জ্যাকসন ফলম্যান আজও বাম পা’টা ঠিকমত নাড়াতে পারেন না। তারপরও স্বপ্ন দেখছেন আবারও ফুটবলে ফেরার। মূলধারার ফুটবলে ফেরা হবে না আর কখনো। তাই কৃত্রিম পায়ে খেলতে চান প্যারা অলিম্পিকে। দুর্ঘটনায় পা হারিয়েছেন, সেজন্য তো স্বপ্ন দেখতে দোষ নেই!
ফলম্যানের মতই আকাশছোঁয়া স্বপ্ন তার সাবেক দল শাপোকোয়েন্সের। গত বছর এমন সময়ে সবকিছু হারিয়ে প্রায় পাগলপারা হয়ে গিয়েছিল দলটি। ক্লাবের জন্য ইতিহাস লিখতে গিয়ে নিজেরাই ট্র্যাজেডির ইতিহাস হয়ে গিয়েছিলেন দলটির ফুটবলাররা।
২০১৬ সালের ২৮ নভেম্বর, নিজেদের ক্লাব ইতিহাসে প্রথমবারের মত কোপা সাউদামেরিকানার ফাইনাল খেলতে কলম্বিয়া যাচ্ছিলেন ব্রাজিলিয়ান ক্লাব শাপোকোয়েন্সের ফুটবলাররা। গন্তব্য থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে থাকতে মেডিলিনে আছড়ে পড়ে লা মিয়া-২৯৩৩ বিমানটি।
বিমানে থাকা ৭৭ জনের মধ্যে ৭১ জনই ঘটনাস্থলে প্রাণ হারান, যার মধ্যে শাপেকোয়েন্সের ১৯ ফুটবলার ছিলেন! পরে আহত অবস্থায় মারা যান নিয়মিত গোলরক্ষক ড্যানিলো। বাকিদের মধ্যে দলের অফিসিয়াল ছিলেন। ছিলেন ক্লাবকে বদলে দেয়া কিংবদন্তি কোচ কাইয়ো জুনিয়রও।
যে ফাইনাল খেলতে গিয়ে এভাবে সতীর্থদের প্রাণ হারাতে দেখেছিলেন, ফলম্যান ঘুমের ঘোরে আজও সেই ফাইনালের স্বপ্ন দেখেন। নিয়মিত একাদশে জায়গা না পেলেও এই গোলরক্ষকের কাছে অ্যাটলেটিকো ন্যাশিওনালের সেই ফাইনাল হতে পারতো ক্লাবের মোড় ঘুরিয়ে দেয়া অন্য এক ইতিহাস।
‘আমি যদি বলি সেই ফাইনাল আমার মাথায় নেই তাহলে মিথ্যা বলা হবে। আমি আজও স্বপ্ন দেখি ন্যাশিওনালের মাঠে আনন্দে হাঁটছি। কল্পনা করি দারুণ একটা জয় পেয়েছি আমরা। বিশ্বাস করুন, খেলতে পারলে কিন্তু ম্যাচটা আমরাই বের করে নিয়ে আসতাম। আমরা কিন্তু অন্যের মাঠেও খুব ভাল খেলতাম।’

কথায় কথায় নিয়মিত গোলরক্ষক ড্যানিলোকে স্মৃতি থেকে বের করে নিয়ে আসেন ফলম্যান। যিনি আহত অবস্থায় পরে মারা যান। প্রাথমিক দুর্ঘটনায় বেঁচে গেছেন জেনে প্রথমেই ফোন দেন স্ত্রী, কন্যাকে। পরে আস্তে আস্তে ঢলে পড়েন মৃত্যুর কোলে।
ড্যানিলোকে নিয়ে এখনো শ্রদ্ধার কমতি নেই ফলম্যানের। যার জন্য নিয়মিত একাদশে সুযোগ পেতেন না; বিশ্বাস করেন সেই ড্যানিলো ঠিকই দলকে কলম্বিয়া থেকে জিতিয়ে নিয়ে আসতেন, ‘ড্যানিলো এখনো আমার মনেই বাস করেন। তিনি চারটি পেনাল্টি ঠেকিয়ে আমাদের ফাইনালে নিয়ে গিয়েছিলেন। ফাইনালে তিনিই আমাদের জেতাতেন।’
ফলম্যানের মত শাপোকোয়েন্সও বিশ্বাস করে তারা সত্যিই কলম্বিয়ায় কিছু একটা করে দেখাতে পারতো। দুর্ঘটনার শোক আস্তে আস্তে কাটিয়ে উঠছে ক্লাবটি। সান্তা ক্যাটারিনা প্রদেশ চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছে। প্রশাসনিক ভুল না থাকলে কোপা লিবার্তেদোরেসের ফাইনালেও থাকতে পারতো তারা। বার্সেলোনার সঙ্গে হুয়ান গাম্পার ট্রফিতেও খেলে গেছে মাস কয়েক আগে। একটি ধ্বংসস্তূপ থেকে কীভাবে নিজেদের গড়তে হয় সেটাই যেন দেখিয়ে দিচ্ছে ক্লাবটি।

কিন্তু যা হারিয়েছে তা কখনো ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। চিরতরে হারিয়ে যাওয়া খেলোয়াড়দের স্বজনরা বিশ্বাস করেন। এরপরও তারা শাপেকোয়েন্সের সঙ্গেই আছেন। আবার ক্ষোভ-আক্ষেপও আছে। দলটির এরিনা কোন্ডা স্টেডিয়ামে হাজারো সমর্থকদের সঙ্গে হাজির হয়ে দুর্ঘটনায় নিহতের অনেক স্বজন অভিযোগ করেছেন ক্ষতিপূরণের টাকা এখনো পাননি তারা। শাপোকোয়েন্স কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি সামাল দিতে আরেকবার আশ্বাস দিয়েছে, স্বজনরা দ্রুতই বুঝে পাবেন প্রাপ্য টাকা।
অনেককিছুই সামাল দিতে হচ্ছে শাপোকোয়েন্সকে। আসছে নানা বাধা। তারপরও মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানোর চেষ্টায় ব্রাজিলিয়ান ক্লাবটি। শোককেই শক্তি ভাবছে তারা। যারা হারিয়েছেন তারা ফেরত আসবেন না। কিন্তু যারা ভবিষ্যতে আসবে তাদের দিয়েই শাপোকোয়েন্স জায়গা করে নিতে চায় মানুষের মনে, টিকে থাকতে চায় ভালোবাসায়। আপাতত লাখো ফুটবলপ্রেমীর ভালোবাসার স্থানটিতে তারা তো জায়গা পাচ্ছেই।








