অনেকবার তারিখ পাল্টে, অনেক জনকে যোগবিয়োগ করে শেষ পর্যন্ত আমরা ভুটানের যাত্রী হলাম মোট ২২ জন। এর মধ্যে সাতজন শিশু। শখের এই ভ্রমণে প্রস্তুতির কোনো কমতি ছিল না। পুরো দুটো ফুটবল টিমের সমান সদস্য নিয়ে দেশের বাইরে বেড়াতে যাওয়া এই প্রথম। ভরসা ছিল বুলবুলের উপর। সঙ্গে তাহমিদও ছিল। দুজনেই অতিশয় করিৎকর্মা। অন্য যারা ছিল তারাও প্রত্যেকে প্রত্যেকের চেয়ে বেশি চালাক। কাজেই আমার খুব একটা টেনশন ছিল না।
কোথায় যাব, কোথায় থাকব, কী খাব-এসব বিষয় তাহমিদ আর বুলবুলই ঠিক করেছে। আমাদের টিমে মোট আট পরিবার। বুলবুল-ফারজানা ও তাদের মেয়ে মৃত্তিকা, তাহমিদ-কনক ও তাদের আদরের ধন কল্প-গল্প, মানিক-স্বপ্না ও তাদের দুই বিচ্ছু অর্থী-সামির, তৈমুর ভাই-দীপু আপার সঙ্গে তাদের সুকন্যা আনাহি, সিমাব-শিউলি ও তাদের কন্যা তিনাব, সীমা আপা ও তার পুত্র অর্ক, ববিসহ আমরা দু’জন এবং জিনাত। আমাদের টিমে ডাক্তার, ব্যাংকার, এনজিওকর্মী, সরকারি চাকুরেসহ নানা পেশার মানুষের সমন্বয় হয়েছে।
ঠিক আটটায় আমাদের প্লেন আকাশে উঠলো। আর উঠার একটু পরেই বলল, সিট বেল্ট যারা খুলে ফেলেছেন তারা আবার দ্রুত তা বেঁধে ফেলুন। আমরা ভুটান পৌঁছে গেছি। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা ভুটানের পারো এয়ারপোর্টে অবতরণ করব। বিমান থেকে ভুটানের যে দৃশ্য চোখে পড়ল, তা এক কথায় অভূতপূর্ব। সুউচ্চ পাহাড়গুলোর কোনোটার মাথা বরফে ঢেকে আছে, আবার কোনোটার মাথার বরফ গলে বেরিয়ে এসেছে পাথর। তাতে রোদ পড়ে চকচক করছে। বরফেরটা সোনালি, পাথরেরটা রূপালি। উন্নত দেশগুলো অনেক অর্থের শ্রাদ্ধ করে তাদের দেশটাকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। সেসব দেশের সঙ্গে পার্থক্য, প্রাকৃতিকভাবেই ভুটান সুন্দর। শহরটা আরও সুন্দর। পাহাড়ের গায়ে গায়ে ঘরবাড়ি, অফিস-আদালত সবকিছু। সবগুলো রাস্তা তৈরি হয়েছে পাহাড় কেটে। সাপের মতো পেঁচিয়ে আছে ছিমছাম রাস্তাগুলো। দু’পাশে আপেল, কমলা, আঙুর গাছের ছড়াছড়ি।
সারি সারি পাহাড়ের মাঝে এঁকে বেঁকে পাইলট যখন বিশেষ দক্ষতায় পারো এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করলো তখন সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লাম। কারণ পাহাড় ঘেড়া পারো এয়ারপোর্টটা খুবই রিস্কি। পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে গিয়ে ল্যাণ্ড করতে হয়। অনেক পাহাড়ের মাঝে একটুকরো সমতল ভূমিকে আরও সমান করে এয়ারপোর্ট বানানো হয়েছে। ভুটান পাহাড়ের দেশ। শত শত পাহাড় মিলে এই দেশ। সমতল ভূমি খুব কম। সেখানে বিমান ওঠানামার জন্য বড় একখণ্ড সমতল ভূমি তাদের নেই। বিমান নামতে হলে অনেক আগে থেকেই তাকে ল্যান্ডিং এর দিকে ঝুঁকে আসতে হয়। এই ঝুঁকে আসার আকাশ পথ পেরোতে পাহাড়ে ঘেরা। এখানে পাহাড়ের ফাঁকে ফাঁকে বিমান চালিয়ে তাকে এয়ারপোর্টের ল্যান্ডিং এর দিকে এগিয়ে যেতে হয়। বেশ ঝুঁকি আছে তাতে । দক্ষ বৈমানিক ছাড়া এখানে বিমান ল্যান্ড করানো অসম্ভব। তাইতো পারো এয়ারপোর্টে সপ্তাহে ২/১ টির বেশি বিমানের আনাগোনা নেই। বিমান থেকে বেরুতেই ঠাণ্ডা হিমেল হাওয়া আদর করে জড়িয়ে ধরল।
আর বন্দরের কর্মীরাও মনে হলো আমাদের জন্যে বসে বসে অপেক্ষা করছিল। আমাদের পাসপোর্টে সিল ছাপ্পর মারবার পর তারা রেলস্টেশন বন্ধ করে বাড়ি ফিরবার মতো বন্দরের কাউন্টার বন্ধ করে দিল। তাদের আজকের মত কাজ শেষ। যা হোক, আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমানোর দেশ ভুটান। সবুজ পাহাড়ে নীল পপির দেশ ভুটান। শীতল হাওয়ায় ভুটানের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর পারোতে আমাদের অভিবাদন জানালো ভুটানের বাংলাদেশ দূতাবাসে কর্মরত ফারুক ভাই। সে তাহমিদের পরিচিত। সঙ্গে একটি ঝকঝকে মিনিবাস। এই মিনিবাসে করেই আমাদের ভুটান-অভিযান চলবে। বাসচালক তাশিজি। স্মার্ট টগবগে যুবক। ভুটানি পোশাক পড়া। মৃদু হাসি দিয়ে আমাদের বরণ করে নিলেন। যে কয়টি দেশে বাংলাদেশি নাগরিকের জন্য এখনো ভিসার প্রয়োজন হয় না ভুটান তার একটি। 
এখানে বিমানবন্দর থেকেই পাসপোর্টে ভিসা লাগিয়ে দেয়। মিনিট দশেকের ফর্মালিটিজ শেষে আমরা রওনা হলাম থিম্পুর উদ্দেশে। পারো ৭ হাজার ৩৮২ ফিট উচ্চতার শহর। বাইরের আবহাওয়া বেশ ঠাণ্ডা। আমরা ঢাকায় গরম আবহাওয়া রেখে এসেছি। ভুটানের তাপমাত্রা মাইনাস ৫ থেকে ২০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের মধ্যে ওঠানামা করে। ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে তুষারপাতও দেখা যায়।
গুণে গুণে ২২ জনকে মিনিবাসে তুলে আমাদের যাত্রা শুরু হলো। যাওয়ার পথে যেদিকেই চোখ যায় শুধু পাহাড় আর পাহাড়, সবুজ জঙ্গল, নানা রঙের বুনোফুল, আপেল বাগান আর পাশে বয়ে চলা অগভীর খরস্রোতা পারো চু। নদীকে এরা চু বা ছু বলে। প্রাচ্যের সুইজারল্যান্ড বলে খ্যাত ভুটানের পারো এতই নিরিবিলি ও শুনশান যে পারো নদীর স্রোতধারার কলকল ধ্বনি খুব বেশি স্পষ্ট। ভেজা বাতাসে নাম না জানা ফুল আর সবুজের ঘ্রাণ বেশ তীব্র। সুন্দর পরিপাটি একটি পুতুল শহর যেন পারো। যেন রুচিবান কোনো সৌখিন বড়লোকের সুসজ্জিত ড্রয়িংরুম।
গাড়ি যখন পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে চলছিল, নিচে গভীর খাদের দিকে তাকিয়ে ভয়ে শিউরে শিউরে উঠছিলাম। কিন্তু আমাদের দশ বছরের অভিজ্ঞ গাড়িচালক তাশিজি হাসি হাসি মুখে তার ঝকঝকে মিনিবাসটি ড্রাইভ করছিল। আমরা পথের দু’পাশে পাহাড়, নদী, বনভূমি আর সবুজ ধানক্ষেত দেখতে দেখতে এক ঘন্টায় পারো থেকে ৭ হাজার ৭১০ ফিট উচ্চতার শহর থিম্পু চলে এলাম।
তুষারাবৃত পর্বতশৃঙ্গের সঙ্গে রবিকিরণের এক অপূর্ব মেলবন্ধনে উদ্ভাসিত চারিদিক। রাজার দেশের রাজধানীতে পৌঁছে পর্বতশিখর থেকে বয়ে আসা এক ঝলক সতেজ হিমেল হাওয়া মুহূর্তেই এক অনির্বচনীয় ভালোলাগার অনুভূতিতে ভরিয়ে দিল মনপ্রাণ। বৌদ্ধ স্থাপত্যের গভীর নৈঃশব্দ্য, পাহাড়ের এক আশ্চর্য নির্জনতা আর প্রকৃতির অনবদ্য সৌন্দর্য মনকে ধীরে ধীরে আচ্ছন্ন করে ফেলে। আমরা থিম্পুতে যে হোটেলে উঠলাম তার নাম ‘সম্ভাব’। একটি ছোট পাহাড়ি নদীর ধারে। হোটেলে গিয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে, ফ্রেশ হয়ে, দুপুরের খাবার খেয়ে আমরা বেরোলাম টেক্সটাইল মিউজিয়াম দেখতে। প্রবেশপথেই আছে প্রায় ছাদ থেকে মেঝে পর্যন্ত লম্বা বিশাল এক ট্যাপিস্ট্রি। মিউজিয়ামে ভুটানিদের ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন পোশাক ও গয়না সাজানো আছে। ভেতরের ছবি তোলা নিষেধ। একটা বিক্রয়কেন্দ্রও আছে। কিন্তু প্রতিটি জিনিসের দাম অত্যন্ত চড়া। অনেক কিছুই আমাদের পছন্দ হলেও দামের কারণে দেখেই সন্তুষ্ট থাকতে হলো।
এরপর আমরা রওনা হলাম টাকিন ন্যাশনাল রিজার্ভ ফরেস্ট অভিমুখে। এখানে রাস্তার চারধারে শহরের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায়, বিমানবন্দরে রাজা-রানির বিশাল ছবি টাঙিয়ে রাখা হয়েছে। রাজার নাম জিগমে খেসার নামগিয়েল ওয়াংচুক (Jigme Khesar Namgyel Wangchuk) আর রানির নাম জেটসুন পেমা (Jetsun Pema)। ১৩ অক্টোবার ২০১১-তে তারা যখন বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তখন তাদের বয়স যথাক্রমে একত্রিশ ও একুশ। বিকেলের হালকা রোদকে সাথী করে মুহুর্তেই আমরা থিম্পুর উত্তর-পশ্চিম শহরতলির মোতিথাং টাকিন প্রিজার্ভ ফরেস্টে পৌঁছে যাই। ভুটানের জাতীয় পশু টাকিন (Budorcas Taxicolor) সংরক্ষণের জন্য এটি একটি ওয়াইল্ড লাইফ রিজার্ভ। চিড়িয়াখানার আঙ্গিকে পাহাড়ি বনানীর মধ্যে সংরক্ষিত এই বনের মূল আকর্ষণ টাকিন। মুখটা অবিকল ছাগলের, দেহটা গরুর। ২০০৫-এর ২৫ নভেম্বার টাকিনকে জাতীয় পশু ঘোষণা করা হয়। স্থানীয় লোককথা অনুসারে, পঞ্চদশ শতাব্দে ড্রুকপা কুনলি (Drukpa Kunley) নামে এক তিব্বতি সন্ত ভুটানে আসেন। তিনি পরিচিত ছিলেন ‘দিব্যোন্মাদ’ নামে। স্থানীয় মানুষ তাকে বলেন কিছু অলৌকিক ক্রিয়াকলাপ দেখাতে। তিনি রাজি হন এই শর্তে যে মধ্যাহ্নভোজনে তাঁকে একটা গোটা ছাগল আর একটা গোটা গরু খাওয়াতে হবে। 
প্রাণী দুটির হাড়গোড় বাদ দিয়ে সবটাই তিনি খেয়ে ফেললেন। তারপর ছাগলের মাথাটা বার করে গরুর কংকালের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে মন্ত্র উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গে ছাগলের মাথা আর গরুর দেহ নিয়ে জন্ম নিল একটি জলজ্যান্ত প্রাণী। এই প্রাণীই হল টাকিন। এই গোট-অ্যান্টিলোপ দেখা যায় ভারত, ভুটান, চিন ও তিব্বতে। খুবই ছোট রিজার্ভ। কয়েকটা টাকিন চরে বেড়াচ্ছে কাছে-দূরে। সত্যিই অদ্ভুত দেখতে প্রাণী। মাথাটা ছাগলের আর দেহটা গরুর মতো বলা হলেও আমার মনে হল, ভেড়ার মতো। বিশেষ করে গলা আর শরীরের পাশের দিকের লোম দেখতে ভেড়ার লোমের মতোই। শুনলাম এখানে বত্রিশটা টাকিন আছে এখন। পাইন গাছের বনের মধ্যে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে টাকিনগুলো। একটা বার্কিং ডিয়ারও দেখলাম একা একা চরছে। শান্ত, সুন্দর এক টুকরো বনভূমি। আমরা ছবি তুললাম।
এরপর আমরা পাহাড়ের চূড়ায় বিশালকায় এক স্বর্ণাভ বুদ্ধমূর্তি আর তার সন্নিকটে নজরকাড়া ভিউপয়েন্ট নামলাম। এখান থেকে নীচে পাহাড় ঘেরা শহরটাকে ছবির মত সুন্দর দেখায়। ভিউপয়েন্ট থেকে পার্লামেন্ট ভবন ও রাজার বাসভবন দেখা যায়। কিংস প্যালেসে রয়েছে স্বতন্ত্র নির্মাণশৈলী। ওপরে মিনার সংবলিত বিশাল চৌচালা ভবন। যে কেউ দেখলেই আকৃষ্ট হবেন। এর পাশ দিয়ে হিমালয়ের বরফগলা খরস্রোতা থিম্পু চু নদী শহরের মাঝ দিয়ে সর্পিলভাবে বয়ে গেছে। স্বচ্ছ পানির মধ্য দিয়েও তলদেশের পাথরগুলো স্পষ্ট দেখা যায়। এখানে আমরা ইচ্ছেমত ছবি তুললাম।
তারপর ফিরে আসি শহরে। সন্ধ্যায় একটি হোটেলে চা আর চিজ মোমো খেয়ে পায়ে হেঁটে থিম্পু শহর পরিভ্রমণ শুরু করলাম। পরিষ্কার ফুটপাথ। ফুটপাথে মাঝে মাঝে সিমেন্টের ব্লক করা বসার জন্য। কিন্তু কেউ বসে নেই সেখানে। কোথাও কোনো কর্মহীন আড্ডা নেই। রাস্তায় গাড়ি চলছে, কিন্তু কেউ হর্ন দিচ্ছে না, কেউ কারোকে ওভারটেক করছে না যথেষ্ট সুযোগ থাকা সত্ত্বেও। পথে আবর্জনার ডাঁই নেই কোথাও। রাস্তার মাঝে মাঝে গাড়ি পার্কিং-এর সুবিন্যস্ত ব্যবস্থা। সভ্যজীবনের প্রাথমিক লক্ষণ তো এগুলোই। থিম্পু শহর প্রদক্ষিণ করে হোটেলে ফিরে রাতের খাবার শেষ করার পর বসে আড্ডা।








