বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকা চুরির দায় নিজের উপর নিয়ে গভর্নর আতিউর রহমান পদত্যাগ করলেন। টাকাটা তো তিনি চুরি করেননি! তবে তিনি কেন পদত্যাগ করলেন?
হ্যাঁ, তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বময় কর্তা এবং এর পরিচালনার মূল দায়িত্ব তার ছিল। সুতরাং অন্য যে কেউই চুরিটা করুক, দায়িত্বটা তার উপর বর্তায়। তার দায়িত্বকালীন সময়ে দেশের রাজকোষ সমৃদ্ধ হয়েছে, জনগণের মাথাপিছু আয় বেড়েছে। গরিববান্ধব, বেকারবান্ধব অনেক ভালো ভালো সিদ্ধান্ত তিনি নিয়েছেন। যার প্রশংসাও তিনি পেয়েছেন। দায়িত্বের কেন্দ্রীয় ভূমিকায় থাকায় ভালো কাজের প্রশংসা যেমন তার তেমনি চুরির দায়ও তিনি এড়াতে পারেন না।
তিনি ভদ্রলোক তাই অপরাধ না করেও দায়িত্বে গাফিলতির দায় মেনে নিয়ে পদত্যাগ করেছেন।
তেমনি মন্ত্রী পরিষদের প্রধান হলেন প্রধানমন্ত্রী। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের জন্য মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রীদের নিয়োগ দেন তিনি। তাদের কাজ তদারকিও করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী যাকে চান মন্ত্রী বানান, আবার প্রয়োজনে অপসারণও করেন। প্রধানমন্ত্রীর মতের বিরোধিতা করলে মন্ত্রিত্ব হারানোর ভয়ও আছে!
অর্থাৎ, সর্বময় ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর হাতে। সুতরাং মন্ত্রী পরিষদ প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন বা নির্দেশনা ছাড়া পরিচালিত হয় না। কাজেই মন্ত্রীদের সকল ভালো বা মন্দ কাজে এবং তাদের দেয়া বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রীর মৌন থাকাকে তার সম্মতি বলেই ধরে নেয়া হবে।
মন্ত্রী পরিষদের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হিসেবে অন্য মন্ত্রীদের কাজের দেখভালের দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রীর। কাজেই মন্ত্রীদের সফলতা-ব্যর্থতার দায়দায়িত্বও প্রধানমন্ত্রীর উপর বর্তায়। মন্ত্রীদের দায়িত্বহীন কথা বা কাজের দায়ও প্রধানমন্ত্রী অস্বীকার করতে পারেন না।
দেশে খুন ধর্ষণের মহামারি চলছে। কিন্তু, ব্যর্থতার দায় দায়িত্ব না নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বরং এমন সব বিবৃতি লাগাতারভাবে দিয়ে যাচ্ছেন যাতে তার যোগ্যতা ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন জাগাটা মোটেও অমূলক নয়। সাধারণ মানুষ থেকে সচেতন ঘোর আওয়ামী সমর্থকরাও বিরক্ত ও বিব্রত হচ্ছেন।
কিন্তু, প্রধানমন্ত্রী তাতে কোনো হস্তক্ষেপ করেননি। যে কারণে আমরা যারা বঙ্গবন্ধুকে ভালবেসে বঙ্গবন্ধু কন্যাকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছিলাম তারা মর্মাহত। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর কন্যার কাছে এমন আচরণ একেবারেই প্রত্যাশিত নয়। বঙ্গবন্ধুর মতো বিশাল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের কন্যাকে মানায়ও না এসবে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি অনেক ভালো ভালো কাজ করেছেন। দেশকে কলঙ্কমুক্ত করার প্রয়াস নিয়েছেন, রাজাকারদের বিচার করছেন। তাই আপনার প্রতি আমাদের ভালবাসাও অগাধ। কিন্তু, রাষ্ট্রের সঙ্গে ধর্মকে মিলিয়ে যে অবস্থা, সেটা একটা চরম ভুল, যার মাশুল আমরা সাধারণ জনগণ দিচ্ছি। ঘরে বাইরে কোথাও আমাদের নিরাপত্তা নেই।
আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে আপনাকে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতেও দেখছি না। বরং ক্ষেত্রবিশেষে দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি আমাদের যেমন আতংকিত করেছে তেমনি চাপাতির মহড়াও বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণে!
বঙ্গবন্ধু যে অসাম্প্রদায়িক দেশের স্বপ্ন বুনেছেন, যে আদর্শের জন্য সংগ্রাম করেছেন, জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন- কন্যা হয়ে সেই আদর্শ থেকে আপনাকে বিচ্যুত হতে দেখে আমাদের বুক ভেঙ্গে যায়।
সরকার প্রধান হিসেবে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধান করা আপনার অন্যতম কর্তব্য। আপনি যদি সেটা না দিতে পারেন তাহলে আপনি কেন সরকার প্রধান থাকবেন!
আর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আপনার অন্যান্য মন্ত্রীর ব্যর্থতার দায়ভারও আপনার উপরই বর্তায়, আপনাকেই নিতে হবে। আপনি ক্ষমতা থেকে চলে যান সেটা আমরা চাই না। কারণ দেশের হাল ধরার মতো আর কে আছে? কার উপর আস্থা রাখা যায়?
দেশের ৯০% মুসলিম হলেও ৯০ ভাগই অসাম্প্রদায়িক মানসিকতার মানুষ। বাকি ১০ ভাগ লোককে খুশি করতে আপনি আমাদের জীবন কতটা অনিরাপদ করে দিচ্ছেন ভাবুন! ধর্মের নামে এদের হত্যাযজ্ঞকে বৈধতা দিয়ে আপনি মসনদ আঁকড়ে থাকতে পারবেন ভাবলে বিরাট ভুল করবেন। চোখ খুলুন প্লিজ প্রধানমন্ত্রী।
আপনাকে কতগুলো সাম্প্রদায়িক ধর্মীয় উন্মাদের রক্ষক রূপে আমরা দেখতে চাই না। পিতার মতো দেশকে, দেশের মানুষকে ভালবেসে একটি গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক সোনার বাংলা গড়ার বলিষ্ঠ নেত্রীরূপে আপনাকে দেখতে চাই। আমাদের ভালবাসার অবমূল্যায়ন করবেন না এখনো সেই আশা করি।
আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। আমরা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাকে আর একটি পাকিস্তান বানাতে কিছুতেই দেবো না, কোনো কিছুর বিনিময়েই না।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)









