কোটা সংস্কার আন্দোলনকে একটি স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন হিসেবে আখ্যায়িত করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা এ আন্দোলনের মধ্যে ষড়যন্ত্র না খুঁজতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র- শিক্ষক কেন্দ্রে(টিএসসি) ‘ক্যাম্পাসে স্থিতিশীল পরিবেশ ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে’ শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে মতবিনিময় ও আলোচনা সভায় তারা এ আহ্বান জানান।
মতবিনিময় সভায় আলোচনায় অংশ নেন, ঢাবির ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সৌরভ সিকদার, অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এম এম আকাশ, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. ফাহমিদুল হক, অধ্যাপক রুবায়েত ফেরদৌস, সহযোগী অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক খান, বাংলা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আবুক কাশেম ফজলুল হক, ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক রাশিদুল হাসান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক মোঃ তানজিম উদ্দিন খান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সায়মা আহমেদ প্রমুখ।
অধ্যাপক এম এম আকাশ বলেন, শিক্ষক-ছাত্রের সম্পর্ক হচ্ছে পিতামাতার সম্পর্ক। সন্তানরা ভুল করলে শাস্তি দেন। তবে তাদের উপর গুলি চালানো যাবে না। কোটা সংস্কার আন্দোলন স্বতফুর্ত আন্দোলন। এই আন্দোলনে একটি মাত্র রাজনৈতিক স্লোগান ও ছবি ব্যবহৃত হয়েছিল, তা হল বঙ্গবন্ধুর ছবি ও সংবিধানের সাথে মিল রেখে ‘বঙ্গবন্ধুর বাংলায় বৈষম্যের ঠাই নাই’। এ কথা ঠিক যে, কোটা মানেই বৈষম্য। যার যোগ্যতা নেই সে কোটার মাধ্যমেই সুবিধা নেয়।
তিনি আরও বলেন, সংবিধানে বলা আছে যারা পিছিয়ে পরে আছে, যার যোগ্যতা অর্জনের সুযোগ নেই তাদেরকে সাময়িকভাবে বিশেষ সুবিধা দেয়া যেতে পারে। সেই সুবিধা বলে তারা যখন যোগ্য হয়ে ওঠে, তখন সেই সুবিধা প্রত্যাহার করা যেতে পারে। সেই সুবিধা অল্প সংখ্যক লোকের জন্য এবং কম সময়ের জন্য।
অধ্যাপক ড. ফাহমিদুল হক, সাধারণ শিক্ষার্থীদের এ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমরা শিক্ষক-শিক্ষার্থী মুখোমুখি হয়ে গেছি। যার কারণে আমরা একই প্লাটফর্মে এসে কথা বলতে পারছি। সরকারি প্রশাসন বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে শিক্ষার্থীদের উপর অত্যাচার চালিয়েছে। আন্দোলনকারীরা কি সবাই ছাত্রশিবির? লাখ লাখ শিক্ষার্থী এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছে, সেটা কি আপনারা দেখেন নি। আপনারা এই নাগরিক গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছেন, সবকিছুতেই ষড়যন্ত্র দেখবেন না। দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করুন।
তিনি আরও বলেন, ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকদের নিরাপত্তা বিধানের জন্য উপাচার্য বরাবর আমরা চিঠি দিয়েছি, এছাড়াও আমরা মানববন্ধনও করেছি, এরপরও যদি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হয় তাহলে আমরা কঠোর কর্মসূচিতে যাব।
আবুল কাশেম ফজলুল হক বলেন, কোটা সংস্কারের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে পুলিশের হামলার কোন যৌক্তিকতা ছিল না, সরকারের উচিৎ ছিল হামলার পূর্বে এর একটা সমাধান করা। মামলা-মোকদ্দমা ও পুলিশের মাধ্যমে বিষয়টি জটিল না করে সরকারি ভাবে এর সমাধান করা যেত। ভিসি বাংলোতে হামলা ন্যক্কারজনক ঘটনা। তবে আমি মনে করি আন্দোলনকারীরা কেউ এর নেতৃত্ব দেয় নি।
অনুষ্ঠানে কোটা সংস্কার আন্দোলনের যুগ্ম আহ্বায়ক রাশেদ খান কয়েকটি দাবি উপস্থাপন করে বলেন: সেদিন যারা ক্যাম্পাসে অস্ত্র হাতে মহড়া করেছিল, আমাদের ভাই আশিকুরের বুকে গুলি চালিয়েছিল, তাদের প্রত্যেককে চিন্হিত করে শাস্তি দিতে হবে। সাধারণ শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের নিরাপত্তার জন্য একটি স্বায়ত্তশাসিত বিশেষ নিরাপত্তা সেল গঠন করতে হবে। ক্যাম্পাসের প্রবেশ পথগুলোতে সিসি ক্যামেরা ও নিরাপত্তা চৌকি বসাতে হবে। বিশেষ করে রাত দশটার পর থেকে ভোর পর্যন্ত ক্যাম্পাসে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে এবং নিরাপত্তা চৌকির মাধ্যমে দেখতে হবে কোন বহিরাগতরা ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে চায়।ক্যাম্পাসের প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে পড়াশোনার পাশাপাশি বাক স্বাধীনতা দিতে হবে। হলগুলোতে তাদের যে বাকরুদ্ধ করে রাখা হয়, তাদের অধিকারের বিষয়ে কথা বলতে দেওয়া হয় না, এ বিষয়ে হল প্রশাসনকে ব্যবস্থা নিতে হবে।আজকের পর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে সকল ন্যায্য আন্দোলন হয় সেখানে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে কোন বাঁধা দেওয়া যাবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেকটি কাজ, প্রত্যেকটি বিষয় স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। অন্যকোন গোষ্ঠী বা পক্ষের হাতে নিয়ন্ত্রণ যাওয়া যাবে না।
মতবিনিময় ও আলোচনা সভার সঞ্চালনা করেন কোটা সংস্কার আন্দোলনের যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল হক নূর।








