টাইগার নেস্টের কথা আমরা অনেক শুনেছি। ভুটানিদের মতে, বৌদ্ধ গুরু রিনপোচে তিব্বত থেকে বাঘের পিঠে চড়ে এই পাহাড়ের চূড়ায় আসে। তার নামেই এই নামকরণ। সেখানে যেতেই হবে। প্রথম দিকে স্থির হলো, বাচ্চা-কাচ্চাদের নিয়ে কয়েকজন হোটেলে থাকবে। আর বাকি যারা অতি উৎসাহী তারা তাড়াতাড়ি গিয়ে তাড়াতিাড়ি ফিরে আসবে। কিন্তু সকালে দৃশ্যপট বদলে গেল। সবাই টাইগার নেস্ট যাবে। বাচ্চাদের আগ্রহ আরও বেশি।
সকাল আটটায় হোটেল থেকে বেরোলাম বিখ্যাত টাইগার্স নেস্ট (Taktsang monastery) দেখতে। পারো ভ্যালি থেকে ৩,০০০ ফিট উপরে অবস্থিত পাহাড়ের ওপর ক্লিফের পাশেই ১৭ শতাব্দীতে তৈরি এই মনাস্ট্রিটি ভুটানিদের কাছে অন্যতম পবিত্র স্থান হিসেবে পরিচিত। টাইগার্স নেস্ট এ ওঠার পথেই পাহাড়ের খাঁজে একটা ছোটখাট ধরনের লায়ন্স কেভও আছে।
যা হোক, সবাই নভোচারীর মতো পিঠে ঝোলানো ব্যাগে খাবার পানি, চকলেট, কিছু শুকনো খাবার, গরম কাপড়, রেইনকোটসহ তৈরি হয়ে বাসে উঠে বসলাম। প্রায় ১৫ মিনিট চলার পর পৌঁছে গেলাম ট্রেইলহেডে। কিছু দোকানি পসরা সাজিয়ে বসে আছে। আছে ঘোড়াওয়ালারা, লাঠিওয়ালা। পাইন গাছ থেকে তৈরি একেকটি লাঠি পঞ্চাশ রুপির বিনিময়ে ভাড়া দেওয়া হয়। পাহাড়ি পথ উঠানামায় এই লাঠি অনেক উপকারে আসে। ওঠা ও নামার সময় লাঠিতে ভর দিলে অনেক শক্তি কম লাগে। আমরা প্রত্যেকেই একটি করে লাঠি সংগ্রহ করলাম।
অনেকে ঘোড়ার পিঠেও সওয়ার হয়। ঘোড়ায় চেপে প্রায় অর্ধেক পথ ওঠা যায়, তবে নামতে হবে নিজের পায়ে। এই অর্ধেক পথ ঘোড়ায় চেপে উঠার জন্য ছয়’শ টাকা গুণতে হয়। ভারতের রূপি আর ভুটানি টাকার মূল্যমান সমান। আমাদের টাকার চেয়ে ২০ শতাংশ বেশি। দোকানপাটের ছোট্ট জায়গাটা ছাড়িয়ে পায়ে চলার পথ ঢুকে গেছে সাইপ্রেস, পাইনের বনে। দীর্ঘ, ঋজু গাছগুলো সোজা উঠে গেছে আকাশের দিকে। নিচে তাদের পাদদেশে নানারকমের ছোট গাছপালা, লতাগুল্ম।
কোথাও কোথাও গাছের ঘনত্ব এত বেশি যে জায়গাটা প্রায়ান্ধকার হয়ে আছে। ছায়াচ্ছন্ন পথ ক্রমশ উঠছে ও পরে। একটা নোটিস বোর্ডে লেখা আছে পদপথ তৈরি হয়েছে ২০০০ সালে এবং মেরামত হয়েছে ২০০৯ সালে। ২০০০ সালের আগে কি পথ ছিল না? কে জানে! সব জায়গায় খুব খাড়াই না হলেও ক্রমশ উঁচু হয়ে গেছে। ফলে একটানা হেঁটে চলা মুশকিল। কোথাও কোথাও তো সত্যিই খুবই খাড়া। প্রায় আড়াই ঘণ্টা চলতে হবে। এটা ভেবেই কেমন যেন অন্তরাত্মা কেঁপে উঠছিল। আমাদের সঙ্গীদের চারজন ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হলো। আর চারজন আধাঘণ্টা চলার পরই ক্ষান্ত দিল। আমরা আঠারজন ‘শেষ দেখা’র দৃঢ়তা নিয়ে এগিয়ে চললাম।
ছবি তুলতে তুলতে পায়ে পায়ে এগোচ্ছি। অল্পেই হাঁফ ধরছে। বয়স তো বড়ো বাধা, তার ওপর বরেন্দ্র-পদ্মা সমতলের মানুষ আমরা। ফলে অসুবিধে তো হবেই। আরও একটা কারণ- অনভ্যস্ততা। ঢাকা শহরে আমরা ফার্মের মুরগির মত দিনযাপন করি। হাঁটা-চলা-দৌড়-ঝাঁপ আমাদের জীবন থেকে নির্বাসিত প্রায়। এ অবস্থায় উঁচু-নিচু পাহাড়ি পথ বেয়ে হাঁটা খুবই কঠিন। বড়দের তো বটেই, ছোটদেরও বেশ কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু এই অভিযানে জয়ী হওয়ার সংকল্প আমাদের এগিয়ে চলতে উৎসাহ যুগিয়েছে। একটিই তো দিন! দেখি না, কি হয়!
মাঝে মাঝে ঘোড়সওয়ার পর্যটক দু’একজন উঠে যাচ্ছে। আমরা উঠছি একটু একটু করে। পথে মাঝামাঝি জায়গায় একটা ছোট রেস্তোরাঁ আছে। সেখানে বিশ্রাম নেওয়া যায় এবং কিছু খাবারদাবার আর কফি পাওয়া যায়। ঘোড়া সেখান পর্যন্তই যেতে পারে। বাকি পথ পায়ে হেঁটে। আমরা কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার এগিয়ে চললাম। শরীরে ক্লান্তি প্রবল। একজনের কাছে জানলাম, মনাস্ট্রি একটায় বন্ধ হয়ে যাবে, তাই তাড়াতাড়ি উঠতে হবে। আমি সস্ত্রীক পথের সঙ্গে লড়াই করতে করতে উঠতে লাগলাম। বাকিরা পিছে পড়ে গেল। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে টাইগার’স নেস্ট। কিন্তু পথ ফুরোয় না!
ক্রমশ টাইগার’স নেস্ট দৃষ্টিপথে আসতে লাগল। মেটে পথের বদলে পাথরের খাড়া সিঁড়ি বেয়ে কিছুটা নামা, আবার ওঠা। পাহাড় থেকে পাহাড়ে উড়ছে দীর্ঘ নিশানমালা। জোরাল হাওয়া দিচ্ছে। আকাশে ঘন মেঘ। দেখে মনে হচ্ছে যে-কোনো মুহূর্তে বৃষ্টি নামবে ঝেঁপে। পথের বাঁদিকে প্রায় তিনশ ফুট ওপর থেকে নামছে ঝোরা বা ঝর্ণা। আমরা এখন মনাস্ট্রির দোরগোড়ায়। এগারোটার দিকে লাঠি-ব্যাগ-মোবাইল-ক্যামেরা সব কিছু সিকিউরিটি বরাবর জমা দিয়ে, পাসপোর্ট দেখিয়ে আমরা দুজন আশ্রমে প্রবেশ করলাম।
এখানে ছবি তোলা নিষেধ। খাড়া কাঠের সিঁড়ি বেয়ে একেবারে চূড়ায় বসে একজন গুরু ধ্যানমগ্ন হয়ে আছেন। পর্যযটকরা দূর থেকে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করছেন। আমরা খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে নিচে নামা শুরু করলাম। ততক্ষণে দেহের প্রাণশক্তি যেন নিঃশেষিত। কিন্তু এক ধরনের সন্তুষ্টিও রয়েছে। ট্র্যাকিং তো হল, লক্ষ্যে তো পৌঁছে গেছি। নামার সময় আস্তে-ধীরে নামলেই চলবে। তাছাড়া উপরে উঠা যত কঠিন, নীচে নামা তো আর তেমন নয়। পতন তো সব সময় সহজই হয়!
মনাস্ট্রিগুলোর ভেতরের চেহারা সবারই প্রায় একই রকম। অপূর্ব দৃশ্য চারিদিকে। খাড়া পাহাড়ের কিনারায় ধাপে ধাপে দাঁড়িয়ে আছে টাইগার’স নেস্ট। অবাক লাগে ভাবতে যে, এমন দুরূহ জায়গাতে কীভাবে তৈরি করা হয়েছিল এই মঠ। ৩১২০ মিটার অর্থাৎ ১০২০০ ফুট উচ্চতায় এই মঠ তৈরি হয়েছিল ১৬৯২ সালে। বলা হয়, গুরু পদ্মসম্ভব অষ্টম শতাব্দতে এখানেই গুহায় তপস্যা করেছিলেন তিন বছর তিন মাস তিন সপ্তাহ তিন দিন তিন ঘণ্টা ধরে। ইনিই নাকি ভুটানে মহাযান বৌদ্ধধর্মের নিংমাপা সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠা করেন। পদ্মসম্ভব অর্থাৎ গুরু রিনপোচে নাকি এক বাঘিনীর পিঠে চেপে তিব্বত থেকে এসেছিলেন এখানে।
আর একটি উপকথা অনুসারে, তিব্বতের জনৈক সম্রাটের প্রাক্তন স্ত্রী ইয়েশে সোগিয়াল (Yeshe Tsogyal) গুরু রিনপোচের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন। তিনি বাঘিনীর রূপ ধারণ করে গুরুকে তার পিঠে চাপিয়ে নিয়ে এসেছিলেন ভুটানের এই তাক্তসাং-এ। সেই গুহাকে ঘিরে ১৬৯২-তে মঠ গড়ে তুলেছিলেন গিয়ালসে তেনজিন রাবগিয়ে (Giyalse Tenzin Rabgiye)। গুরু রিনপোচে নাকি তেনজিন রূপে সপ্তদশ শতকে পুনরাবির্ভূত হন।
তেনজিনের অলৌকিক ক্ষমতা এমনই ছিল যে একই মুহূর্তে তাকে তার গুহার ভেতরে এবং বাইরে দেখা যেত, যৎসামান্য খাদ্যেই অতিথিদের ক্ষুন্নিবৃত্তি হয়ে যেত, দুর্গম পিচ্ছিল পথ বেয়ে অতিথিরা এলেও কেউ কখনো আহত বা অসুস্থ হত না, পারো উপত্যকার মানুষ আকাশে দেখতে পেত নানা প্রাণীর রূপ, নানা ধর্মীয় প্রতীক, পুষ্পবৃষ্টি। ধর্মের সঙ্গে কত যে কল্পনা, কত বিশ্বাস জড়িয়ে থাকে!
এই বিখ্যাত মঠে যুগে যুগে সাধনা করতে এসেছেন কত সাধুসন্ত, লামা। ১৯৫৮ সালে এক অগ্নিকাণ্ডে মঠ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরে এটাকে নূতন করে গড়ে তোলা হয়।
সতের শতকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত এই মঠের কর্তৃত্ব ছিল কাথগপা (Kathogpa) লামাদের হাতে। ড্রুকপা উপ-সম্প্রদায়ের গাওয়াং নামগিয়াল (Ngawang Namgyal) তিব্বত থেকে পালিয়ে ভুটানে চলে এসেছিলেন গেলুগপা গোষ্ঠীর হাত থেকে প্রাণ বাঁচাতে। তাঁরই সময় ভুটানে গড়ে ওঠে একটা প্রশাসনিক ব্যবস্থা। ইনিই শাবড্রুং বা জাবড্রুং নামে পরিচিত হন। ভুটানের সঙ্গে তিব্বতের লড়াই অনেকদিনের। এই দূর প্রত্যন্তে মঠ তৈরির আরেকটা উদ্দেশ্য স্পষ্টতই আত্মরক্ষা। নির্জনে সাধনভজন হয়তো একমাত্র লক্ষ নয়। তাই মঠগুলো শুধু প্রার্থনালয় নয়, এগুলো দুর্গও বটে।
শেষবারের মত তাকিয়ে দেখে আমরা মঠ থেকে নামতে শুরু করলাম। মঠের অপরপ্রান্তের সিঁড়ির গোঁড়ায় আসতেই আমাদের টিমের বাকি সদস্যদেরও দেখা পাই। ভেবেছিলাম আমরা দুজনই কেবল শেষ প্রান্ত অবধি পেঁছতে পারব। বাকিরা হার মানবে। কিন্তু না, সবাই অচেয়! অন্যদের দেখতে পেয়ে মনটা অপার আনন্দে ভরে গেল। সবার দুর্দমনীয় সংকল্প, তেজ আর অজানাকে জানতে চাওয়ার এই ব্যাকুলতা সত্যি গর্বিত করেছে। সবাই বাচ্চাসহ এই অবধি এসেছে। এটা সকলের জন্য নিঃসন্দেহে জীবনের শ্রেষ্ঠ অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে।
যাহোক, আমরা যে যার মত নামতে শুরু করলাম। নামার কাজ অপেক্ষাকৃত সহজ, হাঁফ ধরে না, কিন্তু দেহের নিম্নাঙ্গ অর্থাৎ কোমর থেকে পা পর্যন্ত ক্রমশ অসাড় হতে শুরু করে। নির্জন পাহাড়ি পথ, মাঝে মাঝে দু-একজন নামছে বা উঠছে, নিঃশব্দ এই বনঘেরা পাহাড়ে কান পাতলে যেন গাছেদের শ্বাস-প্রশ্বাসও শোনা যায়! গভীর ক্যানিয়ন থেকে ভেসে আসছে শীতল বাতাস, কাছে-দূরে নীল-সবুজ পাহাড়। সমগ্র প্রকৃতি যেন আমাদের দেখছে। এক অন্যরকম ভালবাসা ছড়িয়ে আছে চারপাশে। পথের ওপর এক সোনালি ঘুঘু। ডানায় তার সোনার রঙ। এমন ঘুঘু দেখিনি এর আগে।
ভেঙে যাচ্ছে পা দুটো। একটু দাঁড়াতেই মনে হল তারা আর আমার বশে নেই। থরথর করে কাঁপছে দুটো পা, যেন হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাব এবার।শরীরের ভেতর থেকে প্রাণশক্তি যেন ফুরিয়ে গেছে। রয়েসয়ে আস্তে আস্তে নামতে লাগলাম। তবে শারীরিক কষ্ট ছাপিয়ে এক ধরনের ভালোলাগা ছড়িয়ে আছে মনের ভেতরে। অবশেষে বিকেল প্রায় চারটা নাগাদ আমরা নিচে নেমে আসতে সক্ষম হই, যেখানে আমাদের গাড়ি অপেক্ষা করছে।
একে একে সবার ফিরে আসতে আরও আধাঘণ্টা সময় কেটে গেল। সবাই ক্লান্তশ্রান্ত হয়ে ফিরে আসার পর আমরা গাড়িতে করে রওনা হলাম হোটেলের উদ্দেশ্যে।
হোটেলে ফিরে প্রথমেই এই অবেলায় ‘দুপুরের খাবার’ খেলাম। এরপর ফ্রেশ হয়ে আবার বেরিয়ে পড়া। মহাক্লান্তি নিয়ে এর মধ্যেই একদল চলে গেল শহরে, শপিং করতে। আমরা কয়েকজন গেলাম হোটেলসংলগ্ন নদীর ধারে। পারোতে এক পাহাড়ের ঢালে আমাদের হোটেল। একদিকে বইছে পারো-চু নদী আর তাকে ঘিরে সবুজের সান্নিধ্য। সেখানে অনেকক্ষণ অন্ধকারে বসে পাহাড়ি নদীর অবিরাম ছুটে চলার ছন্দময় কলকল ধ্বনি উপভোগ করলাম। পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে ছোট ছোট বাড়িগুলো জোনাকির মত ঝিকমিক করছে।
নিসর্গের এক নিরাভরণ, অদ্ভুত মাদকতায় ভরা পারোর অনির্বচনীয় নির্জন সৌন্দর্য। নিস্তব্ধতারও যে একটা মিস্টি শব্দ আছে তার থেকে ব্যস্ত কোলাহলময় শহুরে জীবন চিরকালের জন্য বঞ্চিত। আর সেই ‘সাউন্ড অফ সাইলেন্স’-এর মায়াবী আবেশে আমরা তখন সকলেই আচ্ছন্ন। ফিরতে ফিরতে রাত সাড়ে আটটা।
রাতের খাবার পর আবার বসে আড্ডা। কাল দেশে ফিরে যাওয়া হবে। ভোর সাড়ে চারটায় এয়ারপোর্টে যাবার জন্য বেরোতে হবে। ফিরতে হবে শহরের কোলাহলে। কিন্তু কারো তাড়া নেই। গল্প-আড্ডা শেষ হতে চায় না। তবু রাত বারটা নাগাদ সবাই হোটেল কক্ষে ফিরে যাই। সবার মধ্যে শুরু হয়েছে মন কেমনের পালা!








