গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা ও রমনা বটমূলে বোমা হামলা মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মুফতি আব্দুল হাইকে গ্রেপ্তার করছে র্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। জঙ্গিবাদী ঘটনার সঙ্গে হরকাতুল জিহাদের জড়িত থাকার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসলে মুফতি আব্দুল হাই ২০০৬ সালের পর শ্বশুরবাড়িতে আত্মগোপনে চলে যান। দীর্ঘদিন সেখানে থাকার পর নিজের ও পরিবারের স্থায়ী ঠিকানা পরিবর্তন করে তিনি নারায়ণগঞ্জের ভোটার হয়ে স্থায়ী বসবাস শুরু করেন।
আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানায় র্যাব।
বাসস জানিয়েছে, বুধবার রাতে র্যাব-২ এর একটি দল জঙ্গিগোষ্ঠী হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশের সাবেক আমির ও প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মুফতি আবদুল হাইকে নারায়ণগঞ্জ জেলার ফতুল্লা থেকে গ্রেপ্তার করে।
তিনি গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় ৭৬ কেজি বোমা পুঁতে রেখে শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা মামলার এবং রমনার বটমূলে বোমা হামলার মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি। এ ছাড়াও তিনি আরও মামলায় যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাাপ্ত আসামি। তার বাড়ি কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দিতে।
সংবাদ সম্মেলনে র্যাব জানায়, মুফতি আব্দুল হাই কুমিল্লা জেলার গৌরিপুরে তার শ্বশুরবাড়ি এলাকায় আত্মগোপনে চলে যাওয়ার পরও তার পরিবার নারায়নগঞ্জেই বসবাস করত। গৌরিপুর বাজারে তার শশুরের কেরোসিন ও সয়াবিন তেলের ডিলারশিপের ব্যবসা ছিল। তিনি সারাদিন ব্যবসা দেখাশুনা করে ঐ দোকানেই রাত কাটাতেন। এভাবেই ২০০৯ সাল পর্যন্ত তিনি তার শ্বশুর বাড়ীর এলাকা গৌরিপুরে আত্মগোপনে ছিলেন। গৌরিপুরে আত্মগোপনে থাকাবস্থায় তিনি মাঝেমধ্যে অত্যন্ত সাবধানে নারায়ণগঞ্জে যাতায়াত করতেন। পরবর্তীতে কৌশলে তিনি তার ও পরিবারের সবার ঠিকানা পরিবর্তন করে নারায়ণগঞ্জে ভোটার হয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করেন।
র্যাব আরো জানায়, স্থানীয় এলাকাবাসী যেন তার পরিচয় জানতে না পারে সেজন্য তিনি ঘর থেকে খুব কম বের হতেন। আইন-শৃংখলা বাহিনীর নজর এড়াতে তার বর্তমান ঠিকানার বাসাটি এলাকার লোকজনের কাছে তার বড় ছেলের বাসা হিসেবে পরিচিতি করায়। গতকাল বুধবার রাতে র্যাব-২ এর একটি অভিযানে নারায়ণগঞ্জ জেলার ফতুল্লা থানার হাজীগঞ্জ এলাকায় আসামির বর্তমান ঠিকানা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলায় ১০ জনের মৃত্যু হয়। এ ঘটনার মামলায় ২০১৪ সালের ২৩ জুন হরকাতুল জিহাদের শীর্ষ নেতা মুফতি হান্নানসহ ৮ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৬ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন বিচারিক আদালত। এর আগে ২০০০ সালের ২০ জুলাই গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় জনসভাস্থলে বোমা পুঁতে রেখে শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়। ওই মামলায় ১৪ জঙ্গিকে মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত।
র্যাব সূত্রে জানা যায়, এই দুই মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে ছিলেন মুফতি আবদুল হাই। এ ছাড়া ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে গ্রেনেড হামলা মামলার যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি তিনি।
২০০০ সালের ২০ জুলাই কোটালীপাড়ায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমাবেশস্থলের পাশে ৭৬ কেজি ওজনের বোমা পুঁতে রাখা হয়। শেখ লুৎফর রহমান মহাবিদ্যালয়ের উত্তর পাশের একটি চায়ের দোকানের পেছনে এ বোমা বিস্ফোরণের মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এ ঘটনায় তৎকালীন কোটালীপাড়া থানার উপ-পরিদর্শক নূর হোসেন একটি মামলা দায়ের করেন।
পরে ২০১৭ সালের ২০ আগস্ট এ মামলায় ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারক মমতাজ বেগম ১০ জঙ্গির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দেন। আদালত ফায়রিং স্কোয়াডে প্রত্যেকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আদেশ দেন। এ ছাড়াও চার আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন।
অন্যদিকে ২০০১ সালে পহেলা বৈশাখে রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা বিস্ফোরণে ১০ জন নিহত ও ২০ জন আহত হন। এরপর ওই ঘটনায় নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ির সার্জেন্ট অমল চন্দ্র রমনা থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে পৃথক মামলা করেন। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০০৮ সালের ২৯ নভেম্বর হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি আবদুল হান্নানসহ ১৪ জনকে অভিযুক্ত করে সিআইডির পরিদর্শক আবু হেনা মো. ইউসুফ আদালতে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
২০১৪ সালের ২৩ জুন হত্যা মামলাটির রায় ঘোষণা করেন ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত। রায়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত হরকাতুল জিহাদের শীর্ষ নেতা মুফতি আবদুল হান্নান, মুফতি আব্দুল হাই, বিএনপি নেতা ও সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর ভাই মাওলানা তাজউদ্দিনসহ ৮ জনের মৃত্যুদণ্ড এবং ছয়জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়।









