সহকর্মী শরীফ উদ্দীনকে অপসারণের ঘটনায় ফুঁসে উঠেছেন দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কর্মকর্তারা। শরীফকে চাকুরিতে বহাল ও প্রশাসনিক নানা হয়রানি বন্ধের দাবিতে সচিবের সাথে দেখা করেন দুদক কর্মকর্তারা। পরে দুদক কার্যালায় প্রাঙ্গণে মানববন্ধন করেন তারা।
এসময় তারা বলেন, স্বাধীন সংস্থা হলেও তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে তারা নানা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। যার বলি হয়েছেন শরীফ উদ্দীন। শরীফ উদ্দীন সবশেষ পটুয়াখালীতে কর্মরত ছিলেন। এর আগে চট্টগ্রামে দায়িত্ব ছিলো তার। দক্ষ কর্মকর্তা হিসেবে শরীফ তখন ৫২ টি মামলা করেন বিভিন্ন ঘটনায়। বিশেষ করে কক্সবাজারে ভূমি অধিগ্রহণের কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনা উদঘাটন ও অনুসন্ধান করেছেন তিনি। এর পরপরই তাকে বদলি করে দেয়া হয় চট্টগ্রাম থেকে। দুদক কর্মকর্তারা বলছেন, এমন ঘটনা দুর্নীতিবাজদের পৃষ্ঠপোষকতার সমার্থক।
এসময় দুদক সচিব বরাবর দেওয়া এক স্মারক লিপিতে দুর্নীতি দমন কমিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পক্ষে বলা হয়: আমরা দুর্নীতি দমন কমিশনের কর্মচারী হিসেবে দুর্নীত দমন কমিশনের ভিশন-মিশন বাস্তবায়নের জন্য দুর্নীতিবাজ নির্বিশেষে আইনের আওতায় আনার জন্য কাজ করি। যার নজীর রয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনের কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন ও তার প্রেক্ষিতে বিচার চলমান রয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশন (কর্মচারী) চাকরি বিধিমালা, ২০০৮ এর ৫৪(২) নং বিধিতে বলা হয়েছে- “এই বিধিমালায় ভিন্নরূপ যাহা কিছুই থাকুক না কেন, উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ কোন কারণ না দর্শাইয়া কোন কর্মচারীকে নব্বই দিনের নোটিশ প্রদান করিয়া অথবা নব্বই দিনের বেতন পরিশোধ করিয়া তাহাকে চাকরি হইতে অপসারণ করিতে পারিবে।” অন্যদিকে বাংলাদেশের মহান সংবিধানের ১৩৫(২) নং অনুচ্ছেদে লেখা আছে- “অনুরূপ পদে (প্রজাতন্ত্রের অসামরিক পদে) নিযুক্ত কোন ব্যক্তিকে তাহার সম্পর্কে প্রস্তাবিত কোন ব্যবস্থা গ্রহণের বিরুদ্ধে কারণ দর্শাইবার যুক্তিসঙ্গত সুযোগ দান না করা পর্যন্ত তাহাকে বরখাস্ত, অপসারিত বা পদাবনবতি করা যাইবে না”।
দুর্নীতি দমন কমিশন কর্মচারী (চাকুরী) বিধিমালা, ২০০৮ এর ৫৪ বিধিটি চ্যালেঞ্জ করে মাননীয় হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন নং ১৪২৪/২০১১ দায়ের করা হলে বিগত ১৭-১০-২০১১খ্রি. তারিখ মাননীয় হাইকোর্ট বিভাগ দুদক চাকুরী বিধিমালার ৫৪ বিধিকে অসাংবিধানিক হিসেবে ঘোষণা করে। উক্ত রায়ের বিপক্ষে আপীল দায়ের রলে মাননীয় আপীল আদালত ১০-১১-২০১৬খ্রি. তারিখে আপিল খারিজ করে মাননীয় হাইকোর্ট বিভাগের “৫৪ বিধি অসাংবিধানিক ঘোষণাটি বহাল রাখে। অর্থাৎ, ৫৪ বিধি অনুযায়ী দুদকের কোন কর্মচারীকে সংবিধানের ২৭/২৯/২১ ও ৪০ অনুচ্ছেদবলে প্রদত্ত মৌলিক অধিকার “আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ হিসেবে ব্যাখ্যা প্রদানের সুযোগ না দিয়ে কাউকে ৯০ দিনের বেতন দিয়ে স্থায়ী রাজস্ব খাতভুক্ত চাকুরী থেকে অপসারণের অবকাশ ছিলো না। কিন্তু কমিশন আপীল বিভাগের উক্ত সিদ্ধান্তের বিপরীতে ৩২/২০১৭ সিভিল রিভিশন দায়ের করলে একতরফা (রিটকারীর প্রতিনিধির অনুপস্থিতিতে) শুনানি করে গত ২৮-১১-২০২১খ্রি. তারিখে হাইকোর্টের আদেশটি স্থগিত করে এবং বিষয়টি বিজ্ঞ উচ্চ আদালতের আপিল বিভাগে বিচারাধীন রয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন চাকুরী বিধিমালা ২০০৮ এর ৫৪ বিধির কার্যকারিতার বিষয়টি উক্ত আদালতে বিচারাধীন থাকাবস্থায় দুদকে ২০১৪ সালে যোগদানকৃত একজন কর্মকর্তাকে কোনরূপ আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে এবং সে কোনরূপ অপরাধ করেছে কি-না সে বিষয়টি তাকে অবহিত না করে ১৬-০২-২০২২ খ্রি. তারিখের স্মারক নং: ৭৪৯০ মূলে ৫৪(২) বিধি প্রয়োগের মাধ্যমে উপসহকারী পরিচালক জনাব মো: শরিফ উদ্দীনকে চাকুরি থেকে অপসারণ করা হয়, যা অসাংবিধানিক, বে-আইনী ও সাধারণ আইনের আওতায় মানবাধিকার পরিপন্থী।
মো. শরিফ উদ্দীন চট্টগ্রামে দক্ষ ও পরিশ্রমী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত। তিনি তার চট্টগ্রাম অফিসে কর্মরত থাকাকালীন ৫২টি মামলা দায়ের করেন। এছাড়া তিনি বিজ্ঞ আদালতের বিচারার্থে ১৫টি চার্জশিট দাখিল করেন। তিনি কক্সবাজারে ভূমি অধিগ্রহণের কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনা উদঘাটনসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান ও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। জনাব শরীফ উদ্দিনের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের কারণে সংক্ষুব্ধ পক্ষসমূহ বিভিন্ন সময়ে তাকে নানাভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছেন। ৫৪(২) বিধি প্রয়োগের মাধ্যমে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে তাকে চাকুরী হতে অপসারণ প্রকারন্তরে দুর্নীতিবাজদের সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করার সমার্থক।
এমতাবস্থায়, জনাব মোঃ শরিফ উদ্দীন, উপসহকারী পরিচালক, দুর্নীতি দমন কমিশন এর অসাংবিধানিক ও অমানবিক অপসারণ আদেশ প্রত্যাহার ও দুর্নীতি দমন কমিশন কর্মচারী (চাকুরী) বিধিমালা, ২০০৮ এর ৫৪(২) বিধি বাতিলপূর্বক কমিশনের কর্মকর্তাদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিতকরণের অনুরোধ জানাচ্ছি।







