প্রথমে হারিয়েছিলেন হাত, এর তেরদিনের মাথায় হারালেন প্রাণও। এখানেই সমাপ্তি। তবে এর আগেও আরও অনেক কিছু হারিয়েছেন তিনি। মা, বাবা।
মাকে যখন হারান তিনি তখন প্রাথমিকের ছাত্র, তৃতীয় শ্রেণিতে মাত্র। এরপর বাবাকে যখন হারান তখন মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোনোরও ঢের বাকি, অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। সব হারা ওই তরুণ রাজীব, রাজীব হোসেন।
রাজীব আর নেই। সোমবার রাত পৌনে একটার দিকে মারা গেছেন, চিকিৎসাধীন অবস্থায়। ডাক্তাররা প্রাণান্ত চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সব চেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়ে তিনি চলে গেছেন না ফেরার দেশে।
রাজীব সড়কে মৃত্যু-মিছিলে যোগ হওয়া আরও এক নাম। অনিয়ন্ত্রিত বাস ও বাসচালকদের দৌরাত্ম্যের শিকার এ রাজীব। এ মৃত্যু নাড়া দিয়েছে আমাদেরকে। কিন্তু সেটা আর কদিন থাকে সে প্রশ্নটাও ঘুরছে সাথে সাথে। কারণ সড়কে মৃত্যু মিছিলের শিকার যারা তারা কতখানি বিচার পায়, কতখানি সতর্ক হয় বাস চালকেরা এনিয়ে প্রশ্ন আছে। বিচার হলে এখানে তাদের প্রতিবাদ আছে, অন্যায় করেও প্রতিবাদ। রাষ্ট্রযন্ত্রকে জিম্মি করে দেওয়া প্রতিবাদে নাকাল হয় মানুষ, থমকে পড়ে দেশ। বেপরোয়া তাই বাস, চালকেরা।
রাজীবের এই মৃত্যু গত ৩ এপ্রিল রাজধানীর দুই বাসের রেষারেষির ফল। বিআরটিসির একটি দোতলা বাসের পেছনের ফটকে দাঁড়িয়ে গন্তব্যে যাচ্ছিলেন রাজধানীর কারওয়ান বাজারে সরকারি তিতুমীর কলেজের স্নাতকের (বাণিজ্য) দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র রাজীব হোসেন। তখন তার ডান হাতটি বাসের দরজার বাইরে ছিল। এই সময় স্বজন পরিবহনের একটি বাস পেছনের বিআরটিসির বাসকে ওভারটেকের চেষ্টা করে। এসময় দুই বাসের চাপে রাজীবের হাতটি শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। মারাত্মক আহত রাজীবকে ভর্তি করা হয় শমরিতা হাসপাতালে, সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এরপর চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় মারা যান রাজীব।
ছোটকাল থেকে একে একে মা-বাবাকে হারানো রাজীব ঢাকার মতিঝিলে খালার বাসায় থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করে ভর্তি হন স্নাতকে। পড়ালেখার ফাঁকে একটি কম্পিউটারের দোকানে কাজ করে নিজের আর ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া দুই ভাইয়ের খরচ চালাচ্ছিলেন তিনি। তার এই মৃত্যুতে নিজের জীবনের চিরসমাপ্তি ঘটার সঙ্গে সঙ্গে অনিশ্চয়তায় পড়ে গেল আরও দুই ভাইয়ের জীবন, যাদের ভরণপোষণের গুরুদায়িত্ব পালন করছিলেন রাজীব নিজের লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার সময়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম আহত রাজীবকে দেখতে গিয়ে সুস্থ হলে তাকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চাকুরি দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। ডাক্তারদের বলেছিলেন কৃত্রিম হাত লাগানো যায় কীনা এ নিয়ে পরীক্ষা করে দেখতে।
মারা যাওয়ার কারণে চাকুরি কিংবা কৃত্রিম হাত লাগানোর প্রসঙ্গটি আর আসছে না। সরকার রাজীবের দুই ভাইয়ের লেখাপড়ার খরচ আর ভরণপোষণের দায়িত্বটা নিলে অন্তত একটা অপরাধবোধ থেকে কিছুটা হলেও রেহাই পাওয়ার চেষ্টা করা যায়। রাজীবকে আর যেহেতু ফেরানো যাবে না তাই এবিষয়টি ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ থাকল।
সড়কে মৃত্যুর ঘটনাটি বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি হয়ে থাকে। বেসরকারি সংগঠন ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ (নিসচা) তাদের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, গত তিন বছরের মধ্যে ২০১৭ সালে সড়ক দুর্ঘটনা ও এর কারণে মৃত্যুর সংখ্যা সর্বাধিক। ২০১৭ সালে সড়ক, রেল ও নৌপথ মিলিয়ে মোট দুর্ঘটনা ঘটেছে ৩৩৪৯টি। এতে ৫৬৪৫ জন নিহত এবং ৭৯০৫ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে রেলপথে ১৪৭টি দুর্ঘটনায় ২০১ জন নিহত; আহত হয়েছেন ১১৭ জন। আর নৌপথে ৩৮টি দুর্ঘটনায় ৪৭ জন নিহত ও ৫৫ জন আহত হয়েছেন; বাকি দুর্ঘটনাগুলো সড়কপথে।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২০১৭ সালে ৪৯৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৭৩৯৭ জন। আর আহতের সংখ্যা ১৬১৯৩ জন। আহতদের মধ্যে হাত, পা বা অন্য কোন অঙ্গ হারিয়ে অচল হয়েছেন ১৭২২ জন। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের সূত্রে সংগঠনগুলো এসব তথ্য প্রকাশ করেছে।
এ দুই সংগঠনের যে তথ্য তাতে সংখ্যাগত অমিল থাকায় এটা সহজেই ধারণা করা যায় প্রকৃত অর্থে দুর্ঘটনার সংখ্যা ও এতে হতাহতের সংখ্যা প্রতিবেদনে উল্লেখ সংখ্যার চাইতে অনেক বেশি।
এদিকে, বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউটের জরিপের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশের শহরাঞ্চলে মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৭৪ শতাংশই ঘটে রাজধানীতে। বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর কারণেই বেশিরভাগ দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। ২০১৭ সালের সড়ক দুর্ঘটনার যে তথ্য দিয়েছে নিসচা তাতে দেখা যায়, ঢাকা জেলায় ৪০১টি দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ৪২৭ জন।
সড়কে প্রতিদিন গড়ে ২০ জনের মত মানুষের প্রাণ যাচ্ছে। সরকারি হিসেবে এই তথ্য ছয়জনের। তবু কর্তৃপক্ষ নির্বিকার। বেপরোয়া গাড়ি চালনা, অদক্ষ চালক, ওভারলোডিং-ওভারটেকিং সহ নানা অনিয়ম চলছে। চালকের অসতর্কতা ও অবহেলার কারণে ক্রমবর্ধমান এই দুর্ঘটনা প্রতিদিন কেড়ে নিচ্ছে অগণন মানুষের প্রাণ। একই সঙ্গে অনেক পরিবারকে নিঃস্ব করে দিচ্ছে।
দুর্ঘটনা রোধে চালকদের দরকার তাত্ত্বিক, ব্যবহারিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণ। কিন্তু সেটা হচ্ছে না। অশিক্ষিত ও অদক্ষদের দেওয়া হচ্ছে ড্রাইভিং লাইসেন্স। তার ওপর আছে ড্রাইভিং লাইসেন্সবিহীন চালক। এমন অবস্থায় সড়কে দুর্ঘটনা কমিয়ে আনাটা কঠিন।
অদক্ষ ও অশিক্ষিত লোকদের হাতে গাড়ি তুলে দেওয়ার যে প্রবণতা আমাদের রয়েছে তাতে আছে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদেরও দায়। অশিক্ষিত চালকদেরও লাইসেন্স দেওয়া দরকার এমনটাই মনে করছেন আমাদের একজন মন্ত্রীও। পরিবহন নেতা ও নৌ পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান সাত বছর আগে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘দেশে চালকের সংকট আছে। আর এই বাস্তবতার ভিত্তিতে অশিক্ষিত চালকদেরও লাইসেন্স দেওয়া দরকার। কারণ, তারা সিগনাল চেনে, গরু-ছাগল চেনে, মানুষ চিনে। সুতরাং তাদের লাইসেন্স দেওয়া যায়।’
দুর্ভাগ্য যে, এই চালকদের অনেকেই এমন অদক্ষ যে মানুষ পর্যন্ত চিনতে পারে না, অথবা চিনতে চাইছে না। রাজীবের হাত ও প্রাণ কেড়ে নেওয়াটাও তাদের নয়া নজির। তাদের কাছে মানুষের প্রাণের চাইতে বেশি মূল্য অন্য গাড়িকে টপকে এগিয়ে যাওয়া। এতে কারও প্রাণ গেলেও যাক- এমন মানসিকতা।
রাজীবের প্রাণ কেড়ে নেওয়া দুই বাসচালককে পুলিশ ইতোমধ্যেই গ্রেপ্তার করেছে। আমাদের দাবি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির। অপরাধীদের শাস্তি দিলেও রাজীব ফিরবেন না কখনই তবু অন্তত একটা অপরাধের শাস্তি হবে। একই সঙ্গে দাবি করি রাজীবের দুই ভাই যাতে অকুল সাগরে না পড়েন এ নিয়ে রাষ্ট্রীয় সহযোগিতার।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)








