গণমাধ্যমের প্রতি জাতীয় সংসদে মন্ত্রীদের বিরূপ মন্তব্য অব্যহত রয়েছে। গত কয়েকদিনে একাধিক মন্ত্রী বিভিন্ন ইস্যুতে ‘সংবাদপত্র মিথ্যা সংবাদ প্রচার করছে’ বলে মন্তব্য করেছেন। মঙ্গলবারও দুজন মন্ত্রী প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন যে সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংবাদ সঠিক নয়, তাদের বক্তব্যই ঠিক।
জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে একজন সংসদ সদস্য খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলামের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, ব্রাজিল থেকে আনা পচা গম নিয়ে পত্র-পত্রিকাসহ বিভিন্ন মহলে যে সমালোচনা হচ্ছে, সেই গম আমদানির সঙ্গে জড়িত দোষীদের বিরুদ্ধে তিনি কোনো ব্যবস্থা নেবেন কি না?
উত্তরে গম আমদানি প্রক্রিয়ার বিস্তারিত ব্যাখা দিয়ে তিনি একহাত নেন সংবাদপত্রের ওপর। মন্ত্রী বলেন, ২ লাখ মেট্রিক টন গমের মধ্যে শুধু ২৫ হাজার মেট্রিক টন গুদামে আছে। বাদবাকি বিতরণ হয়ে গেছে। কিন্তু কোনো অভিযোগ ওঠেনি। কয়েকদিন ধরে পত্রিকায় লেখালেখি হচ্ছে।
বিভিন্ন আঞ্চলিক, জাতীয় দৈনিক ও বেসরকারি টেলিভিশনে কুষ্টিয়া-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুর রউফ ওই গম স্থানীয় গুদামে ঢুকতে দেননি, জনগণকে নিয়ে প্রতিরোধ করেছেন বলে যে খবর প্রকাশ এবং প্রচার হয়েছে; খাদ্যমন্ত্রী সরাসরি ওই সংবাদকে অসত্য না বলে জাতীয় সংসদকে জানান, এমপি এবং উপজেলা চেয়ারম্যানের দ্বন্দ্বের কারণে ওই ঘটনা ঘটেছে।
ব্রাজিলের গম দেখতে খারাপ হলেও গুণমত মান ভালো এরকম দাবি করে তিনি আবারো সংবাদপত্রে প্রকাশিত পচা ও পোকা ধরা গমের সংবাদ ও ছবিকে মিথ্যা বলে দাবি করেন।
মন্ত্রী কামরুল ইসলাম বলেন, সংবাদপত্রে প্রকাশিত গমের ছবির সঙ্গে ব্রাজিল থেকে কেনা ওই গমের কোনো সম্পর্ক নেই। ওই ছবি সরকারি খাদ্য গুদামের গমের ছবি নয়। তিনি দাবি করেন, একশ্রেণীর সংবাদপত্র মনের মাধুরী মিশিয়ে যা খুশি লিখছে।
গম নিয়ে সরকারকে বেকায়দায় ফেলা ও রাজনৈতিক ইস্যু সৃষ্টির চেষ্টা চলছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।সংবাদপত্র নিয়ে খাদ্যমন্ত্রীর এমন মন্তব্যের কিছু সময় পরই পত্রিকায় প্রকাশিত আরেক সংবাদের সূত্র তুলে ধরে বগুড়ার সংসদ সদস্য আব্দুল মান্নান বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের কাছে জানতে চান, মেয়াদ উত্তীর্ণ সয়াবিন বিক্রি বন্ধ করা হবে কি না?
সংবাদপত্রের প্রশংসা দিয়ে জবাব শুরু করে তোফায়েল আহমেদও দাবি করেন, প্রকাশিত বা প্রচারিত ওই সংবাদ সঠিক নয়। টিসিবি মেয়াদ উত্তীর্ণ কোনো পণ্য বিক্রি করে না। ওই সয়াবিনও মেয়াদ উত্তীর্ণ নয়।
মঙ্গলবার দু’ মন্ত্রীর এসব মন্তব্যের একদিন আগে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদের সূত্র ধরে তৃতীয় দফায় জাতীয় সংসদে বিবৃতি দেন কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী। ‘কলের লাঙলের ভর্তুকির বড় ভাগ সরকারি দলের নেতা-কর্মিদের পকেটে’ এমন সংবাদ, কৃষিমন্ত্রীর দু’ দফা বিবৃতি, পত্রিকার আরো অনুসন্ধানে প্রকাশিত সবশেষ প্রতিবেদনের পর সবশেষ বিবৃতিতেও ক্ষুব্ধ কৃষিমন্ত্রী দাবি করেন, সংবাদটি সঠিক নয়।
তিনি বলেন, ‘যতই বানোয়াট নিউজ ছাপান না কেনো, এতে যে আমি খুব উত্তেজিত হবো, রাগান্বিত হবো এমন না।’‘তারা তাদের ইচ্ছামতো নিউজ করে এবং সেইভাবে পাঠকদের বিভ্রান্ত করে,’ বলে দাবি করেন মন্ত্রী। কৃষিমন্ত্রী বলেন: প্রতিবাদ দিলেও তারা তিন চার লাইন দেন বা দেন না। এর নাম সৎ সাংবাদিকতা না।
আরেকটু এগিয়ে তিনি মন্তব্য করেন, আমি এমপি এবং মন্ত্রী তাই পার্লামেন্টে কথা বলতে পারি, তাও সেশন থাকলে। সাধারণ মানুষের প্রতিকারের পথটা কি? খাদ্যমন্ত্রী যেমন গম নিয়ে খালেদা জিয়া এবং বিএনপির ষড়যন্ত্রের কথা বলেন, একইভাবে ওই (কলের লাঙল) সংবাদের রিপোর্টার সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে মন্ত্রী বলেন, ওই সাংবাদিক ছাত্রদল ও যুবদলের নেতা ছিলেন ।
সাংবাদিকদের এভাবে বিরোধীদলের রাজনৈতিক কর্মি বা নেতা বানানোর ঘটনা অবশ্য এটাই প্রথম নয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করা না করা সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবকে সূত্র করে একটি বেসরকারি টেলিভিশনে সংবাদ প্রচারিত হয়।
সেই সংবাদের সূত্র ধরে শেষ পর্যন্ত জাতীয় সংসদে বিবৃতি দেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। বিবৃতিতে ওই সাংবাদিককে বিরোধী রাজনৈতিক ঘরানার কর্মি হিসেবে মন্তব্য করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
সংবাদপত্রের সংবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের এমন বক্তব্যের বিষয়ে একাধিক দৈনিকের সাবেক সম্পাদক এবং দীর্ঘদিন পার্লামেন্ট বিষয়ে রিপোর্ট করা সিনিয়র সাংবাদিক শাহজাহান সরদার বলেন, আমাদের দেশে এমন ট্র্যাডিশন আছে যে সংবাদপত্রের কোনো সংবাদ, অনিয়ম-দুর্নীতির ঘটনা বা সমালোচনা মন্ত্রী বা সরকারের বিরুদ্ধে গেলেই মনে করা হয় যে সংবাদপত্রটি তাদের বিরোধিতা করছে।
‘এটা সরকার বা বিরোধীদল সবার জন্যই প্রযোজ্য। কিন্তু মন্ত্রীরা তো সব কিছুই জানেন না। মাঠ পর্যায়ের সব কিছুর খোঁজ রাখাও সম্ভব নয়,’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, বিদেশে এ ধরণের নিউজের বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হয়।
সিনিয়র এই সাংবাদিক মনে করেন, এটাও ঠিক যে সবসময় সব মিডিয়া দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখে না। এখানে সরকার বা মিডিয়া কোনো ক্ষেত্রেই উপযুক্ত জবাবদিহিতা নেই বলেই এমন পরিস্থিতি বলে মনে করেন শাহজাহান সরদার।







