শহিদুল আলম, শেখ জামাল ধানমণ্ডি ক্লাবের তরুণ এই গোলকিপার জালে প্রবেশের আগেই লাফিয়ে উঠে ধাক্কা দিয়ে বলটাকে দূরে সরিয়ে দিলেন। মালয়েশিয়ার প্লে-মেকার আমরি ইয়াহিয়াহের অসাধারণ একটি ফ্রি কিক ছিলো সেটি। মালয়েশিয়ার সমর্থকরা বিষণ্ণ হয়ে গেলেন আর উল্লাসে ফেটে পড়লেন বাংলাদেশের সমর্থকরা।
মালয়েশিয়ার শাহ আলম শহরে ম্যাচটি ছিলো বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া জাতীয় ফুটবল দলের প্রীতি ম্যাচ। নিঃসন্দেহে জয়ের জোর দাবিদার ছিলো মালয়েশিয়া। বাংলাদেশ এর আগে মালয়েশিয়ার অনুর্ধ্ব-২২ দলের সঙ্গে দুইবার হেরেছে, তাও স্বদেশের মাটি ঢাকায়। প্রীতি ম্যাচটিতে মালয়েশিয়ার সম্মুখভাগের খেলোয়াড়রা দাপট দেখালেও কিছু অসাধারণ রক্ষণ এবং বিশেষভাবে গোলকিপারের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স মালয়েশিয়া দলকে নিজেদের মাটিতে জয়ী হতে দেয়নি।
তবে বাংলাদেশ দল ড্র নিয়েই সন্তুষ্ট থাকে।
বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) এর উদ্যোগে আয়োজিত প্রীতি ম্যাচের মূল উদ্দেশ্য ছিলো পরবর্তী ম্যাচে বর্তমান এশিয়া কাপ চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে মাঠে নামার আগে বাংলাদেশ দলকে প্রস্তুত করে নেয়া।
অস্ট্রেলিয়া যেখানে চ্যাম্পিয়ন, বাংলাদেশ দল সেখানে এখন পর্যন্ত একবারই এশিয়া কাপে অংশগ্রহণের যোগ্যতা অর্জন করেছিলো। তাও ১৯৮০ সালে। সেই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের সঙ্গে একই গ্রুপে ছিলো এশিয়ার চার শক্তিশালী দল ইরান, নর্থ কোরিয়া, সিরিয়া এবং চীন। মাঠে সাহসের সাথে লড়াই করার পরও বাংলাদেশ তাদের চারটি ম্যাচেই হেরে যায় এবং টুনামেন্টের শুরুতেই গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেয়।
অস্ট্রেলিয়া দলের বেশিরভাগ খেলোয়াড়ই ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলোতে খেলেন এবং সন্দেহাতীতভাবে বাংলাদেশ দলের খেলোয়াড়দের চেয়ে অনেক বেশি অভিজ্ঞ। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশ হেরে গেলেও ইউরোপের সেরা কয়েকজন খেলোয়াড়ের বিপক্ষে খেলাটা একটি বিশাল অভিজ্ঞতা হবে বাংলাদেশ দলের প্রথম এগারোজন এবং পরবর্তী সময় বদলি হিসেবে মাঠে নামা খেলোয়াড়দের জন্য।
তরুণ বাংলাদেশী খেলোয়াড়রা এই খেলা থেকে অনেক কিছু শিখতে পারবেন এবং তাদের খেলার স্টাইলেও উন্নতি করতে পারবেন। বৃহস্পতিবারের খেলাটিতে মূল পরীক্ষাটি হবে বাংলাদেশের রক্ষণভাগ এবং গোলকিপারের। কারণটা সবার জানা। টিম কাহিল, নাথান বার্নস, মাসিমো লিয়োঙ্গো, ম্যাথিউ লেকির মতো খেলোয়াড়দের সমন্বয়ে গঠিত বিশ্বমানের আক্রমণাত্মক মধ্যভাগ এবং ফরোয়ার্ডের জন্য সুপরিচিত অস্ট্রেলিয়ানরা।
বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া প্রীতি ম্যাচটির একটি লক্ষ্যণীয় দিক ছিলো মালয়েশিয়ায় বসবাসরত বাঙ্গালিরা বিশাল সংখ্যায় জাতীয় ফুটবল দলকে সমর্থন দিতে স্টেডিয়ামে গিয়েছিলেন। সমর্থকরা মাঠে গিয়েছিলেন ফ্ল্যাগ, ব্যানার ও স্কার্ফ এবং লাল সবুজ জার্সি পরে। যখনই মামুনুল এবং এমিলি মালয়েশিয়ার গোল পোস্টের দিকে বল বাড়িয়ে দিয়েছেন তখনই সমর্থকেরা আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে গগণবিদারী চিৎকারে উৎসাহ যুগিয়েছেন। মালয়েশিয়ার আক্রমণ বাংলাদেশের রক্ষণভাগ প্রতিহত করলেও তারা একইভাবে চিৎকার করেছেন। সেই খেলায় বাংলাদেশি সমর্থকদের চিৎকার এবং উদযাপন স্বাগতিক দেশের সমর্থকদেরও ছাপিয়ে গেছে ।
পার্থে বাস করা একজন হিসেবে নিশ্চিত করে বলতে পারি, বাংলাদেশ দল যখন এশিয়ান পাওয়ারহাউস ‘সকারু’দের বিপক্ষে মাঠে নামবে তখন অস্ট্রেলিয়াতেও একই দৃশ্য হবে।
এনআইবি স্টেডিয়ামে ম্যাচটির জন্য অস্ট্রেলিয়া ফুটবল ফেডারেশন এরইমধ্যে স্টেডিয়ামের একটি অংশ বাংলাদেশের সমর্থকদের জন্য নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। বাজারে ছাড়ার কয়েকদিনের মধ্যেই বিক্রি হয়ে গেছে স্টেডিয়ামের সেই অংশটুকুর টিকেট।
পার্থের বাংলাদেশীরা সবাই দুই দলের যোগ্যতা সম্পর্কে কমবেশি ধারণা রাখেন। বাস্তবতার বিচারে খেলার সম্ভাব্য ফলাফলটি কি হতে পারে তাও জানেন তারা। তারপরও ম্যাচটিকে ঘিরে বাংলাদেশী এবং অস্ট্রেলিয়ান সমর্থকদের মধ্যে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা।
বড় এই ম্যাচটি ছাড়াও পার্থের বাংলাদেশীদের সামনে রয়েছে একটি ফুটবল টুর্নামেন্ট। বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া ম্যাচকে ঘিরে বাংলাদেশী এসোসিয়েশন অব ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে একটি ছোট আকারের ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজন করতে যাচ্ছে।
কিন্তু সবার অাগে, সবকিছুর অাগে বৃহস্পতিবারের ম্যাচ। বাংলাদেশী এসোসিয়েশন শত শত সবুজ এবং লাল স্কার্ফ তৈরি করে রেখেছে। বিশাল আকারের বাংলাদেশের পতাকা নিয়েও মাঠে আসবেন তারা।
এই ম্যাচটি সবার সামনে এই সত্যটাই তুলে ধরবে যে, বাংলাদেশের ফুটবলের জন্য বাংলাদেশের এবং সাগরের ওপারের বাংলাদেশীদের সমর্থন এখনও বিশাল পরিসরেই জীবন্ত। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন এবং বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্লাবগুলোর উচিত শক্তিশালী প্রতিপক্ষর সাথে আরও প্রীতি ম্যাচ আয়োজন করা।
মানসম্মত ফুটবল সেটা দেশে বা দেশের বাইরে যেখানেই হোক তা আরও বেশি সংখ্যায় সমর্থকদের আকর্ষণ করবে। বাংলাদেশের উচিত তাদের মর্যাদা আরও উঁচুতে নিয়ে যাওয়া এবং শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে নিয়মিত প্রীতি ম্যাচে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়া।







