স্বাধীনতার পর আলাদা ভূখণ্ডের দাবিতে দেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার নৃ-গোষ্ঠীর মানুষেরা সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করে। ওই সংগঠনের নাম ছিল শান্তিবাহিনী। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে শান্তিবাহিনীর সঙ্গে শান্তি চুক্তি করে অশান্ত পাহাড়কে শান্ত করে। কিন্তু আজ প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে কতটা শান্তি প্রতিষ্ঠা হয়েছে পাহাড়ে?
১৯৯৭ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়িদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বন্ধ এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষে সম্পাদিত হয় শান্তি চুক্তি। এতে শান্তিবাহিনীর পক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির নেতা সন্তু লারমা চুক্তি সাক্ষর করেন। চুক্তির প্রায় গত দুই দশকেও পার্বত্য শান্তি চুক্তি বাস্তবে আশার মুখ দেখেনি। এখনও চুক্তির অধিকাংশ বিষয় কার্যকর করা যায়নি। এর মধ্যেই গত কয়েক বছরে পার্বত্য অঞ্চলে নতুন করে সহিংসতা দেখা দিয়েছে। এমনকি শান্তি চুক্তি সাক্ষরকারী সন্তু লারমা স্বয়ং চুক্তি নিয়ে প্রকাশ্যে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
শান্তিচুক্তির প্রধান ইস্যু ভূমি জরিপসহ কয়েকটি ইস্যুতে সরকার ও জনসংহতি সমিতির মধ্যে দূরত্ব বেড়েছে। শান্তিচুক্তি সাক্ষরকারী জনসংহতি সমিতি ভেঙে এখন চার টুকরো। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রমতে, চুক্তি সাক্ষরের পর থেকে গত দুই দশকে সামাজিক অপরাধের বাইরে তিন পার্বত্য জেলায় খুন হয়েছেন ২ হাজার ১৯৯ জন। অপহৃত হয়েছে ২ হাজার ৩৯২ জন। এর মধ্যে এক-তৃতীয়াংশই পাহাড়ি। বাঙালিরা খুন হয়েছেন সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও চাঁদাবাজির জের ধরে। পাহাড়িদের অধিকাংশই নিহত হয়েছেন দলীয় কোন্দলের কারণে।
শান্তিচুক্তির আলোকে সরকার ভূমি কমিশন গঠন করে ২০০১ সালে। কমিশন নিয়ে আদিবাসী নেতাদের আপত্তির কারণে সরকার গত বছর ভূমি কমিশন আইন সংশোধন করে। তারপরও কমিশন কাজ করতে পারছে না। ভূমি কমিশন কার্যকর নিয়ে পাহড়ি ও সরকারের মধ্যে ব্যাপক মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে।
এই ধারাবাহিক অসহযোগ ও অশান্তির মধ্যে গত বৃহস্পতিবার নানিয়ার চর উপজেলা চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমা দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন। তিনি শান্তি চুক্তি সম্পাদনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন।
বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে উপজেলা পরিষদ কার্যালয়ে যাওয়ার সময় খুব কাছ থেকে শক্তিমান চাকমাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনার জন্য ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টকে দায়ী করা হয়। অবশ্য ইউপিডিএফের মুখপাত্র নিরন চাকমা এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, এটা মিথ্যা ও বানোয়াট। এর সাথে ইউপিডিএফের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
অ্যাডভোকেট শক্তিমান চাকমা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন বিভাগের ছাত্র ছিলেন। ছাত্রজীবনে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। তিনি ২০১০ সালে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি থেকে বেরিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এম এন লারমা) নামের নতুন দলে যোগ দেন। শক্তিমান চাকমা হত্যাই শেষ নয়, শুক্রবার আবার তার শেষকৃত্য থেকে ফেরার সময় গাড়ি লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করেছে সন্ত্রাসীরা। এতে ইউপিডিএফয়ের একাংশের নেতা তপন বর্মাসহ নিহত হয়েছে ৫ জন। গুলিবিদ্ধ হয়েছে আরো ৯ জন।
এই ঘটনায় পাহাড়ে নতুন করে অশান্তির আশংকা দেখা দিয়েছে। শান্তিচুক্তির পক্ষ বিপক্ষ দুটি বিবাদমান দলের সংঘর্ষে পাহাড়ে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনের আগে পার্বত্য জেলাগুলোতে শুরু হওয়া এই সহিংসতা জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। পাহাড়ে নতুন করে অশান্তির চক্রান্ত প্রতিহত করতে শান্তি চুক্তির বাস্তবায়নই হতে পারে মোক্ষম অস্ত্র।







