বিজয় দিবসের পুরো দিনটা দেশের গান শুনেই কাটিয়ে দিতে চেয়েছিলেন জনপ্রিয় অভনেত্রী ও নির্মাতা মেহের আফরোজ শাওন। পাশে ছিল তার দুই সন্তান। মায়ের বাড়ির বিছানা থেকে খানিক দূর থেকে ভেসে আসা দেশের গানগুলো তার কাছে পৃথিবীর মধুরতম গানগুলোর মতোই মনে হচ্ছিল।
সে আশাতেই ইউটিউবে একেরপর এক দেশের গান শুনতে বসেন তিনি। হঠাৎ ভুল উচ্চারণ ও বিকৃত সুরে গাওয়া একটি গান তার সারাদিনের আনন্দে ভাঁটা আনে। শাওন মনে করেন এভাবেই হেরে যাচ্ছে শুদ্ধ জিনিসগুলো।
এ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় তার স্ট্যাটাসটি হুবুহু তুলে ধরা হয়েছে, ‘আজকের সকালটা খুব সুন্দরভাবে শুরু হয়েছিল। মা’র বাড়ির বিছানায় পৃথিবীর মধুরতম গানগুলোর মধ্যে একটি শুনে আমার ঘুম ভাঙল-
“জন্ম আমার ধন্য হলো মা গো
এমন করে আকুল হয়ে আমায় তুমি ডাকো…”
আমি অলস চোখে তাকিয়ে দেখি আমার দু’পাশে দুইপুত্রের ঘুমন্ত কোমল মুখ। আমি তাদের ঘুম ভাঙালাম। এর মধ্যে আগের গান শেষ হয়ে চলছে-
“একটি বাংলাদেশ তুমি জাগ্রত জনতার
সারা বিশ্বের বিস্ময় তুমি আমার অহংকার…”
এই সময়ের ব্যস্ত নগরীতে বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবসে এখনও কেমন যেন পাড়া মহল্লার মত অনুষ্ঠান হয়, সকাল থেকে মাইকে দেশের গান বাজতে থাকে। কি-যে ভালো লাগে..! আমি পরবর্তী গানের জন্য অপেক্ষা করছি… শুরু হলো শিল্পী শাহনাজ রহমতুল্লাহ’র কিন্নরকণ্ঠ- “একবার যেতে দে না আমার ছোট্ট সোনার গাঁয়
যেথায় কোকিল ডাকে কুহু দোয়েল ডাকে মুহু মুহু
নদী যেথায় ছুটে চলে আপন ঠিকানায়…”
আমি ঘরের জানালা খুলে দিলাম। আয়োজন করে দেশের গান শোনা হয়না কতদিন..! পুত্রদ্বয় নাস্তা খেতে খেতে গান শুনছে। ছোটজন বললেন-
“মা আমি ‘বাংলাডেশ’এর একটা গান শিখেছি স্কুলে- পূর্ব ‘ডিগন্তে’ সূর্য উঠেছে ‘ড়ক্তলাল’ ‘ড়ক্তলাল’ ‘ড়ক্তলাল’…”
বড়পুত্র খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। “মা তোমার মনে আছে ছোটবেলায় যে আমি গান গাইতাম- মুক্তির মন্দির ‘সুপান’তলে কত প্রাণ হলো ‘বুলিডান’… লেখা আছে অশ্রুজলে…”
আহা তাইতো..! মাত্র আড়াই বছর বয়সে তার বাবার প্রিয় গানটি শিখে ফেলেছিল সে। তারপর একা একা খেলত আর এই গানটি গাইতো।
সেই মুহূর্তে মাইকে চলছিল আরেকটি মধুর গান-
“একতারা তুই দেশের কথা বল রে এবার বল
আমাকে তুই বাউল করে সঙ্গে নিয়ে চল…”
একের পর এর দূর থেকে ভেসে আসা গুলশান ১ এর কোনও এক নাম না জানা সংগঠনের মাইকে বাজানো দেশের গান শুনতে থাকলাম আমরা। অনুভব করলাম…শিহরিত হলাম…
“বলো যত খাঁটি তার চেয়ে খাঁটি বাংলাদেশের মাটি”,
“মা গো ভাবনা কেন? আমরা তোমার শান্তি প্রিয় শান্ত ছেলে”,
“ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা”,
“মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি”,
“হায়রে আমার মন মাতানো দেশ…”,
“ও আমার বাংলা মা তোর আকুল করা রূপের সূধায় হৃদয় আমার যায় জুড়িয়ে”,
“এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা, আমরা তোমাদের ভুলবো না”,
“সূর্যোদয়ে তুমি সূর্যাস্তে তুমি ও আমার বাংলাদেশ প্রিয় জন্মভূমি”,
“এক নদী রক্ত পেরিয়ে বাংলার আকাশে রক্তিম সূর্য আনলে যারা তোমাদের এই ঋণ কোনোদিন শোধ হবে না…”
দুপুরের পর কেমন যেন নেশা ধরে গেল। ইউটিউব খুলে বসলাম.., আজ কেবল দেশের গান শুনে দিন পার করবো… হঠাৎ এবারের বিজয় দিবস কে উপলক্ষ্য করে তৈরী করা একটি গান চোখে পড়ল। আমি আগ্রহ নিয়ে শুনতে শুরু করলাম। গানের শিরোনাম- ‘জিতছি’..!!!
“জিতছি… জিতছি…
জিতছি দেখে গাইতে পারি নিজের দেশের গান
জিতছি আমি হলে দেখা বাংলা ‘মুভি’র বান”
চার পাঁচ লাইন শুনে আমার সারাদিনের কোমল মায়াময় সুখ কেমন যেন ‘অ-সুখে পরিণত হলো… বাংলা নাটকে এবং দু’একটি সিনেমার ‘খাইছি’, ‘পড়ছি’, ‘করছি’ এইসব তথাকথিত আধুনিকতায়(!) তাও অভ্যস্ত হবার চেষ্টায় ছিলাম। কিন্তু বাঙালী জাতির মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয়কে ‘জিতছি’ বলে অবহিত করা গান..! মেনে নিতে এতো কষ্ট হচ্ছে কেন..?
আসলে আমি চিরকাল ‘খ্যাত’ই রয়ে গেলাম…
– ১৬ ডিসেম্বর ২০১৭
(‘জিতছি’ গানের লিংক দিতে চাই না। কেউ শুনতে চাইলে ইউটিউবে পাবেন।)








