লেখার শিরোনামটি আমি ধার করেছি প্রথাবিরুদ্ধ কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আজাদ থেকে। তার একটি উপন্যাসের নাম। হয়তো মূল লেখার সাথে তার উপন্যাসের গল্পের কোন মিল নাও থাকতে পারে।
হুমায়ূন আজাদ বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কথা সাহিত্যিক যিনি তার তীব্রবাক্য বানে আমাদের প্রচলিত রাষ্ট্রের অসংগতি, সমাজের মুঢ়তা এবং ব্যক্তি জীবনের দ্বিচারিতার নির্মম সমলোচনা করে গেছেন। কয়েকবছর আগে তিনি তার কর্মের ফল ভোগ করে পৃথিবী ত্যাগ করেছেন! তার লেখনি যাদের মুখোশ উন্মোচন করে দিতো তাদের নগ্ন তলোয়ার তাকে অকালে পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য করেছে।
আজ বেঁচে থাকলে হয়তো আরো একবার লিখতেন ধর্ষিত ৫৮ হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশ আমার নয়। হয়তো লিখতেন পাক সার জমিনের নতুন রাষ্ট্রীয় রূপ।
‘সবকিছু কি সত্যিই ভেঙ্গে পড়ছে’
১. প্রতিবছর ঢাকা থেকে ঈদের সময় মানুষ বোঝাই হয়ে বিভিন্ন গন্তব্যে যায় রেলগুলো। ঈদের সময় ঘরমুখো মানুষ প্রিয়জনের সাথে, নিজের ভিটে মাটির সাথে ঈদ করতে গ্রামে যেতে চায় তাদের প্রথম ও প্রধান ভরসা রেল। রেলে জ্যাম নেই এটুকুই, সাশ্রয়ীর পয়সার প্রশংসা টিকিটর দাম বাড়ানোর পর এখন আর খাটে না।
এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। অনেক মানুষ রেলে যেতে চেয়েছে। কিন্তু পুরো উত্তর-দক্ষিণবঙ্গের মানুষের সাথে যেনো নির্মম রসিকতা করলো রেল কর্তৃপক্ষ। শেষ দিনতো সাহস করে উকিল মন্ত্রী আসতেও পারেননি। অনেকেই প্লাটফর্মে রাত কাটিয়েছেন। কত রেল যাত্রী যে এবার ডেঙ্গু আক্রান্ত হবে আল্লাহ মালুম। শেষ দিন রেল সচিব অসহায় ভাবে দুঃখ প্রকাশ করেছেন বটে। কিন্তু কি এমন হলো প্রতিবছর জানা সমস্যাকে কোনভাবেই নিয়ন্ত্রন করা গেলো না।
আমাদের দেশের মন্ত্রীরা যত না দেশের মন্ত্রী হন তার চেয়ে নিজ এলাকার মন্ত্রী বেশি। সুবচন রেল মন্ত্রী পঞ্চগড়ের। পূর্বাপর বিচার না করে উত্তরবঙ্গ রেল লাইনের সিডিউলের টাইমলাইন বিবেচনা না করে উনি উনার এলাকার জন্য রেল চালু করলেন। সাথে আরো দুটি। যথারীতি তার কোপে পড়লেন সাধারণ মানুষ। সাথে মড়ার উপর খাড়ার ঘায়ের মতো যমুনা সেতুর পূর্ব পাড়ে একটি বগির লাইনচ্যুতি।
২.চামড়ার হাহাকার:
প্রতিবছর ঈদুল আযহা আসে। এটি বাংলাদেশের ট্যানারি শিল্পগুলোর জন্য চামড়া সংগ্রহের বড় মৌসুম। এসময় অ্যামেচার কিছু চামড়া ফড়িয়া তরুণ কাজ করে দ্রুত কিছু টাকা পাওয়ার আশায়। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। কিন্তু কি যে হলো অনেক জায়গায় প্রাথমিক চামড়া ব্যবসায়ীরা দাম না পেয়ে ক্ষোভে মাটির নিচে চামড়া পুতে ফেললো।
মন্ত্রী প্রবর তথ্য দিয়েছেন, চামড়া ব্যবসায়ীদের এত সুবিধা দেয়ার পর কেনো এমন হলো? সরকার চামড়ার দাম বাড়াতে রপ্তানির ঘোষণা দেয়। বাংলাদেশের জুতা শিল্প সবে তার পাখা মেলতে শুরু করেছে। এখনো প্রধান রপ্তানি খাত গার্মেন্টসের চেয়ে জুতার রপ্তানি অত বেশি নয়। ট্যানারি মালিকরা বলছেন, এতে শিল্পের ক্ষতি হবে।
এ দুটি ঘটনাকে আপাত দৃষ্টিতে খুবই বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে হবে। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে এসব ঘটনা মূল ঘটনার পূর্বরাগ কিনা সেটি খতিয়ে দেখার সময় হয়েছে মনে হয়েছে। এর চেয়ে বড় বড় পূর্বরাগ এখন বাংলাদেশে ঘটছে। বাংলাদেশের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় প্রতিটি ঘটনা অনেক গুলো আগাম আভাষ আকারে আমাদের সামনে হাজির হয়েছিলো। আমরা চোখ বন্ধ করে ছিলাম। অন্ধ হলেও যে প্রলয় বন্ধ হয় না। বালিতে মুখ গুজে থেকে ঝড় থেকে রক্ষা মেলে না সে অভিজ্ঞতা আমাদের হয়েছে।
বিখ্যাত ইতিহাস বিষয়ক লেখক এএইচ কার । তার বই ‘ইতিহাস কারে কয়।’ সেখানে তিনি স্পষ্ট বলেছেন, ইতিহাস পাঠ করতে হয়। যাতে পুরনো ভুলের পূনরাবৃত্তি না হয়। ১৪’শ শতকের রাষ্ট্রনীতির লেখক ম্যাকিয়াভেলী। তার বই ‘দ্য প্রিন্সে’ বলেছেন, রোগের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয়ে অনেক পরীক্ষা নিরিক্ষা করতে হয়। কিন্তু রোগ যখন ছড়িয়ে পড়ে তখন সাদা চোখেই তার অস্তিত্ব দেখা যায়।
বাংলাদেশে রাষ্ট্র হয়ে উঠার সংগ্রামে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ প্রতিষ্ঠান তৈরী করা। দূর্বল গনতন্ত্রে প্রতিষ্ঠান বিকশিত না হয়ে বিভিন্ন স্বার্থবাদি গোষ্ঠী প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করতে নামে। তার একটা পর্যায়ে কোন এক ঝড়ে রাষ্ট্র ভেঙ্গে পড়ে। প্রতিষ্ঠান না থাকার কারণে ঝড় মোকাবেলায় সক্ষম হয় না রাজনীতি। তখন অরাজকতা তৈরী হয়। মানুষের জীবন পাখির মুল্যে বিক্রি হয়। অবিচার এমন পর্যায়ে পৌছে মানুষ তখন অতি মানুষের আশায় বতর্মানের অনাচার থেকে পরিত্রান পেতে ঈশ্বরের কাছে নিরবে প্রার্থনা করতে থাকে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








