“যদি কোন দেশ দুর্নীতি মুক্ত হয় এবং সবার মধ্যে সুন্দর মনের মানসিকতা গড়ে ওঠে, আমি দৃঢ়তার সঙ্গে বিশ্বাস করি, সেখানকার সামাজিক জীবনে তিন রকম মানুষ থাকবে, যারা পরিবর্তন আনতে পারেন। তারা হলেন পিতা-মাতা ও শিক্ষক।” – ভারতের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি ও বিজ্ঞানী এ.পি.জে আব্দুল কালামের এই উক্তি মাথায় নিয়েই অনলাইনে একটা নিউজ দেখে হঠাৎ থেমে যেতে হলো।
নিউজটি করেছে দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় সংবাদ পত্রিকা। শিরোনামটি ছিল “অন্বেষণের ৩০ ঘণ্টা অ্যাম্বুলেন্স এর শব্দে ভারী হচ্ছে শাবিপ্রবি ক্যাম্পাস ”। গত বেশ কিছুদিন যাবৎ দেশের উচ্চশিক্ষার জন্য প্রসিদ্ধ অন্যতম বিশ্ববিদ্যালয় হযরত শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা হচ্ছে সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম। একজন সচেতন মানুষ হিসেবে বিষয়টি আমাকে ভাবাচ্ছে। শাবিপ্রবি ক্যাম্পাসে চলমান আন্দোলনের কিছু ঘটনা খুবই দুঃখজনক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন আহমেদের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন একটি অদ্ভুত পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। নিজেদের ক্যাম্পাসের মধ্যে পুলিশের দ্বারা যে নিষ্ঠুরতার শিকার শিক্ষার্থীরা হয়েছে তা কোনো বিবেকবান মানুষ মেনে নিতে পারে না। এই আন্দোলন শাবিপ্রবির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিনের একটি ফোন আলাপ ইতিমধ্যে অনলাইনে ভাইরাল হয়েছে যেখানে তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের নিয়ে একটি বাজে মন্তব্য করেছেন। যা নিয়ে আবার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেছে। কিন্তু এই সবকিছুর কারণ কি? এই ঘটনা কি নিছক উপাচার্যের সাথে ছাত্র-ছাত্রীদের দাবিদবা নিয়ে মতবিরোধের ঘটনা? নাকি এর সাথে থাকতে পারে শিক্ষক সমিতি তথা রাষ্ট্রের নোংরা রাজনীতি!
এই বিষয়ে শিক্ষক রাজনীতি কেমন যুক্ত থাকতে পারে সেটা অনুধাবন করার সুবিধার্থে আমার সাথে ঘটা আরেকটি ঘটনা শেয়ার করতে চাই। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ থেকে একটি তথ্য আমার আমার কাছে আসলো জানতে পারলাম একটি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান তার দায়িত্ব পালন করা কালে বিভাগ পরিচালনা করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দেওয়া বরাদ্দকৃত অর্থ বিশ্ববিদ্যালয় ফান্ড থেকে উত্তোলন করে নিজস্ব ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহার করেছেন তদন্ত করতে গিয়ে জানতে পারলাম তিনিই প্রথম নয়, এমন ঘটনা ইতিপূর্বেও ঘটেছে। এছাড়া বর্তমান একজন বিভাগীয় প্রধান দোকানদার সমিতির নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। এছাড়াও তিনি তার নিজ বিভাগে বসেই বই বিক্রি করেন। ভাবতে পারেন একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক দোকানদারদের নেতা হওয়ার প্রচেষ্টা করছে! ক্ষমতা ও অর্থের প্রতি এই অপ্রত্যাশিত লোভ একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের থেকে কি কোনভাবে জাতির কাছে প্রত্যাশিত? আমি যখন এই তথ্য অনুসন্ধানের প্রচেষ্টায় লিপ্ত তখন একটি বিষয় আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করল, শিক্ষকদের পক্ষে-বিপক্ষে ছাত্রদের অবস্থান। প্রতিটি শিক্ষকের সাথে আছে ছাত্রদের একটি সিন্ডিকেট। এই যে এই ছাত্ররা একজন অন্যজনের বিরুদ্ধি অবস্থানে আছে, এই শত্রুতার সাথে সরাসরি তাদের নিজেদের কোন স্বার্থ নেই। কিন্তু শিক্ষকদের মধ্যকার বিদ্যমান হীন্য স্বার্থ নিয়ে এই ছাত্ররা একজন অন্যজনের সাথে শত্রুতায় জড়িয়েছে। হয়ত এই ছাত্ররা পরস্পর পরস্পরের সাথে কোনদিন কোন ধরনের লেনদেনে জড়িত হয়নি। তবুও তারা একজন অন্যজনের শত্রুতে পরিনত হয়েছে। যা শিক্ষকরা না চাইলে হত না। এখানে একটি কথা মনে রাখা জরুরী শিক্ষকদের সাথে ঐ ধরনের ঘনিষ্টতা স্বাভাবিক ভাবে হয় না, যখন উক্ত শিক্ষক অনৈতিক কাজে জড়িত হয়, তখন ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে তাদের এই মাত্রা ছাড়া সম্পর্ক তৈরি হয়। একজন শিক্ষক
হয়তো বিভাগীয় প্রধান হতে চলেছেন কিন্তু অন্য একজন শিক্ষক বিভাগীয় প্রধান হতে চান তখন তিনি মনোনয়ন পাওয়া ঐ শিক্ষকের বিরুদ্ধে তার প্রিয় ছাত্রদের কাছে উক্ত শিক্ষকের সকল ধরনের দুর্বলতা ও অযোগ্যতার ফিরিস্তি তুলে ধরেন। তাই যখন একজন শিক্ষককে কিছু ছাত্র-ছাত্রী নায়ক মনে করেন, ঠিক তখনি কিছু ছাত্র ছাত্রী উক্ত শিক্ষক কে মনে করেন খলনায়ক। আমি যখনই যে শিক্ষকের অপকর্মের তদন্ত করতে গিয়েছি তখনই উক্ত শিক্ষকের অনুগত ছাত্ররা আমাকে হুমকি দিয়েছে, একই ভাবে সহোযোগিতা করেছে ঐ শিক্ষকের বিরোধী অনুগত ছাত্ররা। কিন্তু আশ্চর্য বিষয় এখানে কোন নৈতিকতা নেই, নেই কোন বিবেক কিংবা দায়িত্ববোধ আছে শুধু স্বার্থের চিন্তা। পরবর্তীতে আরও তথ্য অনুসন্ধান করতে গিয়ে লক্ষ করলাম শুধু অর্থনৈতিকভাবেই তারা অসৎ নয়, তারা চারিত্রিক ভাবেও নিকৃষ্টতর অসৎ। একজন শিক্ষকের স্ত্রী অভিযোগ করেন তার স্বামীর সহোকর্মী অপর একজন শিক্ষক তাকে যৌন হয়রানি করেছেন। যা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে মিটিং পর্যন্ত হয়েছে। ইতিমধ্যে আমার কাছে আসতে থাকে অসংখ্য ফোন তথা পরোক্ষ হুমকি এখানে একটি বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চায় শিক্ষকদের এই সকল অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে সকল দুর্নীতিগ্রস্ত শিক্ষকদের শাস্তির জন্য তৎপরতাও যেমন শিক্ষার্থীদের। তাদের কে রক্ষা করার তৎপরতাও শিক্ষার্থীদের মধ্যো থেকেই। অথচ এই বিষয়ে তদারকি করার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষ আছে। আছে আইন আছে শৃঙ্খলিত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শিক্ষক সমিতি। কিন্তু শিক্ষকদের এই ব্যক্তিগত স্বার্থ দ্বন্দে জড়িয়ে পড়েছে আমাদের শিক্ষার্থী ভাই-বোনেরা। এখন আবার (শাবিপ্রবি)র আন্দোলন প্রসঙ্গে আসি, উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছে। গত কয়েকদিনে ঘটে যাওয়া ঘটনায় নৈতিকভাবে উপাচার্যের উক্ত পদে থাকা খুবই কঠিন বিষয়। এই ফরিদ উদ্দিন আহমেদ এর বিষয়ে বলতে গিয়ে ছাত্র-ছাত্রী বলছে, একজন মাস্টার্স পাশ উপাচার্যের তাদের কোন প্রয়োজন নেই। এখন এই আন্দোলন কে কেন্দ্র করে গত বুধবারে (১৯) শিক্ষকদের পক্ষ থেকে একটি মানববন্ধন হয়েছে যেখানে একজন ড. শিক্ষকের বক্তব্য দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. লায়লা আশরাফুন বলেন, “আমরা সাধারণ শিক্ষক। আমরা সম্মানের জন্য কাজ করি এবং সম্মানের জন্যই এ পেশায় এসেছি। আমরা চাষাভুষা নই যে, আমাদের যা খুশি তাই বলবে ”।
শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপেক্ষিতে যদি এই মাস্টার্স পাশ উপাচার্যের জায়গায় একজন ড. উপাচার্য আসেন এবং তিনি যে কিনা চাষীদের মানুষ মনে করেন না, তাহলে চাষার সন্তান শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র মনে করবেন কিনা সেটাও বিবেচনাতে আনা উচিত হবে বলে মনে হয়। তাই উপাচার্য পদের জন্য মাস্টার্স পাশ বড় অযোগ্যতা মনে করা কি সঠিক হবে? একই সাথে এই উপাচার্য যদি পদত্যাগ করেন তবে কেমন উপাচার্য শিক্ষার্থীরা চায় সেটাও তাদের বলা উচিত।
যায় হোক ঘটনার ভিতরে যায় থাকুক না কেন, ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষকদের কে জাতি মুখোমুখি দেখতে চাই না। তাদের কে দেখতে চায় পিতা-পুত্রের ন্যায়। পিতা-মাতা যেমন তাদের সন্তানদের বটছায়া তলে রেখে ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জন্য তৈরি করেন, শিক্ষকগণ দেরও উচিত অনুরুপ ভাবে শিক্ষার্থীদের তৈরি করা। একইভাবে শিক্ষার্থীরা তাদের নিজেদের পিতামাতা কে যেনটি সম্মান করে নিজের জীবন উৎসর্গ করেন তেমনটি শিক্ষকদের জন্যও করা উচিত।
সর্বশেষ, হেনরি এডামস এর একটি উক্তি সবাই কে স্মরণ করাতে চাই, “একজন শিক্ষক সামগ্রিকভাবে প্রভাব ফেলে, কেও বলতে পারে না তার প্রভাব কোথায় গিয়ে শেষ হয়।”
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








