আমরা সবাই জানি বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন অভিঘাতে সর্বাধিক ন্যুব্জ দেশ গুলোর মধ্যে একটি। এই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দেশের নির্দিষ্ট ভৌগলিক অঞ্চলের মধ্যে অথবা কোন জনগোষ্ঠীর জীবনের উপর সীমাবদ্ধ নেই। জলবায়ু পরিবর্তন এখন এমন একটি বাস্তবতা যা দেশের সমগ্র অঞ্চল এবং সব জনপদ ব্যাপী পরিব্যাপ্ত। যে দেশের ৮৮ ভাগ অঞ্চল বন্যা ঝুঁকিমুখী, যে ভূখণ্ড সমুদ্রস্তরে হতে গড়ে মাত্র পাঁচ মিটার উচ্চ সেই দেশ সঙ্গত কারণেই জলবায়ু পরিবর্তনের নানা রকম ঝুঁকি সামলিয়ে টিকে আছে। বিশেষজ্ঞরা জলবায়ু পরিবর্তনের নানা রকম নজির হাজির করেন। সমুদ্রপৃষ্ঠ অথবা ভূভাগের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত অথবা বৃষ্টিপাতের পরিমাণ হ্রাস, ঘূর্ণিঝড় অথবা কালবৈশাখীর তীব্রতা অথবা ঘনঘটা বৃদ্ধি, অকাল অথবা প্রলম্বিত বন্যা, দক্ষিণাঞ্চলে নদ নদীর অথবা ভূমির উপরিভাগের লবণাক্তটা বেড়ে যাওয়া, উত্তরাঞ্চলের খরা অথবা জলধার গুলো শুকিয়ে যাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তন জনিত ইত্যাকার নানাবিধ ঘাত সমূহ যাই ঘটুক না কেন মানুষের প্রচলিত জীবন আর জীবিকার উপর তা চরম অভিঘাত হয়ে হানা দেয়।
জলবায়ু পরিবর্তনের এই অভিঘাত সমূহের হানাতে সবচাইতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রান্তিক এবং অধিকার বঞ্চিত মানুষেরা। আর এই প্রান্তিক ও অধিকার বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে দেশের সমতল অঞ্চলের এক দশমিক পাঁচ মিলিয়ন আদিবাসী সর্বাধিক নিগৃহীত জনগোষ্ঠী যারা জলবায়ু পরিবর্তন জনিত নানা অভিঘাতের চরম-তম শিকার। দেশের উত্তর, দক্ষিণ, উত্তরপূর্বাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলের আদিবাসী জনপদের জীবন আর জীবিকার উপর জলবায়ু পরিবর্তন জনিত অভিঘাত গুলো হানা দেয় বহুমাত্রিক পথে। সমতলের আদিবাসীদের সনাতনী জীবন আর জীবিকার উপর জলবায়ু পরিবর্তন জনিত অভিঘাতের বিষয়টি নিয়ে তেমন গুরুত্বের সাথে ভাবা হয়নি গভীর ভাবে। সমতলের আদিবাসী জনগোষ্ঠী সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ভাবে সর্বাধিক ও বহুমাত্রিক বঞ্চনায় বঞ্চিত হবার কারণে অতি সহজে ভঙ্গুর অবস্থানে পতিত হয় জলবায়ু পরিবর্তনের নানামুখী অভিঘাতে।
সমতলের আদিবাসীদের সর্বাধিক বসবাস দেশের উত্তর আর উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে। ২০১১ সালের সরকারি খানা জরিপকেও যদি আমলে নেয়া হয় তাতেও দেখা যায় উত্তর আর উত্তর পশ্চাঞ্চলের মোট ষোলটি জেলাতে প্রায় চার লক্ষ আদিবাসী পরিবারের বসবাস। বাংলাদেশের এই উত্তর আর উত্তর পশ্চিমাঞ্চ জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম অভিঘাত খরা ও শুষ্কতা পীড়িত। বার্ষিক বৃষ্টিপাতের গড় নিলে দেখা যায় এই উত্তর ও উত্তরপশ্চিমাঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় সর্বাপেক্ষা কম। মৌসুমি খরা এবং শুষ্কতায় ইতোমধ্যে আক্রান্ত এই উত্তর আর উত্তর পশ্চিমাঞ্চল। এই মৌসুমি খরা এবং শুষ্কতা আক্রান্ত করে সনাতনী জল নির্ভর কৃষি এবং ফসল উৎপাদন পদ্ধতিকে। যাদের জীবন আর জীবিকা কেবলমাত্র এই কৃষির উপর ভরকরে টিকে আছে সেই সমতলের আদিবাসী যারা পরম্পরা ধরে এই সনাতনী কৃষিকাজ করে বেচে আছেন, তারা অসহায় হয়ে পড়ছেন, হিমশিম খাচ্ছেন জীবিকা টিকিয়ে রাখতে। এই অঞ্চলে বসবাসরত সাঁওতাল, ওঁরাও, মুন্ডা, মাহাত, বুনো, মাহালি, পাহান, রাজবংশি যারা মৌসুমি খরা আরে শুষ্কতার সাথে সংগ্রাম করে জল নির্ভর সনাতনী কৃষি নির্ভর জীবিকা নিয়ে এখন টিকে আছে আগামি বিশ থেকে ত্রিশ বছরের মধ্যে চরম খরার মোকাবেলা করতে হবে তাদের। বরেন্দ্র বুহুমুখি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বলছে যে উত্তর আর উত্তরপশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বার্ষিক গর চরম ও শুষ্ক সময়ে বেড়ে সত্তর দিনে উপনীত হয়েছে। এই খরা আর শুষ্কতা আরো বেরে যাবে এবং দুই হাজার একশত সাল নাগাদ পঁচাশি থেকে নব্বই দিনে উন্নীত হবে।
জল নির্ভর কৃষি আর বনভূমির উপর নির্ভরশীল এই অঞ্চলের আদিবাসী জীবন আর জীবিকা চরম হুমকির মুখে পতিত হবে। ধনী কৃষকেরা ধান, গম, আখ, কালাই, আর মৌসুমী শষ্য উৎপাদন ছেড়ে দিয়ে স্বল্প জল নির্ভর একমুখী আবাদের দিকে ঝুঁকে পরছে। উত্তর আর উত্তরাঞ্চলের ফসলী জমি ক্রমাগত রূপান্তর ঘটছে আম, লিচু, পেয়ারা, পেঁপে, কলা ইত্যাকার স্বল্প জল এবং শ্রম ভিত্তিক বাগান চাষে। ধান, গম, শষ্যের ক্ষেতে দিন মজুরী বিক্রি করা ভূমিহীন আদিবাসীরা নিজ এলাকায় বছরে আশি থেকে নব্বই দিনের বেশি শ্রম বিক্রির সুযোগ হারিয়ে অন্য এলাকায় দিন মজুরী বিক্রির জন্য মৌসুমি স্থানান্তর হতে বাধ্য হচ্ছে। বাগান কৃষিতে আদিবাসী জনগনের দক্ষতা না থাকায় তারা বাগান কৃষিতে শ্রম বিক্রি করতে ব্যার্থ হচ্ছে। বহু আদিবাসী আগাম শ্রম বিক্রি করে সংসারের প্রয়োজন মেটাচ্ছে।
ধীরে ধীরে কমতে থাকা বৃষ্টিপাত, ভূভাগের উপরি অংশের জলধারা গুলোর ক্রমশ কমতে থাকা জলের পরিমাণ,শুকিয়ে যাওয়া নদ, নদী, বিল, খাড়ি, নিবিড় সেচ ভিত্তিক কৃষিকে বাঁচিয়ে রাখবার জন্য ভূভাগের অভ্যন্তর থেকে অতিরিক্ত জল উত্তোলন, উজাড় হতে থাকা বনভূমি হুমকি হিসেবে দেখা দিতে শুরু করেছে এই অঞ্চলের আদিবাসী মানুষের জীবনের উপর। প্রকৃতি আর প্রাকৃতিক স¤পদের উপর নির্ভরশীল আদিবাসী জনগোষ্ঠী শুকিয়ে যাওয়া নদী, পুকুর থেকে পানের জন্য আর জল পাচ্ছে না। পাতকুয়া, ইঁদারার জল নষ্ট হয়ে গেছে, ভূগর্ভের জলের স্তর নিচে নেমে যাওয়াতে কুয়া গুলোতে আর পানি আসে না। পানিয় জলের জন্য বসানো নলকূপ গুলোতে সামান্য জল ওঠে। গ্রীষ্মে পানের জল সংরক্ষণ করতে হয় কিছু বেচে থাকা পুকুর থেকে আর শীতকালে গভীর নলকূপের জলই একমাত্র ভরসা। সেই জল সংগ্রহ করতে আদিবাসী নারী আর কিশোরিদের ক্রোশ পাড়ি দিতে হয়। প্রায় শুকিয়ে যাওয়া খাড়ি, ডোবা, খন্দ থেকে আর কুঁচিয়া খুঁজে পায় না আদিবাসী মানুষ। পানির অভাবে শুকিয়ে যাওয়া পুকুর, নালা, জলা থেকে আর শামুক সংগ্রহ করতে পারে না। কাছিম ধরতে পারে না জল শূন্য বিল, বাওর থেকে। হালের বদলে ট্রাকটার এবং অন্যান্য যন্ত্র চাষাবাদ দখল করায় মাটির নিচে বাসকরা শামুক আর ঝিনুক গুলো গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে ভেঙে যাচ্ছে, মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার এবং কীট নাশক ব্যাবহারের কারণে বংশবৃদ্ধির অভাবে মারাত্মকভাবে কমে যাচ্ছে শামুক ঝিনুক। জমির আল সংকীর্ণ হচ্ছে দিনদিন, ইঁদুরেরা বাসা বাধতে পারছে না আল গুলোতে। এই কুঁচিয়া, শামুক, ঝিনুক, ইঁদুর এই অঞ্চলের আদিবাসীদের পুষ্টির উৎস নিঃশেষ হতে বসেছে। শাল বন গুলো চলে যাচ্ছে ভূমিদোস্যুর দখলে, কাটা পড়ছে গাছ গুলো, গড়ে উঠছে ইটভাটা, শালের পাতা খেয়ে বেচে থাকে উইপোকা পোকা বাচার তাগিদে শাল বন ছেড়ে আবাস বানাচ্ছে আদিবাসীদের মাটির বাড়িতে, আর উই এর ঢিবি নষ্ট করছে মাটির বাড়ি ঘরদোর।
ইদানীং বন্যা দেখা দিচ্ছে উত্তর আর উত্তরপশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে, যা একপ্রকার অকল্পনীয় ছিল। এইতো গেল বছর অপ্রত্যাশিত বন্যায় কাঁদা হয়ে গলে পড়লো নকশাকরা মাটির ঘর গুলো। দেশের পঁচিশ ভাগ ভূমি বন্যা আক্রান্ত হচ্ছে ফি বছর। বিশেষ করে উত্তর, উত্তর দক্ষিনাঞ্চল, উত্তর পূর্বাঞ্চল, মধ্যাঞ্চল আর দক্ষিণাঞ্চলের নিম্নভূমি বন্যার ঝুঁকির মধ্যে রয়ে গেছে। এছাড়াও বড় ধরনের বন্যায় দেশের প্রায় ষাট ভাগ অঞ্চল তলিয়ে যাচ্ছে। প্রতি চার থেকে পাঁচ বছর অন্তর অন্তর মন বড় বন্যা নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। অসময়ে আর অতিরিক্ত এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এই বড় বন্যার ঘনঘটা বাড়িয়ে দেবে এবং জলাবদ্ধতাকে দীর্ঘতর করে তুলবে। এর পাশাপাশি উত্তরপূর্বাঞ্চলের হটাৎ বন্যা এবং দক্ষিণাঞ্চলের বৃদ্ধি পেতে থাকা সামুদ্রিক জোয়ার ও তার দীর্ঘস্থায়িতা এই অঞ্চলে বসবাসরত আদিবাসী জনগোষ্ঠী হাজং, মান্দারি, খাসি, মনিপুরী, গারো, মুন্ডাদের জীবন ও জীবিকার উপর প্রবল প্রতিঘাত হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।
বহুসংখ্যক গবেষণা পত্র বলছে যে বন্যার কারণে সৃষ্ট দীর্ঘ জলাবদ্ধতা এই অঞ্চলের উদ্ভিদ, জলজ এবং অজলজ প্রাকৃতিক প্রপঞ্চ, ফসল আর মৎস সম্পদের উপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে চলেছে। দুইহাজার এগারো সালের সরকারি খানা জরিপ বলছে যে উত্তরপূর্বাঞ্চল এবং দেশের উত্তর-মধ্যভাগের এগারটি জেলাতে সর্বমোট দুই লক্ষ সত্তর হাজার দক্ষিণাঞ্চলের উনিশ জেলাতে মোট আশি হাজার পাচশত আদিবাসী মানুষের বসবাস যারা জীবিকার জন্য কৃষি, মৎস শিকার, জোয়ার ভাটা বনাঞ্চল ভিত্তিক শিকার ও সংগ্রহ, নানা রকম হস্তশিল্প, পান চাষ ও অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অকৃষি ভিত্তিক ব্যবসার উপর নির্ভরশীল তারা জলবায়ু পরিবর্তনের নানামুখী অভিঘাতে জর্জরিত হয়ে পড়ছে দিনের পর দিন। দক্ষিণাঞ্চলের দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ হচ্ছে বঙ্গোপসাগরের জলস্তরের উচ্চতা বৃদ্ধি।
আমাদের দেশের পরিবেশ, বন এবং জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের জলবায়ু পরিবর্তন সেল তাদের গবেষণায় দেখিয়েছে যে সমুদ্রতীরবর্তী অঞ্চলে প্রতিবছর ছয় থেকে একুশ মিলিমিটার পর্যন্ত সমুদ্রতল ফুলে উঠছে। এর প্রভাবে গঙ্গা অববাহিকার নদ নদী সমূহ বর্ষা মৌসুমে গড়ে সাত থেকে আট মিলিমিটার ফুলে উঠে অতিরিক্ত অঞ্চল প্লাবিত করছে। মেঘনা অববাহিকায় জলস্তর ফুলে ওঠার মান বছরে ছয় থেকে দশ মিলিমিটার এবং সুন্দরবন অববাহিকায় এই জলস্তর ফুলে ওঠার মান বছরে গড়ে এগারো থেকে একুশ মিলিমিটার। আমাদের তটভূমির সমুদ্রস্তর ফুলে ওঠার এই পরিসংখ্যান বৈশ্বিক গড়ের চাইতে বেশি। সমুদ্রপৃষ্ঠের এই উচ্চতা বৃদ্ধি উপকূলীয় অঞ্চল সমূহের প্রায় সমস্ত জলভাগ এমন কি স্থলভাগ লবনাক্ত করে তুলেছে। এই লবণাক্তটা মেঘনার মধ্যবর্তী অববাহিকা অবধি জলধারা সমূহে ছাড়িয়ে পরছে। এই লবণাক্তটা মিষ্টি পানির উৎস গুলোকে নষ্ট করে ফেলায় কৃষি এবং পান যোগ্য জলের চরম সংকট তৈরি করেছে।
বিশ্ব ব্যাংকের এক সমীক্ষায় বলা হচ্ছে আগামী দুইহাজার পঞ্চাশ সাল নাগাদ এই লবণাক্তটা দক্ষিণের সমগ্র জেলায় ছড়িয়ে পড়বে এবং স্থল ও জলভাগের লবণাক্তরা মাত্রা পাঁচ পিঁপিঁটি থেকে বেড়ে দশ মাত্রায় উত্তীর্ণ হবে। এই অঞ্চলের আদিবাসী জনগোষ্ঠী যারা সুন্দরবন সংলগ্ন অঞ্চলে বাস করে তারা লবণাক্তটা ঝুঁকির পাশাপাশি প্লাবিত হবার ঝুঁকির মুখোমুখি রয়েছে। সরজমিনে দেখা গেছে, সুন্দরবন সংলগ্ন আদিবাসী বসতিগুলো সুন্দরবনের নদী সমূহের জলের স্তর হতে নিচে অবস্থান করছে। নদীতীরবর্তী বাঁধের কারণে জল আদিবাসী বসতিতে প্রবেশ করছে না। এই বাধ গুলো যদি কোনক্রমে ভেঙে পড়ে তবে এই বসতি গুলো তলিয়ে যেতে সময় নেবে না। স্থলভাগের আর জলভাগের উপরি তলের এই ব্যাপক লবণক্ততা বৃদ্ধি এবং সুন্দরবনের নদী সমূহের উচ্চতা বৃদ্ধি কৃষি, মাছ শিকার আর সুন্দরবন থেকে সম্পদ আহরণ নির্ভর আদিবাসীদের জীবন ক্রমাগত সংকটময় করে তুলছে।
উত্তর, উত্তরপশ্চিমাঞ্চল এবং দক্ষিণের নানা আদিবাসী দল গুলোর সাথে জলবায়ু পরিবর্তন আর অভিযোজন প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করতে গেলে সমতলের আদিবাসী গনাগোষ্ঠীর সাধারণ অদক্ষতা গুলো বোঝাযায়। এই সাধারণ সীমাবদ্ধতা গুলো অনেকটাই তাদের সনাতনী জীবন এবং মূল সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকবার কারণে বিরাজমান। যেমন, অভিযোজন মূলক জীবিকা পরিগ্রহণে দক্ষতার অভাব, এই সীমাবদ্ধতার পেছেনে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন এবং অভিযোজন মূলক জীবিকা সম্পর্কে জানাশোনার অভাব। জলবায়ু পরিবর্তন স¤পর্কে তথ্যের এই সীমবদ্ধতা আদিবাসী মানুষকে বিকল্প জীবিকা সম্পর্কে ভাবতে বিরত রেখেছে। জল নির্ভর সনাতনী কৃষি ব্যবস্থার বাইরে এখন পর্যন্ত কিছুই ভাবতে পারেনা সনাতনী জীবিকা আশ্রয়ী আদিবাসী জনগোষ্ঠী। তাই পরিবর্তিত কৃষি ব্যবস্থার সাথে খাপ খাওয়াতে না পেরে নিজস্ব অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে স্থানান্তর হতে হয় শ্রম বিক্রির জন্য।
জলবায়ু পরিবর্তন ঝুঁকি ঘাত সমূহ সম্পর্কে তথ্যের ঘাটতি
সমতলের আদিবাসী জনগোষ্ঠী প্রাকৃতিক ও আবহাওয়ার পরিবর্তন লক্ষ্য করে থাকে কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন এবং সংশ্লিষ্ট অভিঘাত সমূহ যা তাদের জীবন জীবিকার উপর নেতি বাচক প্রভাব ফেলে চলেছে তা চিহ্নিত করতে আপারগ। যেমন ধীরগতি সম্পন্ন জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন সমূহ যেমন খরা, শুষ্কতা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, লবণাক্তটা বৃদ্ধির প্রবণতা, জলীয়বাষ্পের পরিবর্তন, স্থলভাগের উষ্ণতা বৃদ্ধি, ভূস্তরের জলস্তর নেমে যাওয়া ইত্যাদির সাথে জীবিকার নেতিবাচক সম্পর্ক বুঝে উঠতে সক্ষম নয়।
সরকারী, বেসরকারি এবং ব্যক্তি চালিত সেবা প্রতিষ্ঠানের প্রচলিত সেবা সমূহে নামমাত্র অভিগম্যতাঃ সমতলের আদিবাসী জনগোষ্ঠী সেবা প্রতিষ্ঠান থেকে সেবা পাবার ক্ষেত্রে চরম মাত্রার বৈষম্যের শিকার এমনকি সেবা নির্ধারণ, সংরক্ষণ এবং বণ্টনের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতিতে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। জাতীয় পর্যায়ে তো বটেই এমন কি স্থানীয় পর্যায়ের শাসন ব্যবস্থা পরিচালনার ক্ষেত্রে নাম মাত্র অংশগ্রহণ নেই। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সনাতনী গোষ্ঠীগত শাসন ব্যবস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত নয়। আর এই সব ক্ষেত্রে আদিবাসী পুরুষদের কদাচিৎ দেখা গেলেও নারীদের অবস্থান অদৃশ্যমান।
বিচ্ছিন্নতা এবং পরিচয়ের সংকট
সমতলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রধানতম বাধা তাদের পরিচয়ের সংকট, তারা তথাকথিত মূলধারার জনগোষ্ঠী থেকে বিচ্ছিন্ন, রাজনৈতিক ভাবে ব্যবহৃত এবং ক্ষমতা কাঠামোর নিচ তলায় থাকবার কারণে সব কিছু থেকে বঞ্চিত। দেশের সংবিধান তাদেরকে আলাদা জাতিসত্তা হিসেবে স্বীকার করে না নেবার কারণে সমতলের আদিবাসী অনবরত হীনমন্যতার মধ্যে বসবাস করে আসছে। যেহেতু সমতলের আদিবাসীদের সাংবিধানিক ভাবে স্বীকার করে নেয়া হচ্ছে না তাই তাদের জন্য বিশেষ প্রনদনামূলক ব্যবস্থা নেয়া হয় না।
প্রাকৃতিক সম্পদ আর ভূমির উপর ক্রমাগত নিয়ন্ত্রণ হারানো একসময় ঐতিহ্যগতভাবে যে জনগোষ্ঠীর জীবন এবং জীবিকা প্রাকৃতিক সম্পদ, বনভূমি আর ভূমির মালিকানার উপর নির্ভরশীল ছিল সেই জনগোষ্ঠী আজ বনভূমি, ভূমি আর সব ধরনের প্রাকৃতিক সম্পদের উপর থেকে মালিকানা হারিয়ে এক প্রকার উদ্বাস্তু হিসেবে বসবাস করছে। এই মালিকানাহীনতা সমতলের আদিবাসীদের সনাতনী অভিযোজন ক্ষমতা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনেছে। সমতলের আদিবাসীদের প্রাকৃতিক সম্পদ, বনভূমি আর ভূমির অনবরত ক্ষমতাবানদের হস্তগত হয়ে পরায় তাদের নিজস্ব জীবন অ জীবিকা চরম হুমকির মধ্যে পড়ে যাচ্ছে।
বিকল্প জীবিকায় অর্থায়নের অক্ষমতা
জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন মূলক জীবিকা গ্রহণ করবার জন্য অর্থায়ন একটি আবশ্যিক শর্ত হওয়া সত্ত্বেও আদিবাসী জনগোষ্ঠী সরকারী, বেসরকারি এবং ব্যক্তি মালিকানাধীন অর্থায়ন প্রতিষ্ঠান সমূহ থেকে ঋণ পেতে অপারগ। এই অপারগতার কারণ আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উপরে ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান সমূহের কোন বিশ্বাস নেই। নমনীয় শর্তে ঋণ প্রদান করলে আদিবাসী উদ্যগতা সময়মত ঋণ পরিশোধ করেত পারার সক্ষমতা রাখে তেমন ধারনা ঋণ প্রদানকারী সংস্থাগুলো তাদের চিন্তার এই দৈন্যতা কাটিয়ে উঠতে পারছে না।সমতলের আদিবাসী জনগোষ্ঠী অভিযোজনমূলক কর্মকাণ্ড থেকে বহির্ভূতঃ সরকারী বা বেসরকারি পর্যায়ে বর্তমানে চলতি অভিযোজনমূলক কর্মকাণ্ড সমূহের বাইরে রয়েছে সমতলের আদিবাসী। প্রযুক্তি পরিবর্তনমূলক জীবিকার কথা ভাবা হলে আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে পরিকল্পনার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করাই হয় না। তাহের সক্ষমতাকে অনবরত অবমূল্যায়ন করা হয়।
আদিবাসী জনগোষ্ঠী নানা কারণে দূরবর্তী এবং বিচ্ছিন্ন অঞ্চলে বাস করতে বাধ্য হয়। এই অঞ্চলগুলো জলবায়ু পরিবর্তন অভিঘাত সমূহ দ্বারা অতি সহজেই আক্রান্ত হয়ে পরে কেননা এই সব অঞ্চল জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় সরকারি প্রকল্প থেকে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত। এক কালের ভূমির মালিক আদিবাসী জনগোষ্ঠী আর সর্ববই ভূমিহীন। কোন কোন আদিবাসী গোষ্ঠীর নিজস্ব বসতভীটাও নেই, অন্যের অথবা খাস জমিতে পরবাসীর মত অবস্থান করছে। এই জনগোষ্ঠীর জন্য কোন স্থায়ী এবং নিবিড় উদ্যোগ নেই সরকারি পক্ষ থেকে। কোন কাঠামোগত জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়নি এ অবধি। জাতীয় পর্যায়ে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা সে তো সুদূর পরাহত। উপরুন্ত এই আদিবাসী জনগোষ্ঠী সরকারের কেন্দ্রীয় ও পদ্ধতিগত নীতি নির্ধারণ থেকে বিচ্ছিন্ন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব থেকে সর্বদাই উপেক্ষিত, সমাজিক নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির শিকার, জমি থেকে উচ্ছেদের থাবার নিচে সমর্পিত এবং সর্বোপরি সংবিধান কর্তৃক আদিবাসী জাতিসত্তার অস্বীকৃতি। তাই শুধু জলবায়ু পরিবর্তন অভিঘাত সমূহ নয়, একই সাথে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও বৃহত্তর সমাজের মনস্তাত্ত্বিক বাধা সমূহকে সমন্বিত ভাবে বিবেচনা করে সমতলের আদিবাসীদের জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন পদ্ধতি নিয়ে ভাবতে হবে। এই সর্বাঙ্গীণ ভাবে পিছিয়ে পড়া আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য চাই পৃথক এবং সুনির্দিষ্ট জলবায়ু অভিযোজন কর্মসূচী যা তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ না করে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







