১৩ নভেম্বর ২০১৬ । মাদারপুর, গোবিন্দগঞ্জ। উচ্ছেদ হওয়া সাঁওতালরা খোলা আকাশের নীচে কলাপাতায় খাচ্ছেন দুপুরের খাবার। পূর্ণিমার চাঁদ এখানে হাহাকার করে। পার্থক্য- স্বাধীন হইলাম মুক্তি পাইলাম না…..।’
এই সংগ্রামী, সাহসী ও সহজ-সরল মানুষগুলোকে বরাবর যুদ্ধ করতে হয়েছে জমিদার, ভূমিগ্রাসকারী মহল, সুদখোর ও পুলিশের সাথে। সেই ১৮৫৫-৫৬ সালের সাঁওতাল বিদ্রোহ থেকে শুরু করে ১৯৪৬ থেকে ১৯৫০ সালের তেভাগা আন্দোলন ছিল এদেরই আন্দোলন। সাঁওতালদের ইতিহাস হচ্ছে আন্দোলন ও সংগ্রামের ইতিহাস। নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য সবসময়ই এদের পথে নামতে বাধ্য করা হয়েছে।
বাংলাদেশে যত আদিবাসী গোষ্ঠী আছেন, এদের মধ্যে সাঁওতালদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হলেও, অবস্থানগত ও অধিকারের দিক দিয়ে এদের অধ:স্তন অবস্থান। সামাজিকভাবেও এই মানুষগুলোকে অচ্ছুৎ করে রাখা হয়েছে কোনো কোনো এলাকায়। পূর্ব বাংলা বা আজকের বাংলাদেশে এরা ঠিক কবে, কীভাবে এসেছে তা খুব সুনির্দিষ্টভাবে বলা না গেলেও-১৮৮১ সালের শুমারি অনুযায়ী পাবনা, যশোর, খুলনা ও চট্টগ্রামে সাওঁতাল পল্লী ছিল। বর্তমানে দিনাজপুর, রাজশাহী, নঁওগা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রংপুর, পঞ্চগড়, নাটোর, ঠাকুরগাঁও, সিলেট, জয়পুরহাট ও মৌলভীবাজারে এদের বাস। সংখ্যায় এরা বেশি হলেও পড়াশোনা, চাকরি, ব্যবসাসহ সবক্ষেত্রেই এরা পিছিয়ে আছে। এরা দরিদ্র এবং দরিদ্র বলেই বাধ্য হয় খুব স্বল্প মজুরিতে তাদের শ্রম বিক্রি করতে। প্রতিনিয়ত জমির মালিক ও কর্জদাতারা তাদের জমি কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করে বলে ভূমির উপর এদের অধিকারবোধ অনেক বেশি।
কেন সাঁওতালরা চিনি কল কর্তৃপক্ষের সাথে বিরোধে জড়িয়ে গেল, কেন আজ তারা ঘরছাড়া, কেন তাদেরকে মারা যেতে হচ্ছে আন্দোলন, সংগ্রাম করতে গিয়ে? এগুলো বুঝতে গেলে আমাদের একটু পেছনে ফিরে তাকাতে হবে। সাঁওতালরা বনবনানি, ভূমি পরিস্কার করে, নিজেদের বসতি তৈরি করে, কৃষিকাজ শুরু করেছিল বৃটিশ পূর্ব আমলে। উপনিবেশিক আমলে চেষ্টা হয়েছিল সাঁওতালদের কাছ থেকে ভূমি কেড়ে নেয়ার। সাঁওতালরা তখনও তাদের অধিকার ছেড়ে দেয়নি। তারা উপনিবেশিক শোষণের বিরোধিতা করেছিল। কারণ সাঁওতালরা বিশ্বাস করতো যারা জমিটিতে প্রথম বসতি স্থাপন করেছে, সেই ভূমির মালিকানা তাদেরই। মুঘলরা তাদের এই বিশ্বাস মেনে নিয়েছিল বলে কোনো ঝামেলা হয়নি। কিন্তু বৃটিশ আমলে এসে জমিদাররা বহুবার এসব জমি দখল নেয়ার চেষ্টা করেছিল। আর সাঁওতালরাও বারবার তা প্রতিহত করেছিল। বাঙালি জমিদার, জোতদার, দোকানদার এবং রেলওয়ের ঠিকাদারদের দ্বারা অব্যাহতভাবে সাঁওতালরা প্রতারিত ও নিপীড়িত হয়েছে বলে, জমিজমার ব্যাপারে তাদের বিশ্বাস একেবারে শূন্যের কোঠায়।
এমনকি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সাঁওতালরা যখন আর সবার সাথে শরণার্থী হয়ে ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল, তখনও তাদের জমিজমা নিয়ে নেয়া হয়েছিল। তারা ভারত থেকে ফিরে আসার আগেই তৎকালীন ভূমি কমিশন কৌশলে ভূমি মিউটেশনের কাজটি সেরে ফেলেছিল এবং সাঁওতালদের অনেক জমি গ্রাস করেছিল। এরকম একটি চলমান অবিশ্বাসের সম্পর্কের কারণে বহুবার সাঁওতালদের সাথে ভূমি নিয়ে প্রশাসন, প্রভাবশালী মহলের বিরোধ বেধেছিল ।
সাহেবগঞ্জের রংপুর চিনিকলের জমি নিয়ে সাঁওতালদের সাথে মালিক-কর্তৃপক্ষের গোলযোগও এরকম একটি। চিনিকল কর্তৃপক্ষ জমি অধিগ্রহণের সময় জমির মালিকদের সাথে চুক্তি করেছিল কখনও জমিতে আখ ছাড়া অন্য কিছু আবাদ করলে, ঐ জমি মালিককে ফিরিয়ে দেয়া হবে। কিন্তু গত কিছুদিন ধরে ঐ জমিতে আখ চাষ না হয়ে ধান ও তামাক চাষ হচ্ছে । কিন্তু কথা অনুযায়ী জমি ফিরিয়েও দেয়া হচ্ছেনা। কাজেই জন্ম নেয় অবিশ্বাস এবং শুরু হয় বিরোধ এবং ফল হিসেবে ভিটেমাটি হারিয়ে পথে এসে দাঁড়াতে হলো এই ভূমিপুত্রদের। এদের অবস্থা দেখে বারবার মনে হচ্ছে চিরকুটের গাওয়া সেই গানটির কথা —–
‘সত্য কি তেতো, সেকি জীবনের মত
বেঁচেও মরা, নাকি বিভেদের ক্ষত।’
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







