জাতীয় পার্টি বস্তুত ‘সরকারি বিরোধী দল’। সাংবিধানিকভাবে তারা বিরোধী দল হলেও তাদের তিনজন (আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, মশিউর রহমান রাঙ্গা, মুজিবুল হক চুন্নু) সদস্য রয়েছেন মন্ত্রিসভায়। শুধু তাই নয়, দলটির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ নিজেও মন্ত্রী পদর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত। এরকম অদ্ভুত বিরোধী দল বিশ্বের যেকোনও সংসদীয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেই বিরল।
তবে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় খোদ সরকারি দলের এমপিরা যেভাবে অর্থমন্ত্রীর সমালোচনা করেছেন, এমনকি আওয়ামী লীগে’র প্রভাবশালী এমপি শেখ ফজলুল করিম যেভাবে অর্থমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, ‘আপনে কম কথা বলেন’ এবং আরেক প্রভাবশালী নেতা মাহবুব উল আলম হানিফ প্রশ্ন তুলেছেন, অর্থমন্ত্রী কার পরামর্শে এরকম একটি গণবিরোধী বাজেট পেশ করলেন— তাতে মনে হচ্ছে জাতীয় পার্টি নয়, বরং সরকারই এখন বিরোধী দল।
এ অবস্থায় ২১ জুন ময়মনসিংহ-৮ আসনের এমপি ফখরুল ইমাম (জাতীয় পার্টি) প্রস্তাবিত বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেন, ‘সরকারি দলের এমপিরাই তো সব কথা বলে ফেলেছেন। প্রশ্ন হলো, ‘তারা বিরোধী দলের ভূমিকায় নেমেছেন কি না। তাহলে কি যারা নৌকায় ছিলেন তারা আর নৌকায় আটকে থাকতে চাচ্ছেন না?’ অর্থমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে ফখরুল ইমাম বলেন, ‘আপনাকে আপনার সহকর্মীরা পরিত্যাগ করেছেন বোধ হয়।’
এর আগে ২০ জুন আওয়ামী লীগে’র একজন এমপি বলেছেন, ‘আমরাই যদি অর্থমন্ত্রীকে এভাবে কোণঠাসা করতে থাকি, তাতে সংসদই কোণঠাসা হয়ে যাবে। আমরাই যদি বাজেট নিয়ে এত সমালোচনা করতে থাকি, তাহলে বিরোধী দল কী করবে?’
বাস্তবতা হলো, অর্থমন্ত্রী এককভাবে বাজেট প্রণয়ন করেন না। বাজেটের সব দায়ভার তার একার নয়। কিন্তু সমালোচনার তীর সবই তার দিকে। কেননা, বাজেট পেশ তিনিই করেন। অথচ এই বাজেট সংসদে পেশের আগে মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়েছে। এবার অর্থমন্ত্রী যেভাবে খোদ সরকারি দলের এমপিদেরও তোপের মুখে পড়েছেন তা এর আগে কখনও দেখা যায়নি। এবার কয়েকটি কারণে বাজেট সমালোচিত হয়েছে। যেমন ব্যাংক আমানতের উপর বাড়তি আবগারি শুল্ক, বাড়তি ভ্যাট, সঞ্চয়পত্রের সুদহার এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোয় লুটপাট নিয়ে সংসদ সদস্যরা অর্থমন্ত্রীর সমালোচনা করেন। প্রস্তাবিত বাজেটকে ২০১৭ সালে জনগণের জন্য শ্রেষ্ঠ তামাশা বলেও তারা মন্তব্য করেন।
১৯ জুন সরকারি দলের সংসদ সদস্য শেখ সেলিম অর্থমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘এই সংসদের ৩৫০ জন জনপ্রতিনিধি ঠিক করবেন জনগণের কল্যাণে কোনটা থাকবে, কোনটা থাকবে না। আপনার একগুঁয়েমি ছাড়তে হবে। আপনে কথা কম বলেন।’
মাহবুব উল আলম হানিফ বলেন, ‘হল-মার্কের চার হাজার কোটি টাকা দুর্নীতির পর অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন এ টাকা কিছু নয়। তাহলে আবগারি শুল্কের সামান্য টাকার জন্য সারা দেশের মানুষের মধ্যে আক্ষেপ তৈরি করলেন কেন?’
শুধু এমপিরাই নন, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীও আবগারি শুল্কের বিরোধিতা করে বলেন,‘কম আয়ের মানুষের ওপর আবগারি শুল্ক আরোপ মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা।’
সরকারি দলের পাশাপাশি বিরোধী শিবির থেকেই কড়া সমালোচনার মুখে পড়েন অর্থমন্ত্রী। ১৪ দলের শরিক জাসদের একাংশের কার্যকরী সভাপতি মইন উদ্দীন খান বাদল রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার প্রসঙ্গ তুলে প্রশ্ন রাখেন, উন্নয়নের নামে মেগা প্রকল্প নেয়া হয়েছে। তার সুফল জনগণ পাচ্ছে কি না?
বিরোধী দল প্রসঙ্গে আসা যাক। ২০ জুন অর্থমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেন বিরোধী দল জাতীয় পার্টির এমপি জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু ও কাজী ফিরোজ রশিদ। ব্যাংকিং খাতের মূলধন ঘাটতি পূরণে সরকারি অর্থব্যয়ের জন্য অর্থমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করে তাকে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর দাবি জানিয়ে তারা বলেন, অর্থমন্ত্রীর বয়স হয়ে গেছে, তিনি অশীতিপর। অনেক বাজেট দিয়েছেন, আর কত? এখন যেন সসম্মানে পদত্যাগ করে সম্মানের সঙ্গে বিদায় নেন। নিঃশর্ত বিদায় নিয়ে দেশের ১৬ কোটি মানুষকে মুক্তি দেন।
তবে এরপরদিন ২১ জুন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ অর্থমন্ত্রীর পাশে দাঁড়ান। তাকে একজন শিক্ষিত, সজ্জন ও সৎ মানুষ আখ্যা দিয়ে তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘জিয়াউদ্দিন বাবলু ও ফিরোজ রশিদ যে ভাষায় অর্থমন্ত্রীর সমালোচনা করেছেন, তাদের কাছ থেকে এটা আশা করিনি। অর্থমন্ত্রীর বয়স নিয়ে আপনারা কথা বলেছেন। অথচ আপনার দলের নেতা এরশাদের বয়স চিন্তা করেন না। তার বয়স তো অর্থমন্ত্রীর চেয়েও ৫ বছর বেশি।’
২.
বাজেট পাস হবার আগ পর্যন্ত এটি একটি প্রস্তাব; মানে এর উপর আলোচনা হবে, অর্থমন্ত্রীর সমালোচনা হবে এটিই স্বাভাবিক। আর এই বিরোধিতাই সংসদীয় গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কিন্তু এবার অর্থমন্ত্রী বস্তুত ব্যক্তিগত আক্রমণের শিকার হয়েছেন। এটি কাঙ্ক্ষিত নয়।
যেকোনও বিষয় নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলীয় এমপিরা খোলামেলা কথা বলবেন এবং সংসদ অধিবেশনে তারা রাষ্ট্রের যেকোনো বিষয়ে এবং যেকারো বিরুদ্ধে যেকোনও বক্তব্য দিতে পারেন। এই ক্ষমতা সংবিধানই তাদের দিয়েছে। এমনকি অধিবেশনে বিচার বিভাগ বা কোনও বিচারককে নিয়ে আলোচনা হলেও তার বিরুদ্ধে মামলা বা আদালতে যাওয়ার সুযোগ নেই। জনপ্রতিনিধিরা এই যে বিশেষ সুবিধাটি ভোগ করেন, অনেক সময়ই তারা সেটির সদ্ব্যবহার করেন না। বরং আলোচনাটি চলে যায় ব্যক্তি আক্রমণে। দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি এখন সংসদে না থাকলেও দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার শাড়ি ও মেকাপ নিয়েও সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা বিভিন্ন সময়ে কটাক্ষ করেছেন।কথা বলার স্বাধীনতার সুযোগ এরকম অসংসদীয় চর্চাও আমাদের সংসদে হয়। রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ স্পিকার থাকা অবস্থায় এরকম অসংসদীয় ভাষা ব্যবহারের উপরে একাধিকবার রুলিং দিয়েছিলেন।
কিন্তু তারপরও সংসদীয় বাহাস জরুরি। অর্থমন্ত্রী একটা বাজেট পেশ করলেন আর সরকারি দলের সদস্যরা টেবিল চাপড়ে বাহবা দিলেন, বাজেটের দোষত্রুটি নিয়ে আলোচনা করলেন না, এমনটি হলে জনগণই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেদিক দিয়ে এবার সরকারি দলের এমপিরা যা করেছেন, সেটি সাধুবাদযোগ্য। কেননা, বাজেটের যেসব বিষয় নিয়ে নানা মহলে সমালোচনা হচ্ছে, এমপিরা যদি মানুষের সেই সেন্টিমেন্ট সংসদে তুলে ধরতে না পারেন, তাহলে তাদের এমপি থাকার কোনো প্রয়োজন হয় না।
এবারের ঘটনাটি একটু ব্যতিক্রম এ কারণে যে, এর আগে কোনো অর্থমন্ত্রী খোদ তার নিজের দলের ভেতর থেকে এত বেশি আক্রমণের শিকার হননি। এর একটা কারণ এই হতে পারে যে, বর্তমান সংসদের বিরোধী দল যেহেতু সরকারেরই অংশ এবং তারা একধরনের গৃহপালিত বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করছে, তাই সরকারি দলের কোনও কোনও এমপিই বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করেছেন। এটা এক অর্থে খারাপ না, বরং বাজেটের যেসব বিষয় আসলেই জনগণকে উদ্বিগ্ন করছে, সেই বিষয়গুলো নিয়ে ট্রেজারি বেঞ্চের সমালোচনা মানেই হলো প্রধানমন্ত্রী বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে নেবেন এবং তিনি এসব বিতর্কিত বিষয়ে অর্থমন্ত্রীকে নমনীয় হওয়ার পরামর্শ দেবেন।
ফলে এই আলোচনা-সমালোচনা বা তর্ক-বিতর্ক আখেরে জনগণের জন্যই কল্যাণকর এবং যে সংসদে যত বেশি বিতর্ক হয়, সেটি তত বেশি কার্যকর ও প্রাণবন্ত। ‘ম্যান্দামারা’ বিরোধী দল এবং তর্কবিহীন সংসদ গণতন্ত্রের জন্যও ক্ষতিকর।
বাস্তবতা হলো, সরকারের সাড়ে তিন বছরেও জাতীয় পার্টি বিরোধী দল হিসেবে জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারেনি। এর মধ্যে সম্প্রতি কিছু ইসলাম নামধারী দল নিয়ে তার নতুন জোট গঠন এবং মহাজোট থেকে বেরিয়ে যাওয়া ঘোষণাও রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু পক্ষান্তরে মানুষ এই দলটির, বিশেষ করে এই দলের চেয়ারম্যানের কর্মকাণ্ড নিয়ে আড়ালে হাসাহাসিই বেশি করে। সেই বাস্তবতায় প্রস্তাবিত বাজেট ইস্যুতে জাতীয় পার্টির এমপিরা সংসদের অধিবেশন গরম করার যে চেষ্টাটি করেছেন, সেটি তাদের প্রতি জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণে কিছুটা হলেও ভূমিকা হয়তো রেখেছে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)







