কিছুকাল একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে সংযুক্ত ছিলাম এই জীবন পরিক্রমায়। সে সময়কালে ১৯৮১ সনে স্বীয় বাহিনীরই একাংশের হাতে প্রাণ হারালেন একজন জাঁদরেল কঠিন হৃদয়ের শাসক জেনারেল পরিচিত, জিয়াউর রহমান। আরেক সেনাপ্রধান সব কলকাঠি নাড়িয়ে নিভৃতে এসে বসলেন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে। সম্মুখে নানারূপ বিচারপতি।
জিয়া হত্যাকাণ্ডের কয়েকদিন পরই একটি সামরিক জীপ এসে আমাকে তুলে নিল, না; চোখ বেঁধে নয়। খোলা চোখ, খোলা জানালা, গুমোট হাওয়া। কিছুক্ষণ পরই বুঝে নিলাম মর্মকথা। আমাদের নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ঢাকা সেনানিবাসে ‘সেনা কারাগার’ তৈরির কাজ চলছিল। কাজ বাকী কয়েক মাসের। ওটা একমাসেই শেষ করে দিতে হবে। প্রকল্পটির দায়িত্বপ্রাপ্ত হিসাবে আমাকে চব্বিশ ঘণ্টা ওখানে থাকতে হবে। সঙ্গে থাকবেন একজন মেজর, সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে।
চব্বিশ ঘণ্টা কী আর কাজ থাকে! অতএব মেজরের সঙ্গে একজন সিভিলিয়ানের একথা সেকথা। সেনাবাহিনীর রণকৌশল-রণনীতি সম্পর্কে অবহিত এক ঠান্ডা মাথার মেজর।
পাকিস্তান আমলেও যা, বাংলাদেশ আমলেও তা। সেনাবাহিনীর প্রতিপক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে উচ্চ আদালত আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কোনোভাবেই বাগে আনা যাচ্ছে না। জেনারেল এরশাদ আটঘাট বেঁধেই নেমেছেন। দেখবেন, কয়েক মাসের মধ্যেই কয়েকজন বড় বড় ছাত্রনেতা, ডাকসু নেতা আমাদের জালে ধরা পড়ছেন। জানতে চাইলাম, সেনাকারাগার তৈরিতে এতো তাড়াহুড়া কেন? নির্মাণের গুণাবলী রক্ষাতো কঠিন হয়ে যাচ্ছে। আমার দিকে ঠান্ডা, প্রশান্ত দৃষ্টি ফেলে মেজর বললেন, সেটা আমিও জানিনা। আপনারও জানার ঔৎসুক্য না থাকাই ভালো।
পাকিস্তান আমলেও যা, বাংলাদেশ আমলেও তা। সেনাবাহিনীর প্রতিপক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে উচ্চ আদালত আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কোনোভাবেই বাগে আনা যাচ্ছে না। জেনারেল এরশাদ আটঘাট বেঁধেই নেমেছেন। দেখবেন, কয়েক মাসের মধ্যেই কয়েকজন বড় বড় ছাত্রনেতা, ডাকসু নেতা আমাদের জালে ধরা পড়ছেন। জানতে চাইলাম, সেনাকারাগার তৈরিতে এতো তাড়াহুড়া কেন? নির্মাণের গুণাবলী রক্ষাতো কঠিন হয়ে যাচ্ছে। আমার দিকে ঠান্ডা, প্রশান্ত দৃষ্টি ফেলে মেজর বললেন, সেটা আমিও জানিনা। আপনারও জানার ঔৎসুক্য না থাকাই ভালো।যতটুকু জানতাম, এই আর্মি প্রিজনের নকশা ইত্যাদি জার্মানি থেকে জেনে শুনে বুঝে এনেছেন ব্রিগেডিয়ার নওয়াজেশ। সে নকশা অনুযায়িই আমাদের কাজ। তারপর কয়েক মাস পরে জানলাম, ওই কারাগারে জেনারেল এরশাদ ‘জিয়া হত্যার’ দায়ে যেসব ‘জিয়া অনুগত’ সামরিক অফিসারদের ফাঁসি দেবার ব্যবস্থা করেছেন, নওয়াজেশ সাহেব ছিলেন তাদের অন্যতম।
ফিরে যাই একাত্তরের সামরিক রণাঙ্গণে। বেতিয়ারা লড়াইয়ের পর পুণরায় দেশে প্রবেশের প্রস্তুতির জন্য আমরা সীমান্তে চোত্তাখোলার কাছে। সেখানে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা। বললেন, ‘দেশতো দ্রুতই স্বাধীন হবে। বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তান জীবিত ফেরৎ দেবেনা। তাজউদ্দিনের সিভিলিয়ান সরকার ধ্বংসপ্রাপ্ত দেশ চালাতে পারবেনা। কাজেই সেনাবাহিনীকেই স্বাধীন দেশে প্রথম থেকেই ক্ষমতা হাতে নিতে হবে’। শিহরিত চমকে গেলাম। সেই পুনঃপাকিস্তানি রাজনীতি-চক্র।
পরে দেখলাম; মুক্তিযুদ্ধপন্থীই বলুন আর বিরোধীই বলুন, বাংলাদেশের শুরুতে বলতে গেলে সকল সামরিক কর্তারই ক্ষমতার প্রশ্নে একই চিন্তা। নো ব্লাডি সিভিলিয়ান সরকার। বঙ্গবন্ধু আশ্চর্যজনকভাবে জীবিত ফিরে আসায় সেনাদূর্গে অনেকের বাড়া ভাতে ছাই পড়লো। তবুও বঙ্গবন্ধু সরকার দেশি বিদেশি অপতৎপরতায়, নানা কারণে যতো দুর্বল হতে থাকলো, সেনাদূর্গে গোঁফে তা দেবার সেনাকর্তারা ততো উজ্জীবিত হতে থাকলো। ওদিকে মূল কিসিঞ্জারি চালে সেনাদূর্গে বিষাক্ত গোখড়ো চুপিসারে গোপন গর্ত গড়ে তুললো।
বিশাল জনপ্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু এসব গোখড়ো টোখরোকে পাত্তাই দিতেন না, ওদের ছোবল ক্ষমতাকে তুচ্ছজ্ঞান করে একপ্রকার নিরাপত্তাহীনভাবে সপরিবারে প্রাণ দিলেন। সেই থেকে সেনাদূর্গের অমোঘ প্রত্যক্ষ কর্তৃত্ব চললো টানা পনেরো বছর। দূর্গের ভিতরে কোন্দল, রক্তপাত, ষড়যন্ত্র- এসব চললেও ঘুরে ফিরে সামরিক দুই জেনারেলই কড়া হাতে শাসন চালালেন। দুই জেনারেলের হাতেও মার্কিনী সিআইয়ের কর্মনির্দেশিকাপত্র, ম্যানুয়াল।
বিরাজমান ডান-বাম-মধ্যমার্কা রাজনীতিকদের টোপ প্রলোভনে চরিত্র বিনষ্ট করো, মেধাবী ছাত্রদের ‘হিজবুল বাহার’ মার্কা চমক উপহারে ফাঁদে ফেলো ঐতিহ্যবাহী ছাত্র আন্দোলনকে নানা কৌশলে সশস্ত্র-সন্ত্রাসী লাঠিয়াল প্রতিষ্ঠানে পরিণত করো, পাশাপাশি হুংকার আর দমননীতিতে বিচারালয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সুস্থ রাজনীতিকে পদতলে পিষ্ট করো। সেনাদূর্গ থেকে অবৈধ অনিয়মে, কুশলী ঔরসে ধাপে ধাপে রাজনৈতিক দলের জন্ম দিয়ে সিভিলিয়ান রাজনৈতির টুঁটি টিপে ধরো। রাজনীতিকে ডিফিকাল্ট করে দাও। মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা এবং ইতিহাসকে স্লো-ফাস্ট পয়জনিং এ চিরতরে বিনাশ করে দাও নানারূপ ছলাকলায় মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের ভঙ্গিমায়-অভিনয় করে।
সেনাদূর্গের ক্ষমতা-দ্বন্দ্ব ছাড়া এই দুই জেনারেলের কার্যধারা প্রকরণ পদ্ধতিতে তেমন কোন পার্থক্য ছিলোনা। দুই জেনারেলের রাজনৈতিক দল দুটির ছোট-বড়-মাঝারি কর্তাদের পকেট টইটম্বুর হয়ে গেলো। বিপরীতে প্রধান সিভিলিয়ান দলটির সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের কার্যত পকেট ফাঁকা। ১৯৯১ সনের নির্বাচনের মাঠে জিতে গেলো টাকাওয়ালারাই। এর পরই দেশের রাজনীতিতে ঘটে গেলো বিরাট সর্বনাশ। প্রধান সিভিলিয়ান দলটির মূলনীতিতে ত্যাগী নেতার বদলে মালপানিওয়ালা ভোগী নেতাদের নির্বাচনে মনোনয়ন প্রাপ্তি সহজ হয়ে গেলো। জেনারেল জিয়া সেই যে রাজনীতি ডিফিকাল্ট করে দেবার সিআইএ ম্যানুয়েল প্রয়োগ করেছিলেন, সেটাই অবশেষে সফল হয়ে দেশের রাজনীতির মর্মবস্তুকে দূষিত করে দিলো।
আজ দেশ জুড়ে বিশেষতঃ ক্ষমতাসীন রাজনীতির প্রায় সর্বাঙ্গ জুড়ে টাকার দাপট। যে টাকা কার্যতঃ অবৈধ উপায়ে অর্জিত। ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ আজ ব্যবসা পণ্যে রূপান্তরিত হয়ে গেছে- এ কথা বলে ধানমন্ডি রবীন্দ্র সরোবরের পাশে বসে কপালে হাত চাপড়ানো ত্যাগী নিষ্ঠাবান নিষ্ক্রিয় আওয়ামী লীগ অনুসারীকে প্রত্যক্ষ করে কষ্ট পাই।
সেনাদূর্গের অবৈধ ঔরসে জন্ম নেয়া দু-দু’টি রাজনৈতিক দলের নানারূপ ‘গণতন্ত্র ও দুর্নীতি’ বিষয়ক ছবকে তাই আমোদিত হই।এই দু’টি দল গঠনেরই উদেশ্য কার্যত সফল হয়ে গেছে।রাজনীতির প্রতি যোগ্য ও মেধাবী তরুণ প্রজন্মের আগ্রহ ক্রমশ কমে যাওয়ার মতো কঠিন বাস্তবের সম্মুখীন আমরা।
অথচ এই জেনারেল জিয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দখল অভিযানে স্বয়ং যেদিন মাঠে নেমে এলেন, ছাত্র আন্দোলনের একদল সাহসী অগ্রসেনা তার চলার পথে শুয়ে পড়ে মানব ব্যারিকেড গড়ে তুলেছিলো সত্তরের দশকেই। সে তরুণদের অন্যতম মুখপাত্র হুংকার দিয়ে বলেছিল, ‘জিয়া, আমরা তোমার শাসনামলকেই বরং ডিফিকাল্ট করে দেবো’। আজ ২০ ফেব্রুয়ারি। ২০০০ সনের ২০ ফেব্রুয়ারি মাত্র ৪৯ বছর বয়সে সেই সাহসী ছাত্রনেতা কাজী আকরাম হুসেন পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন।
সামরিক শাসনবিরোধী ষাট-সত্তর-আশির দশকে কয়েকটি সামরিক শাহীকে গদিচ্যুত করতে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বীরত্বপূর্ণ ছাত্র সংগ্রামের বীর নেতাকর্মীদের জানাই অভিবাদন। ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত সামরিক জেনারেলদের অব্যাহত দমন-নির্যাতন-হত্যাকাণ্ড-জেল-জুলুম, বিশেষতঃ বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতাকে বর্বর হত্যার মধ্য দিয়ে এদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে, রাজনীতিকে দুর্বল করে দেয়া হয়েছে। অঢেল পরিকল্পিত টোপ-প্রলোভন রাজনীতিকে কার্যতঃ ক্যান্সারের শিকারে পরিণত করেছে।
জেনারেল জিয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে সামরিক কণ্ঠে লেকচার দেবার সময়, একজন সাহসী শিক্ষক নেতা তার প্রতিবাদে গর্জে উঠেছিলেন। জিয়ার চোখ পড়লো। সেই সাহসী বঙ্গবন্ধুপন্থী নেতাটি আজ বিএনপি রাজনীতির প্রধান পংক্তিতে, দাউদকান্দির সেই ডক্টরেট- অধ্যাপক শত শত কোটি টাকার অধিপতি হিসেবে সে অঞ্চলের গণমানুষের কাছে পরিচিত। ১৯৯০ সনে এরশাদবিরোধী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতাদের মধ্যে ছাত্রলীগ মহাশার্দুল এবং ছাত্র ইউনিয়ন নীতিনিষ্ঠ তারকা দু’জনেই আজ মহান জিয়ার মহান অনুসারী। আরেক স্বপ্নবান বাম ছাত্রনেতা একসময় ছিলেন কাজী জাফরের ডানহাত, এখন জরুরি অবস্থার ‘সংস্কারের’ তোপে জিয়া বাহিনীর পরিত্যক্ত সেনা। এসব কিছুই জেনারেল জিয়া-এরশাদের রাজনীতি ‘ডিফিকাল্ট’ করে দেবার প্রকল্পের ফলাফল। জেনারেল এরশাদ ক্ষমতার শুরুতেই বগলদাবা করে নিয়েছিলেন সেসময়কার ডাকসু তারকা জিয়াউদ্দিন বাবলুকে বিশাল টোপে। তারপর এক-এগারোর জাতীয়-আন্তর্জাতিক তেলেসমাতিতে আরেক জেনারেল মঈন ‘পাম গাছ ও আলুর ব্যবহার’-ব্রান্ডিং নিয়ে ‘দল গঠন ও রাষ্ট্রপতি হবার পাঁয়তারা’ শুরু করেছিলেন। বেচারার স্বপ্নটি কার্যতঃ চুরমার করে দিয়েছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামরিক শাসনবিরোধী ঐতিহাসিক ছাত্রবিদ্রোহ। ঐ বিদ্রোহের নেতারাও জাতীয় রাজনীতিতে নিষ্ঠাপূর্ণ অংশ নিতে পারলো কী?
সামরিক শাসনের তাকবিন্দু সফল হয়েছে। কাজী আকরামদের সামরিক শাসনবিরোধী বিদ্রোহের ধারা রাজনীতিতে খাত করে নিতে পারেনি। বরং ছাত্র আন্দোলন-সংগঠন এখন প্রকৃত লাঠিয়াল চরিত্র পরিগ্রহ করেছে। সন্ত্রাস-মালপানির ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে আদর্শের ভান্ডার সমূহ। নিষ্ঠাবান বাম-গণতান্ত্রিক-অসাম্প্রদায়িক শক্তিও সফল হতে পারেনি।সাম্প্রদায়িক-মুক্তিযুদ্ধবিরোধী যুদ্ধাপরাধী গোষ্ঠী এমনি পরিস্থিতিতে কিভাবে কেমন করে গোখড়ো ছোবল দেবে, সে আশংকা চারপাশে। অভাবনীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নধারা এবং প্রযুক্তিসমৃদ্ধ উদীয়মান তরুণসমাজ- শুধু এইটুকু ব্যারিকেডে ওই একালের ভয়ংকর জঙ্গীবাদ ও মোল্লাতন্ত্রের আরো ভয়ংকর গোখড়ো আঘাতকে ঠেকানো যাবে কি?
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)







