ইতিহাসটি ১৯৯৮ সালের। কয়েকজন গানপ্রিয় শিক্ষার্থী চিন্তা করলেন, ক্যাম্পাসে এমন একটি সংগঠন গড়ে তোলা প্রয়োজন যেখানে চিরায়িত বাংলার গান গেয়ে মানুষকে শুদ্ধ সংস্কৃতিচর্চার দিকে আহ্বান জানানো হবে।
এমন চিন্তা থেকেই সেই ইতিহাসের রচিত হয়েছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে, যে ইতিহাসের নাম- জয়ধ্বনি সাংস্কৃতিক সংগঠন।
যিনি আজ থেকে ২০ বছর আগে সেই শুদ্ধ চিন্তার খোরাক যুগিয়েছিলেন তার নাম -সুজন শর্মা। ভূগোল বিভাগের শিক্ষার্থী, জগন্নাথ হলের আবাসিক ছাত্র এবং কক্সবাজারের অন্যতম প্রগতিশীল শহর রামুর কৃতি সন্তান। তার হাত ধরেই এই শুদ্ধ সংস্কৃতি চর্চার সংগঠনের যাত্রা শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।
২০ বছর পর এসেও আজকে জয়ধ্বনি প্রতিধ্বনিত করছে আকাশ বাতাস, গানে-গুণে বিমোহিত করছে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের ছাত্রছাত্রীদের।
দেখতে দেখতে ২০১৮ সালের, ৩০ নভেম্বর সংগঠনটি ২০ বছর পূর্তি পালন করে ফেললো। এই দিন সন্ধ্যায় টিএসসির সুইমিংপুল চত্বরে জয়ধ্বনি’র শিল্পিদের সমবেত কন্ঠে ‘ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা’ গানের মাধ্যেমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. নাসরীন আহমেদ। জয়ধ্বনি’র সভাপতি সাব্বির হোসেন এর সঞ্চালনায় জয়ধ্বনির শুরুর গল্পটি শুনান প্রতিষ্ঠাতা সুজন শর্মা। তার নেতৃত্বে ১৯৯৮ সালের ৩০ নভেম্বর যে স্বপ্নের বীজ বোনা হয়েছিলো সেই বীজটি এখন ২০ বছরের টগবগে ও সজীব বৃক্ষে পরিণত হয়েছে। এখন ক্যাম্পাসে গানে গানে দ্যূতি ছড়িয়ে চলেছে জয়ধ্বনি, জয়ের ধারায় প্রবাহিত করছে চিরায়িত বাংলা সংস্কৃতিকে।
২০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য প্রদীপ কুমার নন্দী, সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান শিশির, সাবেক সাধারণ সম্পাদক দেবাশীস রঞ্জন সরকার, সাবেক সাধারণ সম্পাদক দেবাশিস ব্যাপারি, সাবেক সাধারণ সম্পাদক অন্তরা বিশ্বাস, সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাশেদুল ইসলাম টুটুল, সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাকিবুল হাসান রাকিব ও আরো সাবেক এবং বর্তমান সদস্যবৃন্দ।
এসময় গানের সুরে, শীতের পিঠাপুলি, খেলাধুলা ও রাফেল ড্র এর মধ্য দিয়ে আনন্দমুখর হয়ে উঠে অনুষ্ঠান।
সারা বছরব্যাপী জয়ধ্বনি তার কার্যক্রম চালিয়ে যায় মুলত দিবস কেন্দ্রিক ও নিয়মিত অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। ২১ ফেব্রুয়ারিতে ভাষা শহীদ দিবস, ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস, ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী দিবস, ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস এবং নজরুল জয়ন্তি, রবীন্দ্র জয়ন্তি অনুষ্ঠানের আয়োজন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়োজিত অনুষ্ঠান এবং আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় জয়ধ্বনি অংশগ্রহণ করে থাকে।
এছাড়া বছরে তিনটি অনুষ্ঠান জয়ধ্বনি সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে নিয়মিত আয়োজন করা হয়—যথা-জাতীয় পতাকা উৎসব (২০১১ সাল থেকে পরবর্তী চার বছর) যা গত তিন বছর যাবত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আয়োজন করছে, চৈত্র সংক্রান্তি উৎসব (প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত), এবং তিন জয়ধ্বনি’র শরৎ উৎসব।

সংগঠনের সদস্যদের নিয়ে প্রতি তিন মাসে একটি করে শ্রোতার আসর আয়োজন এবং জয়ধ্বনির অন্যতম সদস্যদের নিয়ে বাৎসরিক গানের অনুষ্ঠান আয়োজন করে থাকে, যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগীত শিল্পী তৈরীতে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করে।
সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের পাশাপাশি, জয়ধ্বনি সাংস্কৃতিক সংগঠন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে প্রতিবছর শীতকালে শীতার্তদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ করে থাকে এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে দেশের নানা দুর্দিনে আন্দোলনে স্বরব উপস্থিতি বজায় রাখে।
জয়ধ্বনি সাংস্কৃতিক সংগঠনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শুদ্ধ উচ্চারণ, বাচিকভঙ্গি ও আবৃত্তি প্রশিক্ষণ কর্মশালা, সঙ্গীত প্রশিক্ষণ কর্মশালা, গীটার ও বাদ্যযন্ত্র প্রশিক্ষণ কর্মশালা’র মাধ্যমে তাদের বাংলা সংস্কৃতির প্রতি অনুরাগ ও দায়বদ্ধতা পূরণ করতে হচ্ছে।
এই সংগঠনের পক্ষ থেকে ২০১২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের পাদদেশে ১৯৭১ সালের ২ মার্চ যেখানে প্রথম বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়েছিল, সেখানে একটি ২৪০ বর্গফুট রঙিন ম্যুরাল ‘সংগ্রামী চেতনা’ নির্মাণ করা হয়েছে, যেটি জয়ধ্বনির গৌরবের এক অনন্য নিদর্শন।
এভাবে জয়ধ্বনি এগিয়ে যেতে চায়। সকল অন্ধকারের বুক চিড়ে এগিয়ে নিতে চায় বাংলাদেশের শুদ্ধ সংস্কৃতি চর্চার ধারাকে, এগিয়ে নিতে চায় মুক্তিযুদ্ধের এই বাংলাদেশকে।








