নবম সংসদ থেকে শুরু করে দশম সংসদ ও মন্ত্রীসভা, খেয়াল করলে দেখা যায় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ ছাড়া কিছুই হচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর নিয়ন্ত্রণ সমালোচনাযোগ্য না হলেও সকল বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তাঁর অংশগ্রহণ ও নির্দেশনা কিছুটা হলেও প্রশ্ন জাগে বাকি সবাই কি পোশাকি পরিষদের একেক জন ব্যক্তি অথবা ব্যক্তিত্ব।
বিষয়টি যদি ইতিবাচক অর্থে হতো তাহলে হয়ত প্রশ্ন ওঠত না, কিন্তু এখন একপ্রকার অলিখিত বিধান হয়ে গেছে সরকারের মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা এমন কিছু করতেই থাকবে যাতে শেখ হাসিনা বিব্রত হবেন আর শেষ মুহূর্তে তাঁর কানে প্রকৃত অবস্থা যাওয়ার পর সমস্যার সমাধান করবেন।
ফলে পুরো বিষয়টিকে মন্ত্রী ও সরকারের ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত করা হলে কি ভুল হবে?কাউকে কোন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই সবার প্রত্যাশা থাকে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি যথাযথভাবে সে দায়িত্ব সম্পাদন করবেন কিন্তু সে ব্যক্তি কিংবা ব্যক্তিবর্গ স্রোতের বিপরীতে গিয়ে সব কিছু গুবলেট করার পর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে যদি প্রধানমন্ত্রীকে এগিয়ে আসতে হয় তাহলে সেটা এক ব্যক্তির শাসন হয়ে যায়, আর পুরো পরিষদকে ‘পুতুল পরিষদ’ বলা ছাড়া আর উপায় থাকে না।
এজন্যে প্রধানমন্ত্রীকে একবাক্যে অনেকেই দায়ি করতে চাইবেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, একক নিয়ন্ত্রণ এক্ষেত্রে তাঁর ইচ্ছাতে সম্পাদন হচ্ছে না, অন্যদের ব্যর্থতায় হচ্ছে। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, এক ব্যক্তির পক্ষে সব সময় কি সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব?দলীয় সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের শেখ হাসিনার ওপর অতি নির্ভরশীলতার শুরু মূলত ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর।
নবম সংসদ গঠনের পর শেখ হাসিনা যাদের নিয়ে মন্ত্রী পরিষদ গঠন করেছিলেন তারা ছিলেন অপেক্ষাকৃত তরুণ। এটা তারুণ্যকে সামনে নিয়ে আসার আকাঙ্ক্ষা পূরণের কারণে হয়েছে- এমন দাবি করলে সত্যের অপলাপ হবে। সে সময় শেখ হাসিনা দলের অনেক প্রবীণ নেতাকে মূল্যায়ন করেননি মূলত সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে যাদের বিরুদ্ধে ‘মাইনাস টু’ ফর্মূলার বাস্তবায়নের অভিযোগ ছিল।
সে সময়ে মন্ত্রীসভায় স্থান পাননি আব্দুল জলিল, আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, আমির হোসেন আমু, সুরঞ্জিত সেন গুপ্তের মত নেতারাও। পরে অবশ্য সে অবস্থান থেকে তিনি সরে আসলেও এর আগেই সবকিছু গুবলেট পাকিয়ে বসেছিলেন নতুনভাবে গঠিত সে পরিষদ। দেখা যায়, মন্ত্রী হয়েও যে কোন সিদ্ধান্তের জন্যে তারা শেখ হাসিনার মুখাপেক্ষি হতেন। এর আগে কেউ কেউ নিজস্ব সিদ্ধান্তে সমস্যা পাকিয়ে বসতেন, আর শেখ হাসিনা শেষ আশ্রয় হিসেবে সিদ্ধান্ত পাল্টে সমাধান করতেন।
নবম সংসদ থেকে সবকিছুতে শেখ হাসিনার ওপর নির্ভরশীলতার যে যাত্রা শুরু হয়েছে তার রেশ এখনও বহমান। বর্তমানে এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে অন্যায় ভাবে কাউকে পুলিশ গ্রেফতার করলে তারও প্রতিবিধান শেখ হাসিনাকেই করতে হয়। সবপর্যায়ে ব্যর্থ হয়ে, সুবিচার না পেয়ে নারায়ণগঞ্জের এক যুবককে তাই বাধ্য হয়ে গণভবনে সামনে দাঁড়াতে হয় তার জমি ভূমিখেকোরা দখল করে নিচ্ছে বলে।
পরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের হস্তক্ষেপের কারণে সে ছেলে জমি ফিরে পায়। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন আত্মীয়-স্বজন কর্তৃক নিবর্তনমূলক এক আইনের পাল্লায় পড়ে অন্যায়ভাবে মামলায় পড়ার পর নির্যাতিতের অধিকার রক্ষায় শেখ হাসিনাকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। আপাত দৃষ্টিতে সেটা জনগণের পক্ষে গেছে কিন্তু সুদূরপ্রসারি চিন্তা করলে দেখা যায়, এর মাধ্যমে বিচার বিভাগের ওপর নির্বাহী বিভাগের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।
জনদাবির প্রতি দৃষ্টিপাত করলে দেখা যাবে এতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা কিন্তু এ অন্যায় করেছে যারা তাদের প্রতি কি কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? সম্প্রতি পথশিশুদের নিয়ে কাজ করা কয়েকজনকে আটক করেছে পুলিশ। তারা সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে কাজ করছে এমন খবর বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। ফেসবুকে এটা নিয়ে ব্যাপক আলোড়ন। প্রধানমন্ত্রীর বরাবরে ফেসবুকে লিখিত এক চিঠির পর কমেন্টে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এসে মন্তব্য করে তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছেন।
ধারণা করা যায়, এরপর সে লোকগুলো মুক্তি পাবে।এটা খুব ছোট্ট একটা বিষয় ছিল, এবং এটা পুলিশ প্রশাসনই সমাধান করতে পারত অথচ এ পুলিশই তাদেরকে শিশু পাচারকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। পুলিশের দাবিকৃত সে ‘শিশু পাচারকারী’ কি তবে প্রধানমন্ত্রীর বদান্যতায় মুক্তি পাচ্ছে? যদি পুলিশ তাদেরকে ‘শিশু পাচারকারী’ বলে তাহলে তারা কিসের ভিত্তিতে এ দাবি করে আসছিল এতদিন?ফেসবুকের কল্যাণে সবাই জানে পথশিশুদের নিয়ে কাজ করত আটককৃতরা, পুলিশও জানে। কিন্তু তারা তাদের পূর্ব সিদ্ধান্তে অনঢ় ছিল বলে অন্যায় গ্রেফতারকে জাস্টিফাই করে গেছে এতদিন।
এখন যদি প্রধানমন্ত্রীকে পুলিশের স্থানীয় তদন্তে কাজেও হস্তক্ষেপ করতে হয় তাহলে কেমনে চলে দেশ? কোথায় থাকে পুলিশের বিভিন্ন স্তর, কোথায় পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), কোথায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী? তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন সর্বনিম্নস্তর নিয়ে সরকারের প্রধানকে ভাবতে হয় তাহলে তাদের যোগ্যতা, ক্ষমতা আর ইচ্ছা নিয়ে কেউ প্রশ্ন করলে সেটা কি অন্যায় কিছু হয়?সব কিছুতে প্রধানমন্ত্রীকে হস্তক্ষেপ করতে হবে- গত সাত বছরে এটাই অলিখিত বিধান হয়ে গেছে। দেশবাসীর কাছেও এ বার্তা পৌঁছে গেছে যে শেষ আশ্রয় হিসেবে প্রধানমন্ত্রী আছেন।
এ চিন্তা ও সিদ্ধান্ত পুরো মন্ত্রী পরিষদকে’অসম্মান’ করার শামিল এটা আমরা কতখানি ভেবেছি। অথবা দায়িত্বপ্রাপ্ত সে মন্ত্রীগণ ভেবেছেন কখনও? তারাও এ বিষয়টিকে অনেকটাই উপভোগ করছেন বলা যায়। ফলে একের পর এক অন্যায় করার পরেও কোন ধরনের বিকার কারও কাছ থেকে লক্ষ্য করা যায় নি।
এ পরিস্থিতিতে অন্যায়কারী এবং অনায় সহ্যকারীরা ক্রমে আত্মবিনাশী হয়েওঠছে। পদস্থ ব্যক্তিদের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাবোধ ক্রমে কমে আসছে। প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অতি নির্ভরশীলতার কারণে খুব ছোট বিষয় থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ পর্যায়ে চাপ বাড়ছে। এতে একজন ব্যক্তির পক্ষে সব সময় সঠিক এবং ন্যায্য সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব কিনা এ প্রশ্নও জাগছে।
আমরা নিশ্চিত নই, যে কোন মন্ত্রণালয়ের ছোট ছোট সিদ্ধান্তে প্রধানমন্ত্রীর অংশ নিতে হয় বলে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরা এক্ষেত্রে অপমানিত হন কিনা, নাকি এটাই ভবিতব্য ভেবেছেন? তবে একজন নাগরিক হিসেবে এটাকে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীলদের ব্যর্থতা ভাবি।
এক্ষেত্রে সরকারের সবাই যে ব্যর্থ একবাক্যে এমন বলব না, তবে অধিকাংশেরই ঘাড়ে এ ব্যর্থতার দায়ভার চাপে। এবং এটা তাদের নিজেদেরই সৃষ্ট। সংশ্লিষ্টদের এ ব্যর্থতার মাঝে প্রধানমন্ত্রীর এ ধরনের কার্যক্রমকে অনেকেই ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রীর সাফল্য হিসেবে প্রচার করতে ভালোবাসেন। এধরনের প্রচারণা প্রান্তিক পর্যায়ের নেতাকর্মী থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয়নেতা, এমনকি সরকারের এমপি-মন্ত্রী পর্যন্ত বিস্তৃত।
সরকারের ছোট ছোট সিদ্ধান্ত গ্রহণে যখন প্রধানমন্ত্রীকে হস্তক্ষেপ করতে হয় তখন এটা দায়িত্বশীলদের ব্যর্থতার স্মারক হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার কথা ছিল। অনুমিত ছিল, এ থেকে শিক্ষাগ্রহণের এবং ক্ষেত্র বিশেষে লজ্জিত হওয়ার। কিন্তু তা না হয়ে সামগ্রিক ব্যর্থতাকে একক সাফল্য হিসেবে প্রচারের যে প্রতিযোগিতা সেটা নিশ্চিতভাবেই আশঙ্কাজনক।
সামগ্রিক ব্যর্থতা যদি হয় ব্যক্তিক সাফল্য পরিমাপের নিয়ামক তাহলে এটাকে যদি কেউ রাজনৈতিক দীনতা ভাবে তাহলে তাকে দোষ দেওয়ার কি উপায় থাকে?অতি সম্প্রতি, দশম সংসদের মনোনীত এক সংসদ সদস্যের গুলিতে এক স্কুল ছাত্র আহত হওয়ার ঘটনার পরবর্তী কালে তার গ্রেফতারের ঘটনায় আবারও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অভিনন্দিত হয়েছেন। যারা তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছে তাদের বক্তব্য এর মাধ্যমে প্রমাণ হলো শেখ হাসিনা অন্যায়কে প্রশ্রয় দেন না, আইনকে নিজস্ব গতিতে চলতে দেন। এবং অপরাধী নিজ দলের সংসদ সদস্য হলেও তাকে গ্রেফতার করে ইতিহাস রচনা করেছেন।
এ ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানানো যায় এবং অকুণ্ঠচিত্তে ধন্যবাদ জানাই। কিন্তু এ গ্রেফতারের ঘটনাকে সরকারের সাফল্য হিসেবে প্রচার করতে মরিয়া যারা তারা কি কখনও ভেবে দেখেছে গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের এ সংসদ সদস্য মনজুরুল ইসলাম লিটনকে এ পর্যায়ে নিয়ে আসার দায়ও কিন্তু শেখ হাসিনার। তিনি দলীয়ভাবে মনোনয়ন দিয়ে সংসদে বসিয়েছেন। শেখ হাসিনার এ মনোনয়নের কারণে দশম সংসদের মনোনীত (জনগণের ভোটের নির্বাচিত নয়) সদস্য লিটন সাহেব। এ মনোনয়নের কারণে মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালিয়ে তিনি এক শিশুর উপর গুলি চালাতে পিছপা হননি। এক্ষেত্রে লিটন সাহেবদের এ অবস্থায় নিয়ে আসার কিছুটা হলেও দায় শেখ হাসিনার ওপর কি পড়ে না?
তিনি কি অস্বীকার করতে পারবেন তাকে ঢাকা পর্যন্ত নিয়ে এসে সংসদে বসানোর? সাংসদ লিটন যে শিশুকে গুলি করেছেন সে ভোটার নয়, কিন্তু তার বাবা-মা তো ভোটার। আর শিশুর সঙ্গে অন্য কেউও গুলিবিদ্ধ হতে পারত, কারণ তিনি মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি থেকে নির্বিচারে গুলি ছুঁড়ছিলেন।
আমি নিশ্চিত নই, জনগণের ভোটে নির্বাচিত হলে তিনি কি এভাবে প্রকাশ্যে, নির্বিচারে গুলি ছুঁড়তে পারতেন? আমরা জানি না, এ সংসদে এমন ক’জন সদস্য আছেন। তবে জানি, দলীয়ভাবে মনোনয়ন দেওয়ার সময়ে সংশ্লিষ্ট দলগুলো প্রত্যেক নেতার পূর্বাপর ইতিহাস বিশ্লেষণ করে।
আওয়ামী লীগও করেছে হয়ত। তাই তারা ভালো জানবে কারা কেমন চরিত্রের?সাংসদ লিটন এখন কারান্তরীন অবস্থায় এবং আইন নিজস্ব গতিতে চললে হয়ত এর বিচার হবে। এ অবস্থায় কেবল এ বিচারের দিকে না তাকিয়ে সরকার প্রধান ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রীকে বাকিদের ব্যাপারেও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। অনেকেই হয়ত বলবেন সাংসদ লিটনের এ গ্রেফতারের মাধ্যমে প্রমাণ হয়েছে এমন ঘটনার বিরুদ্ধে সরকার সব সময় অনঢ়।
এটা আংশিক সত্য হয়ত, কিন্তু সর্বাংশে সত্য নয়। কারণ এ ঘটনাকে সরকারের সাফল্য হিসেবে প্রচার করতে মরিয়া খোদসরকারই। এটা যদি সাফল্য হয় তাহলে নিজ দলের নেতা ও সংসদ সদস্য কর্তৃক এমন অস্ত্রবাজি নিঃসন্দেহে ভয়াবহ এবং আশঙ্কার। এক্ষেত্রে কি দায় এড়ানো যায়?যাকে সাফল্য ভাবা হচ্ছে তার পিছনে যদি হয় ব্যর্থতার এক বিশাল কাহিনী- এর দায়ভার অস্বীকার করা যায় না?
এভাবে সফল হতে কেউ নিশ্চয়ই কেউ চাইবে না। ধারণা করি, শেখ হাসিনা নিজেও এমন সাফল্য চান না যা আগে তার অবস্থানকে দুর্বল করে দেয়।
সরকার সফল হোক এটা সবাই চায়, কিন্তু সাফল্যের এ সিঁড়ি এমন যেনো না হয়
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)






