ঢাকার উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আনিসুল হক অনেক দিন ধরেই অসুস্থ। তিনি কবে সুস্থ হবেন সেটি ডাক্তারদের কাছে এখন অজানা এক বিষয়। বর্তমানে সেন্ট্রাল লন্ডনের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন তিনি। ১৩ আগস্ট সেরিব্রাল ভাসকুলাইটিসে (মস্তিষ্কেও রক্তনালীতে প্রদাহ) আক্রান্ত হন উত্তরের এই মেয়র। এর আগে ২৯ জুলাই পারিবারিক সফরে লন্ডনে যান তিনি। এখন পর্যন্ত বলা হচ্ছে আনিসুল হকের সুচিকিৎসার জন্যেই তাঁকে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে। আনিসুল হক কবে নাগাদ স্স্থু হয়ে উঠবেন এটি এখন কারো পক্ষেই বলা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে অজানা আশংকাও সবার মনে ঘুরপাক খাচ্ছে।
এক মাসেরও বেশি সময় ধরে আনিসুলের হকে অনুপস্থিতি নগরবাসীর মাঝে এক ধরনের অস্বস্তি ও শূন্যতা তৈরি করেছে। কেননা গত দুবছর বিপদ আপদের দিনে নগরবাসী সর্বক্ষণ তাঁকে কাছে পেয়েছে। তিনি জনগণের কাছে ছুটে গিয়েছেন। জনগণের সমস্যা মেটানোর জন্যে সর্বাত্বক চেষ্টাও করেছেন। দু বছরে নেতৃত্ব, সাহস, নিজের সক্ষমতা, সৃজনশীলতা দিয়ে নগরবাসীর মনে জায়গাও করে নিতে সমর্থ হন।
তুখোড় ব্যবসায়ী, ভীষণ জনপ্রিয় টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব আনিসুল হক মেয়র হবেন এমনটি অনেকের কাছেই ছিল অজানা। কিন্তু সর্বশেষ নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনার পছন্দে আওয়ামী লীগের দলীয় সমর্থন নিয়ে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের উত্তরের মেয়র নির্বাচিত হন। মেয়র নির্বাচিত হওয়ার আনিসুল হক নগরবাসীর যাবতীয় সমস্যা সমাধানে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে কাজ শুরু করেন।
শপথ নেওয়ার পরই তিনি দৃঢ়কণ্ঠে ঘোষণা দেন ঢাকাকে বদলে দেবেন দ্রুত। গ্যাস, পানির সমস্যা, যাতায়াত চলাচলের সমস্যা, বিনোদনের সমস্যা, জলবদ্ধতা, নানা দুর্ভোহসহ সব ধরনের নাগরিক অসুবিধা থেকে তিনি জনগণকে বের করে আনবেন। শুধু এই নয়, শহরকে সবুজ শহরে পরিণত করবেন তিনি। যে শহরে মানুষ নিঃশ্বাস নিতে পারবে। নির্বিঘ্নে হাঁটাচলা করতে পারবে। শুধু ঘোষণাই নয়, আনিসুল হক সত্যিই নগরের মানুষের সমস্যা সমাধানে রাস্তায় নেমে পড়েন। দিনরাত কাজ করতে থাকেন। অযথা তর্ক-বিতর্ক করে তিনি সময় নষ্ট করেননি।
এ সত্য আমাদের মানতেই হবে যে মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি ঢাকার উত্তরের সার্বিক চেহারা বদলে দিতে শুরু করেন। ফলে সাধারণ মানুষ দ্রুতই দৃশ্যমান পরিবর্তনও দেখতে শুরু করে। আনিসুল হক অত্যন্ত দ্রুততার সাথে যে উল্লেখযোগ্য কর্ম সম্পাদন করতে সমর্থ হন এর মধ্যে অন্যতম হলো- ফুটপাথ ও রাস্তা থেকে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করা, বাস-টার্মিনালের ব্যবস্থাপনাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে পাবলিক টয়লেট স্থাপন, সমস্ত ধরনের বিলবোর্ড উচ্ছেদ, টার্মিনাল-বাসস্ট্যান্ড অবৈধ দখল মুক্ত করে উন্মুক্ত করা, পার্কগুলো সংস্কার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নতুনত্ব আনা ইত্যাদি।
আনিসুল হক মেয়র হওয়ার আগে বৈধ-অবৈধভাবে বিলবোর্ডে ছেয়ে গিয়েছিল ঢাকা শহর। তিনি এসেই কোনো অপশক্তির কাছে মাথা নত না করে সমস্ত বাধাবিপত্তি পেরিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সব অবৈধ বিলবোর্ড নামিয়ে ফেলতে সমর্থ হন। যে যত কথাই বলুক এর আগে যারাই ক্ষমতায় এসেছিল তারা একটি অবৈধ বিলবোর্ডও নামানোর মতো দৃষ্টান্ত স্থপান করে যেতে পারেননি। একইভাবে তিনি বাসস্ট্যান্ড এবং টার্মিনালগুলোতেও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সমর্থ হোন। বিশেষ করে কারওয়ান বাজার সংলগ্ন তেজগাঁও ট্র্যাকস্ট্যান্ড মুক্ত করাটা ছিল তার জন্য সবচেয়ে বড় এক চ্যালেঞ্জ। তেজগাঁও এর রেলওয়ের প্রায় ৪০ একর জমি দখল করে ট্র্যাকস্ট্যান্ড গড়ে তুলেছিল স্থানীয় নানা স্বার্থসংশ্লিষ্ট গ্রুপ। কিন্তু কারো কাছেই মাথা নত না করে আনিসুল হক সাধারণ জনগণের পক্ষে থেকে সরকারি জায়গা ছেড়ে দিতে চাপ প্রয়োগ করেন। সর্বশেষ নানা ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে ট্রাক চালক-মালিককরা অবৈধ দখল ছেড়ে দিতে বাধ্য হন এবং সাধারণ জনগণের চলাফেরা উন্মুক্ত হয়।

ফুটপাথের চলাচলের অধিকার ফিরিয়ে আনতেও তিনি নিরন্তর চেষ্টা করেছেন। গুলশানে উচ্চবিত্তের চলাচল থেকে শুরু করে বছিলার নিম্নবিত্তের চলাচলের সব খাজায়গাতেই তিনি নাগরিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে ছুটে চলেছেন। দৃঢ়কণ্ঠে উচ্চারণ করেছেন, জনগণের চলাচলের জায়গা ছেড়ে দিতে হবে। রাজধানির বিভিন্ন সড়ক এবং বিপণীবিতানের সামনে যারা ‘নো পার্কিং’, ‘নো পার্কিং’ লিখে রাস্তা দখল করে তাদের বিরুদ্ধেও তিনি হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন। বলেছিলেন ঢাকা শহরে পাবলিকের কোনো রাস্তায় ‘নো পার্কিং’ লেখা দেখতে চাইনা। আবার ফুটপাথে গাড়ি, মটর সাইকেল যারা রাখেন তাদের বিরুদ্ধেও সোচ্চার ছিলেন। নিজেই বেশ কয়েকবার হাতেনাতে কয়েকজনকে ধরে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর হাতে তুলে দেন।
ফার্মগেট, তেজগাঁওসহ উত্তরের বিভিন্ন স্থানে এখন যে চকচকে সব পাবলিক টয়লেট এটিও মেয়র আনিসুল হকের অবদান। এই শহরে হাতের নাগালে সব পাওয়া গেলেও পাবলিক টয়লেট ছিল না। ফলে সাধারণ মানুষ যেখানে সেখানে মলমূত্র ত্যাগ করতো। কিন্তু এখন সুন্দর ব্যবস্থাপনায় মানুষ পাবলিক টয়লেট ব্যবহার করতে পারছে। টার্গেট এলাকাগুলোতে কমিউনিটি ভিত্তিক আধুনিক টয়লেট স্থাপন করা হয়েছে।
মেয়র হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই আনিসুল হক বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে দেখেছেন। আর তাই দ্রুতই মহম্মদপুর, গুলশান, মিরপুরসহ বিভিন্ন স্থানে দ্রুত বর্জ্য ফেলানোর জন্য বেশ কয়েকটি এসটিএস (সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন) গড়ে তোলেন। বিভিন্ন বাজারে যে নোংরা পরিবেশ বিরাজমান ছিল যেসব জায়গাতেও তিনি অনেক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হন। আগে যত্রতত ময়লা ফেলার যে কুঅভ্যাস মানুষের গড়ে উঠেছিল সেটা তিনি সমূলে উচ্ছেদ করতে চেয়েছেন।
এ কারণেই তিনি ক্ষমতায় আসার পর পাড়া মহল্লার অবহেলিত পার্কগুলো সংস্কারে হাত দেন। বলা যায়, সব পার্কেই এখন মানুষ বসতে পারেন, হাঁটাহাঁটি করতে পারেন। মুহম্মদুপরের তাজমহলে রোডের পার্কগুলো ব্যবহারে অনুপযোগী হলেও আনিসুল হক আসার পর সব বদলে যেতে থাকে দ্রুত। তাঁর নির্দেশেই মুহম্মদপুরে আরো বড় ধরণের পরিবর্তন এসেছে বলা ভুল হবে না। মুহম্মদুপরে দুই বাড়ির প্যাসেজে বছরের পর বছর ময়লার স্তুপ জমে থাকলেও এর আগে কেউ এটি সরানোর উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। কিন্তু আনিসুল হক সেই উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং এখন পর্যন্ত সেই ময়লা অপসারণের কাজ চলমান রয়েছে।
মনে আছে দায়িত্বপালনের দু’বছর পূর্তি উপলক্ষে ১৪ মে সন্ধ্যায় আনিসুল হক ফেসবুক লাইভে নাগরিকদের মুখোমুখি হয়েছিলেন। ফেসবুক লাইভে আনিসুল হক অনেকগুলো স্বপ্নের কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন দ্রুতই চার হাজার নতুন গণপরিবহন নামাবেন। গণপরিবহনগুলোকে ৫ থেকে ৬টি কোম্পানীতে নিয়ে আসবেন। গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনতে লাল আর সাদা বাসের কথা বলেছিলেন। সুনির্দিষ্ট এই দুটি কালারের বাস সুনির্দিষ্ট লেন ধরে চলবে। সুনির্দিষ্ট স্টপেজে থামবে। নারীদের চলাচলের সুবিধার্থে স্পেশাল বাস নামাবেন। নগরীর জলবদ্ধতা নিয়ে বলেছিলেন, জনগণেরও দায় আছে। ময়লা আবর্জনা, পলিথিন যেখানে সেখানে ফেলার কারণে ড্রেনেজের মুখ বন্ধ হয়ে গেছে। এসব অভাস থেকে মানুষকে বের করে আনতে হবে।
চিকুনগুনিয়ার বিরুদ্ধেও তিনি সর্বাত্বক যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। আমরা এও দেখেছি মানুষ যেখানেই বিপদগ্রস্ত হয়েছেন মেয়র আনিসুল হক সবার আগেই সেখানে ছুটে গেছেন। উত্তরার একটি ভবনে আগুন লাগার পর তিনি বলেছিলেন, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসমূহে নিজস্ব অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থা গড়ে তুলতেই হবে। আবার হলি আর্টিজানের ঘটনার পর তিনি প্রতিটি শোকাহত পরিবারের কাছে চিঠি পাঠিয়ে শোক প্রকাশ করেন।
সবারই মনে থাকার কথা মেয়র নির্বাচনের সময় তিনি যে ইশতেহার দিয়েছিলেন সেখানে মূল শ্লোগান ছিল- পরিচ্ছন্ন-সবুজ-আলোকিত মানবিক ঢাকা-এবার সমাধান যাত্রা। তিনি বলেছিলেন- শহরের দুটি দিক থাকে, একটি হচ্ছে ফাংশনাল বা কার্যকরী, অন্যটি হচ্ছে ভিজ্যুয়াল বা বাহ্যিক রূপ। কার্যকরী ব্যবস্থার দিক থেকে শহরে জাতীয় আদর্শাবলির প্রতিফলন থাকা দরকার। বাংলাদেশের নগর পরিকল্পনার মূল দার্শনিক ভিত্তি মানবিক মূল্যবোধ হলেও, ঢাকা দিনে দিনে রুঢ় ও রুক্ষ হয়ে উঠেছে। কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছে প্রিয় এই শহরের স্নিগ্ধতা, মমতা। অথচ মানবিক মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করেই শহরের কর্মসংস্থান নীতি, গৃহসংস্থান নীতি, যানবাহন-যোগযোগ অন্যান্য সুযোগ সুবিধার বণ্টন পরিকল্পনা হওয়া উচিত ছিলো। আমরা বিশ্বাস করি, মুষ্টিমেয়র জন্য সুন্দর শহরের চেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠের মানবিক শহর বানানোতেই ঢাকার ভবিষ্যত নিহিত। তিনি বলেছিলেন, মেয়রের জন্যে সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া ২৮টি কাজের জন্য সরকারের ৫৬টি সংস্থার দিকে চেয়ে থাকতে হয়।
সবার প্রিয় মেয়র আনিসুল হক এভাবেই স্বপ্ন দেখেছিলেন। মানুষকে স্বপ্নের ভেতরে নিয়ে দায়বদ্ধতা বাড়িয়ে ঢাকাকে মানবিক শহর বানাতেই প্রাণান্তকর চেষ্টায় নেমেছিলেন। কিন্তু সেই মানুষটি এখন রোগশয্যায়, নিরুত্তাপ ঘুমিয়ে আছেন। সাহসী, পরিশ্রমী, আধুনিক মানুষ আনিসুল হক ফিরে আসুক নগরবাসীর মাঝে-যে নগরকে তিনি শাসন আর মায়া মমতা দিয়ে সাজাতে চেয়েছেন, যে শহরকে তিনি ভীষণ ভালোবেসেছেন।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)







