নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ছাড়া বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট নির্বাচনে যাবে না এমনটিই ঘোষণা ছিলো তাদের। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন এই ইস্যুতেই তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। প্রত্যাখ্যানকে কঠোর করতে পেট্রোলবোমা মেরে মানুষ হত্যা, গাড়ি পোড়ানো ও পুলিশ হত্যার মত ভয়ংকর চরমপন্থী ভূমিকাতেও নেমেছিলো। তারা ডেকেছিলো অনির্দিষ্ট কালের অবরোধ কর্মসূচী।
সে অবরোধ কর্মসূচী তারা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিলো না। তাদের অবরোধ আহ্বান এখনও বহাল আছে! তবে তা আপনা আপনিই প্রত্যাহার হয়ে গেল। এই সরকার গঠনের শেকড় ৫ জানুয়ারির নির্বাচন তারা বর্জন করল আবার এই সরকারের অধীনে একেবারে দলীয় প্রতীক নিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করল। তারা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনেও অংশ গ্রহণ করল। এই সরকারের অধীনে জেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল।
বিএনপি আবার এই নির্বাচনে গেল না। কেন গেল না? জেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থীতা দেয়ার মতো তাদের লোক নেই বিষয়টা নিশ্চয়ই সেরকম নয়। খালেদা জিয়া ও বিএনপির রাজনীতিকে আপোষকামী ও আপোষহীন কোনটাই বলা যায় না। তাদের রাজনৈতিক অবস্থান পরিষ্কার করতে না পারাই তাদের রাজনৈতিক অসাফল্যের কারণ। তারা যদি বলতো, এ সরকার অবৈধ, এসরকার অগণতান্ত্রিক। এ অবৈধ ও অগণতান্ত্রিক সরকারের অধীনে বৈধ ও গণতান্ত্রিক নির্বাচন সম্পন্ন হতে পারে না। এই অবস্থানে যদি তারা অটুট থাকতে পারত তাহলে রাজনৈতিক মূল্যায়নে তারা অবশ্যই মূল্যায়িত হতো।
কিন্তু তারা এই অবস্থানে অটুট থাকতে পারলো না। তারাই বলে অবৈধ সরকার আবার তারাই তাদের বলাকৃত অবৈধ সরকারের অধীনে কোন নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে আবার কোন নির্বাচন বর্জন করছে। যদি এমনই সিদ্ধান্ত নেবে তবে শেখ হাসিনার নির্বাচনকালীন জাতীয় সরকারে অংশগ্রহণের প্রস্তাবনা কেন মানলো না তারা?
২০১৯ সালে আবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতীয় নির্বাচন। এটা প্রায় নিশ্চিত যে এনির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হচ্ছে না। এক্ষেত্রে কী করবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট। তাদের দাবি নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্তাবধায়ক সরকার। আবার এ সরকারের দ্বারা নির্বাচিত সার্চ কমিটিতে তারা নির্বাচন কমিশনারদের নাম তালিকার প্রস্তাবনাও পাঠায়। তারা কেন বলতে পারলো না ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত এই অবৈধ সরকারের সার্চ কমিটি গঠন ও সার্চ কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠন অবৈধ?
রাজনৈতিক স্ববিরোধিতার আত্মনাশী ভূমিকা পরিলক্ষিত হবে ২০১৯ সালের নির্বাচনেও। স্ববিরোধিতার ধারাবাহিকতা তুমুলভাবে চলমান রয়েছে। যেমন এই সরকারের অধীনে উপনির্বাচনেও অংশ নিচ্ছে তারা। এ সরকারকে নিজেরা অবৈধ বলে আবার নিজেরাই বৈধতার স্বীকৃতি দিয়ে স্ববিরোধিতার চিতায় পুড়ে ভস্ম হচ্ছে দিনকে দিন। জনপ্রত্যাশিত কত রকম ইস্যুতে কর্মসূচী দেয়ার সুযোগ থাকা স্বত্তেও বিএনপি তা পারলোনা। সরকার যে বিভিন্ন কর্মসূচী ঠেকাতে চাইবে এতো নতুন কিছু নয়। সরকার, সরকার বিরোধী কর্মসূচীকে সহযোগিতা করবে ও সমর্থন জানাবে এমনটি ভাবা বোকার স্বর্গে বসবাস নয় কি?সরকারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে কর্মসূচী পালন করতে পারাতেই রাজনৈতিক যোগ্যতা ও সামর্থের প্রকাশ।
যেমন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, ৬৯ এর গণ অভ্যুত্থান,একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধ, এরশাদ বিরোধী আন্দোলন কোনটাতে সরকার সহায়তা করেছে? সরকারী সহায়তায় সরকারবিরোধী আন্দোলন কোথায় হয়? বিএনপি নেতারা কি ভাবছেন, তারা’ আওয়ামীলীগ সরকার’ বিরোধী আন্দোলন করবে আর ‘আওয়ামী লীগ’ তাদের কর্মসূচী পালনে সহায়তা দেবে?
এই ভাবনা কি অবান্তর, অবাস্তব,অযৌক্তিক ও হাস্যকর নয়? স্ববিরোধিতা, সিদ্ধান্তে অটল থাকার যোগ্যতাহীনতা কাপুরুষোতার খপ্পড়ে বিএনপির রাজনৈতিক উত্থান সম্ভাবনার প্রতিনিয়ত অপমৃত্যু ঘটছে। রাজপথ বাদ দিয়ে তারা কেবলই প্রেসব্রিফিং আর ঘরোয়া বিবৃতি নির্ভর দলে পরিণত হয়েছে। কর্মসূচী বিহীন রাজনৈতিক দল ক্রমশ স্তিমিত হয়ে যায়। সেজন্য হতাশ ও ভয়ার্ত নেতাকর্মীরা দলে দলে দল ত্যাগ করছে। জিন্দাবাদের বদলে জয় বাংলা বোল ফুটছে তাদের।এ বোল আদর্শের নয়, এ বোল পিঠ বাঁচানোর ও সুবিধা সন্ধানের।
কী করবে ২০১৯ এর নির্বাচনে? তারা কি পারবে আগামী জাতীয় নির্বাচন আওয়ামীলীগ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত না হতে দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক অথবা নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন সরকারের অধীনে সম্পন্ন হতে বাধ্য করতে? এরকম ভাবনা তখনই সত্য হবে যখন ঘোড়া বাচ্চা বিয়ানোর বদলে ডিম পাড়বে। যাকে মানুষ ‘অশ্বডিম্ব’ বলে। স্ববিরোধিতা ও পরস্পর বিরোধিতা দিয়েই বিএনপির উত্থান। বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা, পাকিস্তানে চাঁদ তারা পতাকা, মুক্তিযোদ্ধা, রাজাকার, ডান, বাম সকলকে নিয়ে বিএনপির সৃষ্টি।
বিএনপির যাত্রা সেভাবে হয়নি। সেটা হয়ে ওঠে নেতৃত্ব,কর্তৃত্ব ও ক্ষমতালোভীদের বোল পাল্টানোর মিলন মেলায়। নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার দাবির প্রশ্নে আগামী নির্বাচনেও যে বোল পাল্টে শেখ হাসিনার অধীনেই নির্বাচনে যাচ্ছে সেটা নিশ্চিত। কারণ নির্বাচন বর্জন করলে তাদের আম,ছালা দুটোই যাবে। কারন এতে আওয়ামীলীগ বাধাহীনভাবে সরকার গঠন করবে। আর বিএনপি হারাবে তার রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন। তখন ২০১৯ এ-তো নয়ই এর পরেও আর সরকার গঠনে তাদের কোন আশা থাকবে না।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)








