তাহলে কি বুশরা নামে কেউ ছিলই না! রুশদানিয়া বুশরা হত্যা মামলায় সর্বোচ্চ আদালত থেকে সব আসামী খালাস পেয়ে যাওয়ার পর তার মা লায়লা ইসলামকে যে এরকম আহাজারি করতে হচ্ছে সেজন্য মামলা প্রমাণে রাষ্ট্রপক্ষের ব্যর্থতা, আইনের সীমাবদ্ধতা এবং বিচারে দীর্ঘসূত্রতাকে দায়ী করেছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
২০০০ সালের ১ জুলাই নিহত হয় ঢাকা সিটি কলেজের শিক্ষার্থী বুশরা। হত্যা মামলায় নিম্ন আদালতে মৃত্যুদণ্ড পেয়েছিলো এম এ কাদের আর যাবজ্জীবন কারাভোগের সাজা পেয়েছিলো তার স্ত্রী রুনা আক্তার। আপিল বিভাগ থেকে মুক্তি পেয়েছেন তারা। মামলার অন্য দুই আসামিকে খালাস দিয়ে হাইকোর্টের রায়ও বহাল রেখেছেন সর্বোচ্চ আদালত। ফলে নিম্ন আদালতে সাজাপ্রাপ্ত চারজনই খালাস পেয়ে গেছে।
এমন ঘটনাকে ‘রাষ্ট্রপক্ষের ব্যর্থতা’ হিসেবে উল্লেখ করেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী খুরশীদ আলম খান। চ্যানেল আই অনলাইনকে তিনি বলেন, পুরোটাই রাষ্ট্রপক্ষের ব্যর্থতা। ফৌজদারী বিচারব্যবস্থার নীতি অনুযায়ী মামলাটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে হবে। যেটা রাষ্ট্রপক্ষ প্রমাণ করতে পারেনি।
এই ঘটনাকে আমি নিশ্চিতভাবে রাষ্ট্রপক্ষের ব্যর্থতা হিসেবেই উল্লেখ করতে চাই: আইনজীবী খুরশীদ আলম খান

‘কিছু কিছু বিষয়ে দীর্ঘ সময় নেওয়ার কারণে আদালত নিশ্চিতভাবে প্রমাণ হতে পারেনি। আর সেটার ফল ভোগ করেছে আসামী। এই ঘটনাকে আমি নিশ্চিতভাবে রাষ্ট্রপক্ষের ব্যর্থতা হিসেবেই উল্লেখ করতে চাই,’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রাষ্ট্রপক্ষের এমন ব্যর্থতা এবং চাক্ষুস প্রমাণের অভাবে কোনো হত্যাকাণ্ড প্রমাণ না হওয়ার ঘটনাকে আইনের সীমাবদ্ধতা হিসেবেও উল্লেখ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন।
চ্যানেল আই অনলাইনকে তিনি বলেন, আইন প্রমাণ ছাড়া কখনোই কিছু করতে পারবেন না সেটা জানা কথা। আমাদের দেশে ধর্ষণ সংক্রান্ত আইনের সীমাবদ্ধতা আছে অনেক। একইভাবে আমাদের আইনি প্রক্রিয়াটা মোটেও হিউম্যান ফ্রেন্ডলি নয়। ফলে অনেক মেয়েই এই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে চায় না।
তিনি বলেন: আগে একটা পদ্ধতি ছিলো যে, কোনো মেয়ে ধর্ষণের শিকার হলে সে ডাক্তারের কাছে যাবে। ডাক্তার তাকে পরীক্ষা নীরিক্ষা করবেন তারপর রিপোর্ট দেবেন। কিন্তু তাকে পরীক্ষা করা হতো পুরুষ ডাক্তার দিয়ে। পরে সেই অবস্থার পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন নারী ডাক্তার ধর্ষণের শিকার নারীদের পরীক্ষা করেন।
‘আবার যখন বিচার প্রক্রিয়া চলমান থাকে তখন ধর্ষণের শিকার নারীটিকে অনেক অশ্লীলভাবে প্রশ্ন করা হয়। কেননা বিরোধী পক্ষের তাকে নষ্ট মেয়ে প্রমাণ করার একটা প্রচেষ্টা থাকে। সে নষ্ট মেয়ে হলে ধর্ষণের অভিযোগ পুরোই নষ্ট হয়ে যাবে। ফলে অনেক মেয়েই এই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে চায় না। আমাদের আইন নারীবন্ধব না হওয়ায় এই ধরনের ঘটনাগুলো আরো বেশি ঘটছে বা ন্যায়বিচার নিশ্চিত হচ্ছে না।’
ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হওয়ার আরেকটি কারণ হলো ঘটনা প্রমাণ করতে না পারা: হাফিজুর রহমান কার্জন
সাধারণত বেশিরভাগ ঘটনার ক্ষেত্রেই এমনটি ঘটে থাকে। আর ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হওয়ার আরেকটি কারণ হলো ঘটনা প্রমাণ করতে না পারা।

হাফিজুর রহমান কার্জন বলেন, ধর্ষণ কিংবা হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব পালন করে পাবলিক প্রসিকিউটর এবং পুলিশ। তাদেরই বড় দায়িত্ব ঘটনাটি প্রমাণ করা।
কিন্তু এই দুই পক্ষের গাফিলতির কারণে অনেক সময় ন্যায় বিচার বাধাগ্রস্ত হয়।
বুশরা হত্যা মামলা নিয়ে সর্বোচ্চ আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল খোন্দকার দিলীরুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আপিল বিভাগ শুধু ঘোষণা দিয়েছেন। পুরো রায়টা এখনো দেননি। রায় পেলে হয়তো বুঝতে পারতেন আদালত কি মতামত দিচ্ছেন।
আসামীরাই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিলো। শুধুমাত্র প্রমাণ দিয়ে আদালতকে সন্তুষ্ট করতে না পারায় আসামীরা খালাস পেয়ে গেলো: ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল
তবে ঘটনার আগে ও পরের কিছু অবস্থা থেকে তিনি এটা মনে করেন, আসামীরাই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিলো। শুধুমাত্র প্রমাণ দিয়ে আদালতকে সন্তুষ্ট করতে না পারায় আসামীরা খালাস পেয়ে গেলো।
আদালতের পুরো রায় দেখার পরে রিভিউ পিটিশনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।










