আমাদের মেয়ের নাম রাখার সময় আমরা পরিবারের মুরুব্বিদের কারো কারো কাছ থেকে বাধার মুখে পড়লাম। আমাদের ইচ্ছা আমরা আমাদের মেয়ের বাংলা নাম রাখবো। কিন্তু ব্যাপারটা অনেকেই পছন্দ করলেন না এবং আপত্তিও করলেন। ‘এসব হিন্দু নাম রাখার মানে কী!’ আমরা বোঝানোর চেষ্টা করি হিন্দু নাম, মুসলমান নাম বলে কিছু নাই– নাম হয় ভাষাভিত্তিক।
আমরা বাঙালি কাজেই বাংলা নাম রাখাটা দোষের কিছু নয় । তাদের বুঝালাম ইরাকের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন তারিক আজিজ। নাম শুনলে মনে হবে মুসলমান। কিন্তু উনি ছিলেন খৃষ্টান। ইরাকের বলে নামটা ছিল এরাবিক। কাজেই হিন্দু–মুসলিম নাম বলে কিছু নাই । আমরা আমাদের মেয়ের নাম বাংলাতেই রাখবো এবং মুরুব্বিদের কথা অগ্রাহ্য করে রেখেছিলামও। যদিও পরে ওকে অনেক জায়গাতেই নামের কারণে এই হিন্দু মুসলিম ধন্ধের মধ্যে পড়তে হয়েছিল। শুধু ওকে নয়, রঞ্জনা নামের কারণে আমাকেও এই হ্যাপাটা সহ্য করতে হয়েছে।
এখন অনেকেই সন্তানের নাম বাংলায় রাখেন। তবে উল্টোপিঠেও কম নয়। চারপাশের মানুষ এতো অসহিষ্ণু ও সাম্প্রদায়িক হয়ে উঠেছে যে দেখে অবাক হয়ে যাচ্ছি। যেকোন ছুঁতোয় অনেকে ধর্ম তুলে কথা বলে, ধর্মকে ইস্যু করে। আমার এক সহকর্মী বললেন, “আমার ভাইয়ের ওয়ানে পড়া ছেলেটি স্কুল থেকে কাঁদতে কাঁদতে ফিরেছে। কেন কাঁদছে জিজ্ঞাসা করতে বাচ্চাটি বলল, আমার বন্ধুরা আমার সঙ্গে খেলতে চায় না, কারণ আমি হিন্দু। হিন্দু হওয়াটা কী খারাপ মা? বলতো।” মা এর কোন উত্তর খুঁজে পাননি। পরে তারা গিয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন।
হিন্দু পরিবারের আরেকটি বাচ্চার কথা জানি যে স্কুল থেকে বাসায় এসেই বলল, মুসলমানরা খুব খারাপ। বাসার সবাই অবাক হয়ে জানতে চাইলো, এটা কী ধরণের কথা? কেন তুমি এমনটা বলছো? সে বলল, খারাপইতো! আমার ক্লাশের ৩/৪ জন বন্ধু আমার ধর্ম বইটিতে থু থু ছিটিয়েছে। ওরা বলেছে, এটা কোন বইই না।”
আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে একসময় মোল্লারা হিন্দু বলতে দ্বিধা করেনি। তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচারের কোন শেষ ছিল না। পারলে তারা তাকে ইসলাম ধর্ম থেকে বিচ্যুত করতো। কাফের, নাদান কিছু বলতেই ছাড়েনি। কবির অপরাধ- কবি মোল্লাতন্ত্রকে নিয়ে অনেক হাসি-তামাশা করেছেন, কড়া কথা লিখেছেন। উনি ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে ছিলেন। অথচ এই নজরুল ইসলাম যে হামদ-নাত লিখে গেছেন, তা আমরা আজো গেয়ে চলেছি। নজরুলের একটি কবিতার দুটি পংক্তি বারবার মনেহয়–
“অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া, জানে না সন্তরণ-
কাণ্ডারী, আজি দেখিব তোমার মাতৃ-মুক্তি-পণ।
হিন্দু না ওরা মুসলিম-ওই জিজ্ঞাসে কোন্ জন,
কাণ্ডারী, বল, ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মা’র।।”
সাম্প্রদায়িক ভেদ-বুদ্ধিসম্পন্ন মানসিকতার মানুষ কি আমাদের সমাজে দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে? নিশ্চয়ই যাচ্ছে, নতুবা শিশুরা স্কুলে গিয়ে এরকম কথা বলে কীভাবে? বাবা মা, পরিবার যা শিশুকে শেখায় শিশু প্রথম অবস্থায় সেটাই শেখে। এরপর আসে স্কুল ও শিক্ষকের ভূমিকা।
আমি নিজে ধর্ম পালনকারী একটি পরিবারের সন্তান।আমার বাবা হজ্ব করেছিলেন। এই বাবাই আমাদের শিখিয়েছেন সেই কবিতা “সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই”।
আমার দাদা কোনদিন নামাজ কাজা করেছেন কিনা জানি না। উনি পেশায় আইনজীবি ছিলেন– ইংরেজী, বাংলা, আরবী ও সংস্কৃত ভাষায় ছিল তাঁর অসাধারণ দক্ষতা। ওনার বাবা নিজে হাতে কোরআন শরীফ কপি করেছেন। সেই দাদাই আমাদের বলেছেন, “তোমরা সবসময় মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখবে। সাদা, কালো, হিন্দু, মুসলমান, ধনী, দরিদ্র এটা মানুষের কোন পরিচয় হতে পারে না। মানুষের একমাত্র পরিচয় সে মানুষ। তোমরা শুধু দেখবা সেই মানুষটি ভাল না মন্দ?” দাদার সেই কথা আমাদের কাছে অবশ্য পালনীয়। পুরো পরিবার আজো সেই কথাকে আশ্রয় করে আছি। আমরাও আমাদের সন্তানদের সেই কথা শুনিয়েছি, সেই শিক্ষায় বড় করেছি।
আমার বিশ্বাস বাবা মা বা বৃহত্তর পরিবার যদি তাদের সন্তানকে অসাম্প্রদায়িক চেতনাতে বড় করেন তাহলে সেই পরিবারের শিশু মানুষকে শুধু মানুষ হিসেবেই দেখতে শিখবে। হিন্দু বা মুসলিম বা খৃষ্টান হিসেবে নয়। সে নিজের ধর্ম পালন করবে কিন্তু অন্য ধর্মকে ঘৃণা করতে শিখবে না। পরিবারের সাম্প্রদায়িক চিন্তা থেকেই সন্তান ক্রমশ জঙ্গীবাদ বা মৌলবাদকে বেছে নেয়।
শিবসেনার কার্যক্রমকে আমরা যেমন ঘৃণা করি, তেমনভাবে ঘৃণা করি সেইসব মুসলমান নামধারীদের যারা অন্য ধর্মাবলম্বীদের উপর নগ্ন হামলা চালায়। কাশ্মির কিংবা সিরিয়াতে, লেবাননে কিংবা ইরাকে যারা মানুষ হত্যা করছে, আর যারা জঙ্গীবাদী মন নিয়ে মানুষ হত্যা করছে, মন্দির বা চার্চে হামলা চালাচ্ছে, তারা সমান অপরাধে অপরাধী।
প্রসঙ্গটা আনলাম ব্রাক্ষণবাড়িয়ার নাসিরনগরে সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া ১৫টি মন্দির ও বাড়িঘর ভাংচুর এবং লুটতরাজের ঘটনায়। ভাবা যায়না, শুধুমাত্র একটি শোনা কথাকে কেন্দ্র করে মন্দিরে ভাংচুর, বাড়িঘর লুটপাট, মারধর সব করলো একশ্রেণীর স্বার্থান্বেষী ও মৌলবাদী মানুষ। এরা কোন ধর্মের নয়, এদের পরিচয় একটাই– এরা প্রতিক্রিয়াশীল অসাধু চক্র। এরাই পারে ধর্মের নামে হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট করতে। রামুর নগ্ন ঘটনার জন্য এরাই দায়ী ছিল। একাত্তরেও এরা ধর্মের নামে মানুষ হত্যা করেছে, ধর্ষণ করেছে, বাড়িঘরে আগুন দিয়েছে, লুটপাট চালিয়েছে, মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে। এখন এদের বিচার হচ্ছে ঠিক, কিন্তু নতুন প্রজন্মকে কি আমরা অসাম্প্রদায়িক হিসেবে গড়ে তুলতে পারছি?
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








