অধিকার কেউ কাউকে দেয় না, অধিকার সাহস করে কেড়ে নিতে হয়। দশম শ্রেণীর সাহসী শতাব্দী সে কথাই আবার প্রমাণ করলো। শতাব্দী সুযোগ পেয়ে তার মতো অনেক ছাত্রীর যাতায়াত ব্যবস্থা সহজ করে দিলো। ছোট্ট মেয়েটি সাহস করে নিজেদের সমস্যার কথা সড়ক পরিবহন মন্ত্রীকে বলতে পেরেছিলো বলেই মন্ত্রী তার কথা শুনেছেন এবং রেখেছেন। সাধারণত: আমাদের অভিজ্ঞতা বলে যে মন্ত্রী, নেতারা বিভিন্ন এলাকা সফরে গিয়ে বিভিন্ন ওয়াদা করে আসেন কিন্তু সেটা আর বাস্তবায়িত করেন না। এক্ষেত্রে একটি বড় রকমের ব্যতিক্রম লক্ষ্য করলাম। শতাব্দীর কাছে দেয়া ওয়াদা অনুযায়ী একটি বিআরটিসি বাস শুধুমাত্র নারী যাত্রীদের জন্য বিশেষ করে স্কুলের বাচ্চাদের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। বাচ্চারা এখন সময়মতো স্কুলে যেতে পারবে, এমনটাই আশা করছি। আসলে ছোট্ট একটি মেয়ে নিজেদের প্রয়োজনের কথা সাহস করে নিজেই বলেছে বলে মন্ত্রী মহোদয় দায়িত্বটা কাঁধে তুলে নিয়েছেন এবং কথা রেখেছেন।
ঢাকা শহরে যেভাবে মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, তাতে গণপরিবহণের সংখ্যা আরো অনেক বাড়াতে হবে। বিশেষ করে মেয়েদের জন্য। এত মানুষের ভীড় ঠেলে মেয়েরা বাসে উঠছে, উঠতে বাধ্য হচ্ছে। কিন্তু পাবলিক বাসে মেয়েদের হয়রানিরও কোনো শেষ নেই। প্রথম কথা ভীড় ঠেলে, ছেলেদের গুঁতো ধাক্কা খেয়েও যদি কোনো মেয়ে বাসে উঠতে চায়, তাকে বলা হয় সিট খালি নাই, মহিলা সিট খালি নাই। মেয়েরা যদি অন্য সিটে বসতে চায়, তখন নানা ধরনের মন্তব্য শুনতে হয়।
বাসে যদি ভিড় বেশি থাকে, তাহলে যেকোনো বয়সের মেয়েদের হেনস্তা হওয়ার শংকা বেড়ে যায়। শরীরে হাত দেয়া, ব্যাগে হাত গলিয়ে দেয়া, অস্বস্তিকর স্পর্শ সব সহ্য করেই মেয়েরা বাসে, টেম্পু বা হিউম্যান হলারে চলছে। বাসে বা অন্য গণপরিবহণে চড়তে তাদের কোন আপত্তি নেই, ছেলেদের সাথে আসন ভাগাভাগি করতেও তাদের কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু যৌন হয়রানি, অসদাচারণ, অবমাননা এসবতো আর মানা যায় না। তাই যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে শতাব্দীর মত আমাদেরও দাবি: আরো গণ পরিবহণ চাই, নারীর জন্য আলাদা বরাদ্দ চাই। চলাচলে নারীর এই ভোগান্তি অনেকটাই লাঘব করা সম্ভব যদি মেয়েদের জন্য আলাদা বাস সার্ভিসের সংখ্যা বাড়ানো যায়।
শেষে একটি গল্প দিয়ে শতাব্দীর বাস পাওয়ার আনন্দটি ভাগাভাগি করে নিতে চাই: ১৯৮৫/৮৬ সাল, আমরা তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী, মেয়েদের জন্য আজিমপুর রুটে ২/১ টি ‘মহিলা বাস’ দেয়া হয়েছিল। আমরা সাধারণত: বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে করে যাওয়া আসা করতাম। তবে একদিন বাস মিস করার পর আসাদগেট থেকে আমি আর আমার বন্ধু মেয়েদের জন্য বরাদ্দ বাসটিতে চড়লাম। সেই ৩০ বছর আগের কথা, তখন কিন্তু এতো ব্যাপক সংখ্যক মেয়েকে রাস্তায় দেখা যেতো না। কিন্তু এরপরও বাসে অনেক ভিড় ছিলো। আমরা কোনোমতে বাসে উঠলাম। কিন্ত মানিক মিয়া এভিনিউয়ের মোড়ে এসে বাসটি থেমে গেলো। বাসের ড্রাইভার আর কন্ডাক্টরের মধ্যে গোলযোগ। ড্রাইভার বলছে, এই বাস যাবে আজিমপুর, কন্ডাক্টর বলছে ফার্মগেট হয়ে শাহবাগ। বাসের যাত্রীদের মধ্যেও বচসা শুরু হলো। আমরা নেমে গিয়ে রিকশা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে রওনা হলাম। যাক সে বহুকাল আগের কথা, শতাব্দীরা নতুন প্রজন্ম, তারা জানে কীভাবে আদায় করে ঠিক পথে যেতে হয়।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







