জঙ্গিবাদের সঙ্গে ধর্মের বিশেষ করে বর্তমান বিশ্বে ইসলাম ধর্মের নামটা মিশে গেছে। পৃথিবীর দেশে দেশে যেখানেই জঙ্গি তৎপরতা আছে, সেখানেই সমান্তরালভাবে ইসলাম ধর্মের নামটাও সমার্থক হিসেবে উচ্চারিত হয়। জঙ্গিরা ইসলামের নাম করে, ইসলাম প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়ে সহিংসতা করে। কেবল এই কারণেই এটি হয়েছে, তা নয়। জঙ্গিদের এবং চরমপন্থী মৌলবাদীদের কর্মকাণ্ড নিয়ে মুসলিমদের বিশেষ করে ইসলামের পণ্ডিত ব্যক্তিরা, নেতারা যুগপৎভাবে রুখে দাঁড়াবার কোনো উদ্যোগ নেননি। পশ্চিমে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় কখনো কখনো ইমামদের, মুসলিম নেতাদের কিছু দল ধর্মের সহনশীলতার কথা বলেন। কিন্তু তীব্রভাবে তারা ‘জঙ্গিবাদ আর ইসলাম ধর্ম’ এর মধ্যকার ফারাকটুকু তুলে ধরেন না।
বাংলাদেশের দিকে তাকালেও কিন্তু একই চিত্র দেখা যায়। এই যে গুলশানের হলে আর্টিজান বেকারিতে হামলা করে এতোগুলো মানুষকে জবাই করে হত্যা করা হলো- তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ধর্মীয় নেতারা কি শক্তভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছেন? শোলাকিয়ায় ঈদের নামাজে যে হামলা হলো- তা নিয়ে মুসলিম ধর্মীয় নেতারা কি কোনো প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছেন? ইসলাম ধর্মকে অবলম্বন করে যারা রাজনীতি করেন- তারা? হেফাজতে ইসলাম নামের যে সংগঠনটি গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের মুসলমানদের ‘ইমান আকিদার স্বঘোষিত’ অভিভাবক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে- তারাও কিন্তু এ নিয়ে কথা বলেনি। ‘ইসলামের নাম ব্যবহার করে একদল দুর্বৃত্ত মানুষ খুন করবে, অথচ ধর্মীয় নেতারা তার বিরুদ্ধে জোড়ালো প্রতিবাদ করবেন না- এ কেমন করে হয়? অথচ এটিই এখন বাংলাদেশের বাস্তবতা।
আমরা বিভিন্ন সময় সরকারকেও আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছি। ‘ধর্মীয় চরমপন্থীদের প্রতি সরকার যথেষ্ট শক্ত হচ্ছে না- এই অভিযোগতো খোদ দলের মধ্যেও আছে। সরকারের মন্ত্রী, এমপি, ক্ষমতাসীন দলের নেতা এমন কি খোদ প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতা বিবৃতিতেও কখনো কখনো মনে হয়েছে- ধর্ম এবং ধর্মভিত্তিক যেকোন তৎপরতার প্রতি সরকারের বাড়তি স্পর্শকাতরতা আছে। ফলে শেখ হাসিনা যখন ‘মদিনা সনদের ভিত্তিতেই দেশ চলবে’ বলে ঘোষণা দেন- সেটি বছরের পর বছর ধরেই রাজনীতির সমালোচনার একটি উপাদান হয়ে থাকে। আমি নিজেও শেখ হাসিনার বক্তব্যের সূত্র ধরে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে মন্তব্য করে বলেছি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী- আপনি মুফতি নন- দেশের প্রধানমন্ত্রী।
কিন্তু, গুলশানের হত্যাকাণ্ড, শোলাকিয়ায় ঈদের জামাতে হামলার পর শেখ হাসিনার কিছু বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে নতুন করে কিছু বলতে হচ্ছে।
বলে নেওয়া ভালো, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কখন কোথায় কি বলেন- তা আমাদের জানতে হয় পত্রিকা পড়ে। দেশে যারা থাকেন, তারা টেলিভিশন দেখে তার বক্তৃতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেন। আমরা যারা প্রবাসে থাকি, বিশেষ করে আমার জন্য প্রিন্ট মিডিয়ার অনলাইন ভার্সন আর অনলাইন মিডিয়াই ভরসা। এই মাধ্যমের উপর ভরসা করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গুরুত্বপূর্ণ একটি বক্তব্য চোখ এড়িয়ে গেছে। ঠিক চোখ এড়িয়ে গেছে বলবো না, অধিকাংশ মিডিয়াই শেখ হাসিনার এই বক্তব্যটুকু তাদের রিপোর্টে রাখেনি। অথচ দেশের বর্তমান বাস্তবতায় শেখ হাসিনার এই বক্তব্যটুকুই হতে পারতো শিরোনাম, এই কথাগুলোই আরো বেশি গুরুত্বসহ মিডিয়ায় উপস্থাপিত হতে পারতো।
শেখ হাসিনার বক্তব্যটুকু বিডিনিউজ২৪ ডটকম এর ইংরেজী ভার্সন থেকে উদ্ধৃত করি। শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘জঙ্গিরা বলে থাকে- তারা মানুষের তৈরি আইন মানে না। তারা শরিয়া আইন প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকারাবদ্ধ। তারা যদি মানব সৃষ্ট আইন না মানে, তা হলে তারা তাদের লক্ষ্য বাস্তবায়নে মানবসৃষ্ট অস্ত্র, বোমা, কাপড়চোপড়, প্রযুক্তি ব্যবহার করছে কেন?’
শেখ হাসিনার এই বক্তব্যে দূরদর্শিতা আছে, তার রাজনৈতিক অবস্থান এবং ভাবনার প্রতিফলনও আছে। যারা শেখ হাসিনার ‘মদিনা সনদে দেশ চলবে’ বক্তব্যে বুঁদ হয়ে আছেন, তারা এখানে ভিন্ন শেখ হাসিনাকে পেতে পারেন। শরিয়া আইন নয়- রাজনৈতিক শাসনে, সংসদের তৈরি করা আইনে দেশ পরিচালনার প্রতি শেখ হাসিনার পক্ষপাত না থাকলে তিনি শরিয়া আইনের সঙ্গে মানবসৃষ্ট উপাদানের তুলনা তুলতেন না। শুধু তাই নয়, ধর্মের শাসন প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে বিভোর হয়ে থাকা মানুষগুলোর সামনে তিনি তাদের মানবসৃষ্ট উপাদানের উপর নির্ভরশীলতাটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে চেয়েছেন। শেখ হাসিনা বলতে চেয়েছেন- ধর্মের নাম করে তোমরা যে মানুষ মারার অভিযানে মত্ত হয়ে উঠেছো- সেটিও আসলে মানুষের মেধা ও ক্ষমতা নির্ভর। কাজেই তোমার আন্দোলনের চেয়ে, স্বপ্নের চেয়ে মানুষই হচ্ছে সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে বড় সত্য। কিন্তু মিডিয়ায় শেখ হাসিনার এই কথাগুলো চাপা পড়ে যাওয়ায় খানিকটা আড়াল হয়ে গেছে।
আমি মনে করি, জঙ্গি বিরোধী চলমান আন্দোলনে শেখ হাসিনার এই প্রশ্নটিই একটি শ্লোগান হিসেবে সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া দরকার। ‘হে জঙ্গি, তুমি যদি আল্লাহর আইনই প্রতিষ্ঠা করতে চাও, তা হলে মানবসৃষ্ট জিনিসপত্র ব্যবহার করো কেন? আর মানবসৃষ্ট জিনিসপত্রই যদি ব্যবহার করো- তা হলে মানুষ হত্যা করো কেন?’ এই প্রশ্নগুলো সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ুক। কে জানে- হয়তো এক সময় জঙ্গিদের মনেও এই প্রশ্ন জাগতে পারে!
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







